নীলাঞ্জন হালদার

নারায়ণ হালদার রচিত ‘কালকেতুর স্বপ্ন’ মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যের এক অভিনব ও যুগান্তকারী পুনর্নির্মাণ। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কাব্যের ব্যাধ কালকেতু এখানে কেবল দৈবকৃপাধন্য কোনো চরিত্র নয়, বরং এক স্বনির্ভর, প্রজ্ঞাবান এবং জনদরদী আধুনিক রাষ্ট্রনায়ক।

বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হল, এর সাবলটার্ন বা দলিত প্রেক্ষিত। চিরাচরিত আর্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে একজন ‘অনার্য’ এবং তথাকথিত ‘ছোটলোক’ ব্যাধের রাজা হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প এটি। ‘রাজা হবে ক্ষত্রিয়, চালনা করবে ব্রাহ্মণ’ – এই বর্ণবাদী ও বংশানুক্রমিক মিথ ভেঙে কালকেতু প্রমাণ করেছেন যে, শৌর্য এবং যোগ্যতাই শাসকের মূল মাপকাঠি। সমাজের নিচুতলার মানুষ – ব্যাধ, জেলে, বাগদিদের শ্রমে গড়ে ওঠা তাঁর ‘গুজরাট’ নগরী বিশ্ব জুড়ে প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়নের এক কালজয়ী রূপক হয়ে উঠেছে।

ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে বইটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কলিঙ্গরাজের স্বৈরতন্ত্র এবং ভিন্‌দেশি যবন শাসকদের ধর্মীয় নিপীড়নে টিকতে না পেরে হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষের গুজরাটে ছুটে আসার ঘটনাটি আজকের আন্তর্জাতিক ‘উদ্বাস্তু সংকট’ (Refugee Crisis) ও অভিবাসনের বাস্তবতাকে প্রবলভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। কালকেতু যে ভাবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই মানুষদের আশ্রয় দিয়েছেন এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ে তুলেছেন, তা আধুনিক গণতান্ত্রিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের (Welfare State) এক নিখুঁত মডেল। এ ছাড়া ভাঁড়ুদত্তের মতো চরিত্রকে আধুনিক সুবিধাবাদী রাজনীতিকের প্রতিচ্ছবি হিসেবে নিপুণ ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

(বাঁ দিকে) লেখক নারায়ণ হালদারের হাতে পুরস্কার তুলে দিচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল আর এন রবি। (ডান দিকে) বইটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক অপূর্ব দে বইটি তুলে দিলেন প্রতিবেদকের হাতে।

সাহিত্যিক বিচারে এটি মিথের এক চমৎকার বিনির্মাণ। লেখক অত্যন্ত মুনশিয়ানার সঙ্গে দৈবশক্তিকে পেছনে ফেলে মানুষের নিজস্ব কর্মফল ও সাংগঠনিক প্রতিভাকে সামনে এনেছেন। পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আদিম সম্পর্ক এবং বৃক্ষ সংরক্ষণের যে বার্তা বইটিতে রয়েছে, তা বর্তমান বিশ্ব-উষ্ণায়নের যুগেও ভীষণ প্রাসঙ্গিক।

এত সুন্দর এবং সাবলীল একটি পাঠযোগ্য বইয়ের ক্ষেত্রে দু-একটি ছোটোখাটো সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। প্রতিপক্ষ কলিঙ্গরাজ বা যবন শাসকদের চরিত্রগুলো আরেকটু বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক হলে আখ্যানটি হয়তো আরও গভীর হত। এ ছাড়া, ছাপার সময় কিছু মুদ্রণপ্রমাদ বা টাইপো হয়তো অনিচ্ছাকৃত ভাবেই চোখ এড়িয়ে গেছে। এত চমৎকার একটি বইয়ের পরবর্তী সংস্করণে একটু নিবিড় প্রুফ রিডিংয়ের দিকে নজর দিলে বইটি আরও নিখুঁত হয়ে উঠবে। যেমন: ‘জেলে মাঝি মালো’ লিখতে গিয়ে সম্ভবত ভুলবশত ‘জেলে মাছি মালো’ ছাপা হয়েছে। কালকেতুর রাজকবি নিয়োগের প্রসঙ্গে ‘নারাজ’ শব্দটি মুদ্রণপ্রমাদে ‘নাজার’ হয়ে গেছে। এ ছাড়া ‘পান্থশালা’-র বদলে ‘পাহশালায়’, বা ‘খাদ্যখাদক’-এর বদলে ‘খাদাখাদক’-এর মতো কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ছাপার ভুল রয়ে গেছে।

এগুলো নিতান্তই মুদ্রণজনিত ত্রুটি, লেখকের কলমের জাদুকে বা গল্পের মূল সুরকে এগুলো মোটেও ক্ষুণ্ণ করতে পারেনি। তবে এই ছোট ত্রুটিগুলো সংশোধন হলে পাঠকের পড়ার অভিজ্ঞতা নিশ্চিত ভাবেই আরও মধুর হবে।

পরিশেষে বলা যায়, সম্পাদকীয় কিছু সাধারণ ত্রুটি বাদ দিলে ‘কালকেতুর স্বপ্ন’ একটি অত্যন্ত সাহসী, সময়োপযোগী এবং চিন্তন-উদ্দীপক সৃষ্টি। প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায় এবং শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর যে চিরন্তন বার্তা লেখক এই স্বল্প পরিসরে দিয়েছেন, তা দেশ ও কালের সীমানা ছাড়িয়ে এক সর্বজনীন আবেদন রাখে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *