ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images
“বিদ্যুৎ যায় না, আসে- বুঝি না। দিনে-রাতে সবসময়ই লোডশেডিং। দিনের অর্ধেক সময়ই তো বিদ্যুৎ থাকে না।”
বিবিসি বাংলাকে এভাবেই বলছিলেন নেত্রকোনার কলমাকান্দা এলাকার বাসিন্দা সুফল তালুকদার।
বিদ্যুৎ নিয়ে এমন অভিযোগ দেশের বেশিরভাগ এলাকার সাধারণ মানুষের।
আমদানি নির্ভর হওয়ায় গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সংকট বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের। কিন্তু গত ২১শে জুলাই ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি শুরু হওয়ার পর থেকে এই সংকট চরম আকার ধারণ করে।
এরপর থেকে বাসাবাড়িতে লোডশেডিং যেমন বেড়েছে, তেমনি গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানেও।
তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে দেশের অনেক শিল্প কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা কিংবা কোনো কেনো কারখানার শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানোর খবরও সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বাহাস গড়িয়েছে জাতীয় সংসদ পর্যন্তও।
এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি শিল্প মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
যেখানে মঙ্গলবার রাত থেকে শিল্প কারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন বলে জানিয়েছেন শিল্প মালিকরা।
শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের এই বার্তা সামনে আসার পর থেকেই আবাসিকসহ অন্যান্য খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অনেকেই।
“শিল্প কারখানা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমাদেরও তো বিদ্যুৎ প্রয়োজন, যেভাবে লোডশেডিং হচ্ছে তাতে আমাদের ব্যাবসার অবস্থাও তো খারাপ,” বিবিসি বাংলাকে এভাবেই বলছিলেন ঝিনাইদহের মুরগির খামারি এ বি এম রকিবুল হাসান।
এছাড়া তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ের কারণে বিপাকে পড়া আবাসিক বাসাবাড়ির বাসিন্দারাও বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমানোর দাবি তুলেছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য আগেই জানানো হয়েছে যে, বর্তমানে সংকটের মাত্রা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেখান থেকে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে।
“পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতেই আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনছি, বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও উন্নতি হতে শুরু করেছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।
ছবির উৎস, EXCELERATEENERGY
গ্যাস সরবরাহ বাড়ছে
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সোমবার বৈঠক করেন বাংলাদেশের শিল্প মালিকদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা। এরপরই শিল্প কারখানায় গ্যাস বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি মঙ্গলবার রাত থেকে উন্নতির কথা জানানো হয়।
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি বা এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক জানান, “উনি (প্রধানমন্ত্রী) আশ্বস্ত করেছেন আগামীকাল থেকেই আমাদের মিল কলকারখানা, সমস্ত ফ্যাক্টরিগুলোতে বিদ্যুতের এবং গ্যাসের যে চাহিদা ছিল আগের মতো তার উন্নতি হবে।”
দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে মঙ্গলবার যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেখানে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ বেড়েছে বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানিকৃত নতুন এলএনজি কার্গো আসায় দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকেও গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে বলে জানা গেছে।
ফলে টানা প্রায় দুই মাসের সংকটের পর দেশে গ্যাস সরবরাহে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, গত ২১শে জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউ এ অগ্নিকাণ্ডের পর যে সংকট শুরু হয়েছিল, বর্তমান সরবরাহ পরিস্থিতি তার আগের সময়ের কাছাকাছি।
অর্থাৎ গত ২০শে জুলাই গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ছিল ২৬৫ কোটি ঘনফুট। বর্তমান গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও প্রায় দুই মাস পর আবারও ওই সময়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ কর্পোরেশন বা পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত দেশে গ্যাস সরবরাহ ২৬১ কোটি ঘনফুট।
যেখানে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে উৎপাদন ১৬২ কোটি ঘনফুট এবং রিগ্যাসিফায়েড লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস বা আরএলএনজি থেকে ৯৯ কোটি ঘনফুট।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব মতে, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এই পরিমাণ ছিল ২৩৬ কোটি ঘনফুটের একটু বেশি। অর্থাৎ গত দিনের তুলনায় প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে।
যদিও সরবরাহের এই পরিমাণ এখনও দেশের মোট গ্যাস চাহিদা অর্থাৎ ৩৮০ কোটি ঘনফুট এর তুলনায় অনেক কম। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার দিকেই যাবে বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তিনি বলছেন, আমদানিকৃত এলএনজি নিয়মিত বিরতিতে দেশে আসতে শুরু করায় এবং এফএসআরইউগুলো পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি কাজ শুরু করায় ২১শে জুলাইয়ের আগে যে অবস্থায় ছিল, গ্যাস সরবরাহ অনেকটাই সেই জায়গায় পৌঁছেছে।
“সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা বিভিন্ন সোর্স থেকে উচ্চ মূল্যে এলএনজি কিনেছি। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাই আমাদের লক্ষ্য, সেটা আমরা করছি,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সংকট মোকাবিলায় এলএনজি আমদানি বাড়িয়েছে সরকার। চলতি মাসে পৃথক উৎস থেকে নয়টি কার্গো আসার কথা, এর মধ্যে চারটি ইতোমধ্যেই এসেছে।
এছাড়া অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে দুটি করে মোট ১৮ কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

বিদ্যুতের পরিস্থিতি কেমন?
তীব্র গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ খাতে। গত দুই মাসে নিয়মিত আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে চলতি বছরের শুরু থেকেই বিদ্যুৎ নিয়ে ভোগান্তি শুরু হলেও গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
মূলত গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।
বাংলাদেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে ১২০ কোটি ঘনফুট চাহিদা থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এর সরবরাহ নেমে আসে ৮৫ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুটে।
ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড়ো মাত্রায় ঘাটতি তৈরি হয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন কিছুটা বাড়িয়েও যা পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির খবরে বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অনেকেই।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়বে তবে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এখনই আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। কিন্তু গত দুই মাসে অধিকাংশ সময় এর সরবরাহ ছিল পিক-অফপিক মিলিয়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের আশেপাশে। কখনও কখনও তার থেকেও কম।
পাওয়ার গ্রিডের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবারও দেশে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। এদিন সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯০৫ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে ১৪ হাজার ৮৪৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেছে।
এদিন জোন ভিত্তিক বিদ্যুৎ এর চাহিদা অনুযায়ী, সব থেকে বেশি লোডশেডিং হয়েছে ময়মনসিংহ জোনে। যেখানে পিক আওয়ারে এক হাজার ৬০১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৪৯০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।
এছাড়া উল্লেখযোগ্য মাত্রায় লোডশেডিং ছিল ঢাকা, রংপুর, কুমিল্লা ও সিলেট জোনে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলছেন, গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির সাথে সাথে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতেও এর সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কিছুটা বাড়ছে বলেই দাবি তার।
“আমরা একটু একটু করে গ্যাস বেশি পাচ্ছি। সরবরাহ যেহেতু বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিংও কমে আসছে। তবে রাতারাতি পরিস্থিতি বদলাবে না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
গ্যাস সংকট কমে আসার সঙ্গেই বিদ্যুতের সংকটও কাটবে বলে জানান বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তিনি বলছেন, “গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির সাথে সাথে বিদ্যুতের সমস্যাও অনেকটা কমছে। আমরা চেষ্টা করছি সময়ের সাথে সাথে বিদ্যুতের সরবরাহ পরিস্থিতিও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আনতে।”
গত কয়েকদিন ধরেই লোডশেডিং একটু একটু করে কমছে বলেও দাবি প্রতিমন্ত্রীর।
