ভারতের অর্থনীতি ৭.৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। প্রত্যাশার তুলনায় বেশি এই GDP বৃদ্ধির পরেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘স্বদেশি’ বার্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—অর্থনীতি যখন এত দ্রুত বাড়ছে, তখন ভারতীয়দের বিদেশ ভ্রমণ না করা, বিদেশে বিয়ে না করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় ভাবে সোনা না কেনার পরামর্শ কেন?

এই প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন জোহো-র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিজ্ঞানী শ্রীধর ভেম্বু। তাঁর যুক্তি, GDP বৃদ্ধির হার শক্তিশালী হলেও ভারতের এখনও জ্বালানি ও উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা রয়েছে। অর্থনীতি যত দ্রুত বাড়বে, শক্তি ও প্রযুক্তির চাহিদাও তত বাড়বে। ফলে একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করাও জরুরি।

– বিজ্ঞাপন –

ভেম্বুর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চিনের মতো দেশ দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সময় নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সংরক্ষণ করেছিল। ভারতের ক্ষেত্রেও বর্তমানে একই ধরনের কৌশল নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

GDP বাড়লেও আমদানির চাপ কেন?

ভেম্বু বলেন, ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু শক্তি ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এখনও বিদেশের উপর নির্ভরতা রয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হলে জ্বালানি এবং প্রযুক্তির প্রয়োজন আরও বাড়বে। সেই চাহিদা মেটাতে আমদানিও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, ভারতকে আমদানি নির্ভরতা সামলাতে আরও বেশি রফতানি করতে হবে। কিন্তু রফতানির ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি, বিশেষ ধরনের উপকরণ, CPU, GPU এবং উন্নত সফটওয়্যারের মতো অনেক কিছুই এখনও আমদানি করতে হয়।

অর্থাৎ শুধু রফতানি বাড়ালেই হবে না, সেই রফতানি সক্ষমতা তৈরি করতেও বিদেশ থেকে প্রযুক্তি ও পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। এই ব্যবধান কমাতে সময় লাগবে বলেই মত ভেম্বুর।

বিজ্ঞাপন

‘দ্রুত বাড়তে থাকা সংস্থার মতো ভারত’

ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি দ্রুত বাড়তে থাকা সংস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন ভেম্বু। তাঁর ব্যাখ্যা, কোনও সংস্থা দ্রুত সম্প্রসারণের সময় যেমন মূলধন সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য, একই ভাবে ভারতকেও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির এই পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ করতে হবে।

তাঁর মতে, উন্নত প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারলে ভবিষ্যতে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের প্রয়োজন কমবে। কিন্তু সেই জায়গায় পৌঁছতে এখনও সময় লাগবে।

মোদীর ‘স্বদেশি’ বার্তার প্রেক্ষাপট

৭.৮ শতাংশ GDP বৃদ্ধির পর প্রধানমন্ত্রী মোদী নাগরিকদের ‘স্বদেশি’ এবং ‘Vocal for Local’-এর উপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান। বিদেশে ছুটি কাটাতে যাওয়া এবং বিদেশে বিয়ে করার প্রবণতা কমানোর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ভাবে সোনা না কেনার পরামর্শও দেন তিনি।

মোদীর বক্তব্য ছিল, দেশের অর্থনীতির এই বৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে দেশীয় পণ্য ও পরিষেবার উপর নির্ভরতা বাড়ানো দরকার। বিদেশে যে অর্থ খরচ হচ্ছে, তার একটি বড় অংশ দেশের মধ্যেই খরচ হলে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও শক্তিশালী হতে পারে।

৭.৮% বৃদ্ধি, তবু সতর্কতার জায়গা

চলতি বছরের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে ভারতের GDP বৃদ্ধির হার হয়েছে ৭.৮ শতাংশ। এই হার রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ৭ শতাংশ পূর্বাভাসকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির শক্তি নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

তবে ভেম্বুর বক্তব্যে উঠে এসেছে অন্য একটি বাস্তবতা—দ্রুত বৃদ্ধি মানেই সব ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা নয়। অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং মূলধনী পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি-রফতানির ভারসাম্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।

সোনার বাজারেও নজর

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সোনা না কেনার বার্তার সময়েই আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে দেশের সোনার ফিউচারেও পতন দেখা গিয়েছে। বুধবার MCX-এ অক্টোবর ডেলিভারির সোনার ফিউচার ১,৫৫৯ টাকা কমে প্রতি ১০ গ্রামে ১,৫০,১৭০ টাকা হয়েছে। ডিসেম্বরের চুক্তিও ১,৭৫৩ টাকা কমে ১,৫১,৫৪০ টাকায় নেমেছে।

অর্থাৎ একদিকে অর্থনীতির শক্তিশালী বৃদ্ধির পর ‘স্বদেশি’ ও বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের বার্তা, অন্যদিকে সোনা ও বিদেশি পণ্যের উপর দেশের খরচ কমানোর প্রশ্ন—সব মিলিয়ে মোদীর বার্তাকে শুধু ভোগ কমানোর আহ্বান হিসেবে নয়, বরং আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতির ভিত আরও শক্ত করার কৌশল হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন অর্থনীতির পর্যবেক্ষকরা।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *