সঞ্জয় হাজরা

মনে পড়ে কি পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের লেখা সেই বিখ্যাত কবিতা ‘নকশী কাঁথার মাঠ’? যেখানে রুপাইয়ের অপেক্ষায় সাজু তাঁদের অতীত জীবনের সুখ-দুঃখের স্মৃতি ফুটিয়ে তুলেছিলেন নকশিকাঁথার মাধ্যমে।

– বিজ্ঞাপন –

তবে বাস্তবে নকশিকাঁথা হল সাধারণ কাপড়ের ওপরে রঙিন সূতা ও সুঁই বা ফোঁড়ের মাধ্যমে শৈল্পিক নকশায় প্রস্তুত এক ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প। এটি মূলত বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীন এক লোকসংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এর মধ্যে যেমন লতা-পাতা, ফুল, পাখি, নদী বা গ্রামীণ জীবনের গল্প থাকে, তেমনি থাকে ইতিহাস-সহ পৌরাণিক নানান কাহিনিও।

সরল গ্রামীণ জীবনে বসবাসকারী সরল মানুষগুলি বোঝে না ধর্মের অনুশাসন, মানে না ভেদাভেদের রাজনীতি। নিজেদের কানে শোনা লোককথা, দু’চোখ দিয়ে দেখা প্রকৃতি-সহ মা-দিদিমাদের থেকে দেখে বড়ো হওয়া, মনের ভিতরে তৈরি হওয়া নকশাকেই তারা রঙিন সুতো আর ফোঁড়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে সাধারণ কাপড়ের উপর।

আর তাই তো বীরভূমের নানুরের তাজক্ষীরা বেগমের হাতে ফুটে উঠেছেন স্বয়ং মা দুগ্গা কিংবা সুলতানা বিবির রঙিন সুতোয় চিত্রিত হয়েছে রামায়ণের বর্ণময় চরিত্রগুলো। বর্ধমানের আউসগ্রামের তাহমিনা বেগম তাঁর নকশিকাঁথায় ফুটিয়ে তুলেছেন সিদ্ধিদাতা গণেশকে। আর ঠিক এ ভাবেই নাজমা সুলতানা, কুলসুমা বিবি, লাভলি বিবি, লুৎফা নাজির, আফরুজা খাতুন, ফুলবানু শেখ, শরিফা খাতুন, সুলতানা বিবি, বুলটি বিবি, ফাতেমা শেখ ও রোশনারা বেগম শেখদের হাত থেকে বেরিয়ে এসেছে নজরকাড়া অপূর্ব সব শিল্পকর্ম। যেখানে নেই কোন ধর্মের বিদ্বেষ বা হাদিসের নির্দেশ। আছে শুধু শৈল্পিক সত্তা আর মানবতার টান।

এঁদের মধ্যে বেশ কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা বিদ্যালয়ের প্রাথমিক গণ্ডিও পার করেননি। কিন্তু আজ তাঁরা নিজেদের কর্ম বলে ভারতের ভৌগোলিক সীমানা পার হয়ে একাধিক বার পাড়ি দিয়েছেন বিশ্বের নানান প্রান্তে নানান শিল্প প্রদর্শনীতে। তাজক্ষীরা বেগম তো গল্পের ছলে বলেই বসলেন, তাঁর প্রথম বার জার্মানিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা। যেখানে তাঁকে তাঁর শিল্পকর্ম অর্থাৎ শাড়ির দাম জানতে চাওয়া এক জার্মান সাহেবের বলা ‘হাউ মাচ?’ শব্দটা শুনেই চারিদিকে মাছ কোথায় আছে সেটা খুঁজতে থেকেছিলেন বেশ কিছুটা সময় জুড়ে। তার পরে বুঝেছিলেন যে, সাহেব তার শাড়ির দাম জানতে চাইছেন।

বিজ্ঞাপন

আজ সেই তাজক্ষীরা বেগমের অধীনে পাঁচ শতাধিক গ্রামীণ মহিলা এই শিল্পকর্মের সঙ্গে নিযুক্ত হয়েছে। এবং তাজক্ষীরার সঙ্গে তাঁরাও আজ সাবলীল ভাবে হিন্দি-সহ কাজ চালানোর মতো ইংরেজি বলে একাধিক বার পাড়ি দিয়েছেন বিশ্বের নানান প্রান্তে। আর এই সব কিছুর নেপথ্যে ‘বাংলানাটক ডট কম’ তাঁদের শিক্ষা, উপযুক্ত মঞ্চ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিরলস ভাবে প্রদান করে চলেছে।

বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কলকাতার ললিত কলা অ্যাকাডেমি রিজিওনাল সেন্টারের তৃতীয় তলে সকাল ১১টা থেকে সন্ধে ৭টা পর্যন্ত ‘কাঁথা কথন’ নামক এই প্রদর্শনী চলবে। ঠিকানা: ৮৫, এজেসি বসু রোড, কলকাতা- ৭০০০১৪।

ছবি: প্রতিবেদক



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *