হায়দরাবাদ: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া। তাঁর বক্তব্য, কোনও প্রক্রিয়ার ফলে যদি লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হন এবং ভোট দেওয়ার অধিকারহীন নাগরিকে পরিণত হন, তা হলে সেই প্রক্রিয়া স্বভাবতই স্বেচ্ছাচারী এবং সংবিধানের পরিপন্থী হবে।

রবিবার হায়দরাবাদের নালসার ইউনিভার্সিটি অব ল-এর একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন বিচারপতি ভূঁইয়া। সেখানেই তিনি সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই মন্তব্য করেন।

– বিজ্ঞাপন –

বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, কোনও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ নাগরিককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে নিজেদের দেশেই ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’-এর মতো অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হলে তা সংবিধানের মূল কাঠামোর বিরোধী। তাঁর বক্তব্য, এমন কোনও প্রক্রিয়াকে যুক্তি দেখিয়ে বৈধতা দেওয়া যায় না এবং তা সংবিধান যে সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, তারই পরিপন্থী হতে পারে। 

‘ভোটাধিকার নাগরিকের আত্মার মতো’

ভোটার তালিকায় নাম থাকা এবং ভোট দেওয়ার অধিকারকে নাগরিকত্বের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বলে ব্যাখ্যা করেন বিচারপতি ভূঁইয়া। তাঁর কথায়, কোনও ভারতীয় নাগরিককে ভোটাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে তা যেন শরীর থেকে আত্মা বের করে নেওয়ার মতো। 

সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারতের সংবিধানে ৩২৫ ও ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি এবং প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

৩২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জন্য একটি সাধারণ ভোটার তালিকার কথা বলা হয়েছে এবং ধর্ম, জাতি, বর্ণ বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কাউকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে অযোগ্য করা যাবে না। অন্য দিকে, ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ লোকসভা এবং রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তি নির্ধারণ করে। 

বিজ্ঞাপন

আম্বেদকরের বক্তব্যও স্মরণ

বক্তব্যে সংবিধান সভায় সর্বজনীন ভোটাধিকার নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন বিচারপতি ভূঁইয়া। তিনি ড. বি আর আম্বেদকরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, ভোটাধিকার এবং ভারতীয় নাগরিকের প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের অধিকারকে সংবিধানের মধ্যেই সুরক্ষিত করা হয়েছিল, যাতে তা শুধুমাত্র সংসদীয় আইনের উপর নির্ভরশীল না থাকে। 

তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের অভিজ্ঞতা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সংবিধান সভার কাছে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার গ্রহণ ছিল গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। তাঁর মতে, এটি ছিল ভারতের সাধারণ মানুষের প্রতি সংবিধান প্রণেতাদের আস্থার প্রকাশ এবং দেশে সমতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রথম পদক্ষেপ। 

‘কোটিপতি হোন বা রিকশাচালক, ভোটের মূল্য সমান’

ভোটের সমতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, একজন কোটিপতি এবং একজন রিকশাচালক—দু’জনের ভোটের মূল্য সমান। একই ভাবে সমাজের উচ্চস্তরের কোনও ব্যক্তি এবং প্রান্তিক অবস্থায় থাকা কোনও শ্রমজীবী মানুষের ভোটের সাংবিধানিক মূল্যও সমান। তাঁর বক্তব্যে গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সমতার এই নীতির গুরুত্ব উঠে আসে। 

উল্লেখ্য, ভোটার তালিকার SIR নিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক মামলা সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। এর মধ্যেই বিচারপতি ভূঁইয়ার এই বক্তব্য নতুন করে ভোটার তালিকা, নাগরিকের ভোটাধিকার এবং সাংবিধানিক সুরক্ষা নিয়ে আলোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে তাঁর বক্তব্যটি কোনও নির্দিষ্ট মামলায় দেওয়া রায় নয়; নালসারে একটি বক্তৃতার সময় সর্বজনীন ভোটাধিকার ও সাংবিধানিক নীতি প্রসঙ্গে তিনি এই মন্তব্য করেন।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *