ছবির উৎস, Collected
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা বাগেরহাটে শুক্রবার সন্ধ্যায় এক ব্যক্তির খুন হওয়ার ঘটনার পর স্থানীয় পুলিশ বলছে, ঘটনাটি কেউ দেখেছে এমনই কাউকেই তারা পাচ্ছেন না।
যদিও সন্ধ্যার পরের ঘটনা হলেও অনেকের সামনেই ঘটনাটি ঘটেছে বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যাচ্ছে।
যিনি খুন হয়েছেন তিনি ঢাকার একটি পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি এবং একই সঙ্গে বিএনপির স্থানীয় একজন নেতা। তার বিরুদ্ধে আগেও মাদক ও চাঁদাবাজি সংক্রান্ত দুটি মামলার রেকর্ড আছে।
স্থানীয় কেউ কেউ বলছেন, হামলাকারীরা এ এস এম হায়াত উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করে দুটি মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল থকে চলে যায়। কেউ বলছেন, খুনের শিকার ব্যক্তি ও হামলাকারীরা আগে থেকেই সেখানে ‘আড্ডা’ দিচ্ছিলেন।
মি. উদ্দিন বাগেরহাট পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য। সম্প্রতি পৌর বিএনপির সম্মেলনে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচন করে জয়ী হতে পারেননি তিনি।
যদিও জেলা বিএনপি নেতারা বলছেন, গত কয়েকমাস ধরেই ‘রাজনীতি ছেড়ে’ সাংবাদিকতায় ব্যস্ত হয়েছিলেন এবং বিভিন্ন ইস্যুতে সামাজিক মাধ্যমেও সরব ছিলেন হায়াত উদ্দিন।
ছবির উৎস, Collected
খুনের ঘটনা সম্পর্কে কতটা জানা যাচ্ছে
বাগেরহাট শহরের পিসি কলেজ সংলগ্ন হাড়িখালি এলাকায় সন্ধ্যায় হামলার শিকার হন এ এস এম হায়াত উদ্দিন। সেখানকার একটি প্রাইমারি স্কুলের কাছে চায়ের দোকানে বসে ছিলেন তিনি।
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে কয়েকজন এসে তাকে কুপিয়ে জখম করে দুটি মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।
তবে স্থানীয় বিএনপির একজন নেতা বলছেন, তিনি খবর নিয়ে জেনেছেন যে যারা হামলা করেছে তাদের সাথেই হায়াত উদ্দিনকে আড্ডা দিতে দেখছে স্থানীয়রা।
সদর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহামুদ উল হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তারা ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর পাড়া প্রতিবেশী ও ঘটনাস্থলের আশেপাশের সবাই একবাক্যে বলেছে ‘তারা ঘটনার সময় ছিলই না’ কিংবা ‘তারা কিছু দেখেনি’।
মি. হাসান বলছেন, তারা আজ দুপুর পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ক্লু পাননি।
“সেখানকার যারেই জিজ্ঞেস করি তিনিই বলছেন ঘটনার সময় তারা এলাকাতেই ছিলেন না। তবে তদন্ত চলছে। আশা করি সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসবে,” বলেন ওসি।
হায়াত উদ্দিনের ভগ্নীপতি তোফাজ্জেল হোসেন জিহাদ বলছেন, হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে তারা রাজি নন।
“এখনো পোস্ট মর্টেম শেষ হয়নি,” শনিবার দুপুরে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
ছবির উৎস, Getty Images
আলোচনায় নানা কারণ
পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহামুদ উল হাসান বলছেন, হায়াত উদ্দিনের বিরুদ্ধে এর আগে আদালতে একটি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। এছাড়া বিশেষ ক্ষমতা আইনে মাদকের একটি মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।
“তবে তার খুনের সাথে এ সবের কোনো সম্পর্ক আছে কি-না সেটি কেবল তদন্তের পরেই বলা যাবে,” বলছিলেন তিনি।
পুলিশের দিক থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না আসলেও হত্যাকাণ্ডটি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে বিশেষ করে বিএনপির অভ্যন্তরে নানা ধরনের আলোচনার তথ্য পাওয়া গেছে।
বিএনপির কয়েকজন নেতা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে যে, হায়াত উদ্দিন মূলত ফেসবুকে বেশি সরব হয়েছিলেন এবং একই সাথে দলের মধ্যে গ্রুপিংয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
গত কিছুদিন ধরে বাগেরহাটে বিএনপি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং এতে হায়াত উদ্দিন নতুন একজন নেতার সাথে সখ্য তৈরি করেছিলেন, যেটি অন্য একটি পক্ষকে ক্ষুব্ধ করেছিলো বলে মনে করা হয়।
এমনকি নিজের বিরুদ্ধে মাদক সংক্রান্ত মামলা থাকলেও তিনি সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি মাদকবিরোধী পোস্ট দিয়েছেন এবং কোনো কোনো পোস্টে বিভিন্নজনকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণও করেছেন যা দলেরই একাংশকে বিব্রত ও ক্ষুব্ধ করে।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিকে হায়াত উদ্দিন হামলার শিকার হয়েছিলেন এবং সেট মাদক সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই বলে শহরে প্রচার আছে।
তবে মাদক ও বিএনপির ভেতরে এ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে হায়াত উদ্দিন নিহত হয়েছেন বলে মানতে রাজি নন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকরাম হোসেন তালিম।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, “হায়াত উদ্দিন সাংবাদিকতার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সত্যি নয় বলে আমি মনে করি”।
যদিও জেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা বলেছেন জেলার বিএনপিরই একটি গ্রুপ মাদক, অস্ত্রসহ বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত, যাদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন হায়াত উদ্দিন।
“এ সিন্ডিকেটের হাতেই অস্ত্র ও মাদক। এদের কেউ ধরে না। দলের মধ্যে কিছু গডফাদার এগুলোকে প্রশ্রয় দিচ্ছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি। তবে তিনি তার নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন।
আবার হায়াত উদ্দিনের এলাকাতেই বাস করেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খাদেম নিয়ামুল নাসির আলাপ।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, “সে রাজনীতি থেকে সাংবাদিকতার দিকে গিয়েছিলো। তুচ্ছ কোনো বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে মারামারি হয়েছে বলে শুনছি। হায়াতকে দীর্ঘকাল ধরে চিনি। তার মধ্যে খারাপ কিছু তো আমি দেখিনি। বিএনপির মধ্যকার দ্বন্দ্বের অভিযোগও সত্যি না।”
হায়াত উদ্দিনের পরিবার এখনো কোনো মামলা করেনি বলে জানিয়েছে পুলিশ। স্থানীয়রা বলছেন, ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে যাদের নাম এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে ফিরছে তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে জড়িত।
বিএনপির জেলা কমিটির নেতারা অবশ্য বলছেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে তারা কেউ এখন আর বিএনপির সাথে জড়িত নন। এসব ব্যক্তিদের আগেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার একজন শীর্ষ নেতা।
