ছবির উৎস, Punit PARANJPE / AFP via Getty Images
-
- Author, প্রত্যুষ রায়
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
- Author, ইমরান কুরেশি
- Role, বিবিসি নিউজ সংবাদদাতা
-
Published
-
পড়ার সময়: ৯ মিনিট
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের উদ্দেশে দেশটির জেন-জি ও বিরোধী দলগুলো আওয়াজ তুলেছে “জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো”। দেশটির সাংবিধানিক সংস্থার বিরুদ্ধে এরকম আন্দোলনের নজির নেই।
বুধবার সাতই অক্টোবর দিল্লিতে সদ্য গজিয়ে ওঠা, এবং যুব সমাজে ‘ভাইরাল’ হয়ে যাওয়া সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির ডাকা একটি সাংবাদিক সম্মেলন থেকে বামপন্থি নেতা নেহা বোরার মন্তব্য, “১৩ কোটি মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করা দেশের সবচেয়ে গুরুতর ইস্যু”।
“গত দুই তারিখ মুম্বাইতে সিজেপির সমাবেশে যে পরিমাণ জনতা উপস্থিত হয়েছিল, তাতে এই ইঙ্গিত স্পষ্ট যে মানুষের এটাই দাবি”।
ককরোচ জনতা পার্টি, বামপন্থি দল ও সংগঠনগুলোর যে বিক্ষোভ গত সপ্তাহ থেকে শুরু হয়েছে, বুধবার দিল্লি থেকে তা আরও জোরদার করার ডাক দিলেন নেহা বোরা, যিনি বামপন্থি ছাত্র সংগঠন আইসার সর্বভারতীয় সভাপতি।
সেই সম্মেলন থেকেও ডাক উঠল, “জ্ঞানেশ, ইট্স ডান ব্রো” যা এখন ভারতের তরুণ প্রজন্মের মুখে একটি স্লোগানে পরিণত হয়েছে।
একই সঙ্গে ইন্ডিয়া জোটের দলগুলোও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে।
ভারতে জন-আন্দোলনের ঘটনা নতুন না হলেও কোনো সাংবিধানিক সংস্থার বিরুদ্ধে এই ধরনের গণ-আন্দোলন নজিরবিহীন।
এই সব বিতর্কের মূলে রয়েছে গত ২৩শে সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদন।
নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষে নিযুক্ত তিন জন সম-পদমর্যাদার নির্বাচন কমিশনার মতবিনিময় করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বা সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচন প্রক্রিয়া সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সেই তদন্ত দেখাচ্ছে বহুক্ষেত্রে দুইজন নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর আপত্তি সত্ত্বেও নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
এই নির্দেশগুলো বেশিরভাগই ছিল ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর সংক্রান্ত, যার সঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের বাদ যাওয়া সরাসরি যুক্ত।
ওই সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের দিকে আঙুল তুলেছে ভারতের বিরোধী দলগুলো।
বামপন্থি সংগঠনগুলো দিল্লির যন্তর মন্তরে দোসরা অক্টোবর থেকেই বিক্ষোভে শামিল হয়েছে। তবে সেখানে সাধারণ ছাত্র-যুবদের অংশগ্রহণও দেখা গেছে।
কিন্তু বিরোধীদের ডাকা আন্দোলনে কীভাবে জড়িয়ে পড়ল যুবসমাজ? আর এই আন্দোলন কি সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে?
ছবির উৎস, Ishant Chauhan/Hindustan Times
কী চাইছেন রাহুল গান্ধী, কী প্রতিক্রিয়া কমিশন ও বিজেপির?
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে তার সঙ্গে দেখা করতে হবে, এই দাবিতে ছয়ই অক্টোবর (মঙ্গলবার) নির্বাচন কমিশন দফতরের কাছেই আকাশবাণী ভবনে অনেক রাত পর্যন্ত অবস্থান করেন বিরোধী কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।
রাহুল গান্ধীর এই আন্দোলন ও নেহা বোরার মন্তব্য ভারতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বৃহত্তর আন্দোলনের একটি অংশ। যদিও রাহুল গান্ধীর বিক্ষোভ ছিল মূলত বিরোধী এমপিদের নিয়ে, যেখানে সাধারণ তরুণদের খুব বেশি অংশগ্রহণ ছিল না।
সেখান থেকে তাকে পুলিশ প্রথমে আটক করে ও রাত নটা নাগাদ কিংসওয়ে ক্যাম্প থানায় নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ।
রাহুল গান্ধী মঙ্গলবারের বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে বলেন, “দেশের সঙ্গে যা করা হয়েছে তা দেশদ্রোহিতা। প্রধানমন্ত্রী মোদী, অমিত শাহ, আরএসএস প্রধান বা জ্ঞানেশ কুমার, কেউই রেহাই পাবে না।”
এদিন দুপুরের দিকে পুলিশের হাতে প্রথমবার কিছু সময়ের জন্য আটক হন রাহুল গান্ধী, তার বোন কংগ্রেস এমপি প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা ও বিক্ষোভ প্রদর্শনকারী ইন্ডিয়া জোটের এমপিরা।
তাদের ছেড়ে দেওয়া হলে রাহুল গান্ধী দাবি করেন, জ্ঞানেশ কুমারকে তার সঙ্গে দেখা করতে হবে। এই দাবিতে নির্বাচন কমিশন দফতরের কাছেই আকাশবাণী ভবনে রাত পর্যন্ত অবস্থান করেন রাহুল গান্ধী।
দিনের শেষভাগে এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়াও আসে। নির্বাচন কমিশন জানায়, বিক্ষোভরত সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে স্মারকলিপি গ্রহণের জন্য তারা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী যেখানে অবস্থান করছিলেন, সেই স্থানে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে থাকা সর্বোচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাকে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল।
কমিশনের মতে, এটি একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ হতে পারতো। তবে বিক্ষোভরত নেতারা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবিতেই তারা অনড় থাকেন।
তার পরেই পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয় রাহুল গান্ধীকে।
এরপর মঙ্গলবার রাতেই বিজেপির তরফ থেকে সুধাংশু ত্রিবেদী একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন, সেখান থেকে তিনি রাহুল গান্ধীকে উদ্দেশ করে বলেন, “নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যে বিরোধীদের কথা বলার আদৌ ইচ্ছা নেই, এই ঘটনা সেই দিকেই ইঙ্গিত করে।”
“সংসদও যদি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলতে চায়, তাহলে কমিশনের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিকে তলব করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সরাসরি তলব করাই সংবিধান বিরোধী।”
ছবির উৎস, ANI
বুধবার আবারও আটক হন রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী দলীয় নেতাদের কয়েকজন।
বুধবার একটি রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খাওয়ার পর রাহুল গান্ধী বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে যন্তর মন্তরের উদ্দেশে রওনা হন। পুলিশ বিরোধীদলীয় নেতাদের সেখানে প্রবেশ করতে দেয়নি। এরপর রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন বিরোধীদলীয় নেতাকে আটক করা হয়।
পরে তাদের ছেড়ে দেয় পুলিশ।
অভিজিৎ দীপকের ভাষ্যে নিজের ভাষা খুঁজে পেয়েছে তরুণ জেন-জি
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনটি প্রথমদিকে ভারতের বিরোধী দলগুলোর মধ্যেই আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তার কারণ, ২০২৫ সাল থেকে ভোটার তালিকায় যে নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাতে বহু ভোটারকে তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে ভোট দিতে পারেননি তারা।
বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে, ইচ্ছাকৃতভাবে ভোটদানে বহু সংখ্যক মানুষকে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং যার ফলে বিজেপির জেতার রাস্তা পরিষ্কার হয়েছে। রাহুল গান্ধী সাংবাদিক সম্মেলন করে সরাসরি ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ এনেছিলেন।
যদিও প্রথম দিকে এই ইস্যুতে যুবসমাজের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য। তবে এই পরিস্থিতি দোসরা অক্টোবর থেকে পাল্টাতে শুরু করে।
ওই দিন মুম্বাইতে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভ থেকে অভিজিৎ দীপকে জেন-জিদের ভাষায় বলেছিলেন, “জ্ঞানেশ, ইট্স ডান ব্রো” অর্থাৎ, “জ্ঞানেশ, তোমার খেলা শেষ ভাই!”
এই সমাবেশে প্রচুর সংখ্যক তরুণ উপস্থিত হয়েছিলেন। তরুণদের মধ্যে যে অভিজিৎ দীপকের একপ্রকার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তা জুলাই মাসে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চেয়ে সংগঠিত আন্দোলনেও দেখা গিয়েছিল।
এই স্লোগান ছাত্র-যুবদের মধ্যে ঝড়ের গতিতে ভাইরাল তো হয়েইছে, উপরন্তু রাজনৈতিক দলগুলোও এই একই স্লোগান জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে তুলতে শুরু করেছেন।
মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কের সেই জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে অভিজিৎ দীপকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি এক গরিব মায়ের সন্তান। আপনার কারণে সব সন্তানই গরিব মায়ের সন্তান হয়ে গেছে।”
অর্থাৎ, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগকে তিনি সরাসরি মিলিয়ে দিয়েছেন তরুণ প্রজন্মের আশা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে।
এই প্রসঙ্গে সাবেক আমলা জহর সরকার বিবিসি নিউজ বাংলাকে বলেন, “যে ব্যক্তির আজ ২৫ বছর বয়স, সে ১২ বছর বয়স থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি শুনে বড় হয়েছে। কিন্তু বড় হয়ে সে দেখছে যে প্রতিশ্রুতিমতো স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়নি।”
তার মতে, এই আন্দোলন শুধু সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে নয়, বরং সরকারের বিরুদ্ধেও তরুণ সমাজ তাদের ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে।
ছবির উৎস, Arvind Yadav/Hindustan Times via Getty Images
নির্বাচন কমিশনের কাজে কেন আঙুল উঠছে সরকারের দিকে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ভারতের নির্বাচন কমিশনার নিযুক্তির পদ্ধতি ও সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলোর দিকে নজর দিতে হবে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন গঠিত হয় ১৯৫০ সালে। তখন সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে নির্বাচন কমিশনারদের নিযুক্ত করবেন রাষ্ট্রপতি।
বহু দিন পর্যন্ত এই নিয়মে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
কিন্তু ২০২৩ সালের মার্চ মাসে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ ‘অনুপ বারানওয়াল বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ মামলায় রায় দেয়, নির্বাচন কমিশনারকে নিযুক্ত করবে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা ও সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি প্যানেল।
ওই একই বছর শাসক দলের উদ্যোগে পার্লামেন্টে পাশ হওয়া একটি আইনে নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করার পদ্ধতিটি ফের পরিবর্তন করা হয়।
সেখানে এই দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী, একজন ক্যবিনেট মন্ত্রী ও বিরোধীপক্ষের একজন প্রতিনিধির উপর ন্যস্ত করা হয়।
ফলে এই প্যানেলে সরকারের প্রতিনিধিই দুইজন হয়ে গিয়েছে। যার ফলে নির্বাচন কমিশনার নিযুক্তির কাজে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিই প্রাধান্য পাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বিরোধীরা।
এই নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে দাখিল হওয়া একটি পিটিশনের উপর প্রধান বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ ছয়ই অক্টোবর যে মন্তব্য করেছে, তাতে আরও বিতর্ক উসকে গেছে।
ছবির উৎস, Arun Kumar/ The India Today Group via Getty Images
নির্বাচন কমিশনের বয়ানে অসঙ্গতি
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তদন্তমূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভারতে ভোটার হিসেবে নাম তোলার জন্য যে ফর্ম সিক্স ব্যবহৃত হয়, তাতে পরিবর্তন এনে তাকে চলতি এসআইআর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন।
সংশোধিত ফর্ম সিক্স–এ নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের আবেদনকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাদের বা তাদের বাবা-মায়ের নাম আগের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর)–এর পর প্রস্তুত করা ভোটার তালিকায় ছিল কি না।
২০২৫ ও ২০২৬ সালের এসআইআর প্রক্রিয়ার আগে এসআইআর হয়েছিল ২০০২ সালে। ফলে যাদের নাম কেটে গেছে, তারা নতুন করে নাম তুলতে অসুবিধার মধ্যে পড়েছেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে একটি বয়ান জারি করা হয়। সেপ্টেম্বরের ২৬ তারিখে দেওয়া ওই প্রেস নোটে নির্বাচন কমিশন বলেছিল, “এসআইআরের জন্য ফর্ম সিক্স–এর সঙ্গে সংযুক্ত ঘোষণাপত্রটি মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে”।
সোমবার, পাঁচই অক্টোবর ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত ফর্ম সিক্স নিয়ে যে পর্যবেক্ষণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট, তাতেই নির্বাচন কমিশনের বয়ানে অস্বচ্ছতার অভিযোগ আরও আরও উসকে গেছে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ফর্ম সিক্স–এ যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন করেনি।
প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য ২৬শে সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত প্রেস নোটে করা দাবির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
ছবির উৎস, Kabir Jhangiani/NurPhoto via Getty Images
কেন এই আন্দোলন আধুনিক ভারতে নজিরবিহীন
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকারের কার্যকালেই কৃষক আন্দোলন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বিরোধী আন্দোলন দেখেছে ভারত। কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকার আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিতেও বাধ্য হয়েছিল।
কিন্তু সেসব ছিল সরকারবিরোধী আন্দোলন। জহর সরকার মনে করেন, “বর্তমান আন্দোলনের সঙ্গে একমাত্র তুলনা করা যায় জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের, যা ইন্দিরা গান্ধীকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য করেছিল”।
১৯৭৪ সালে বিহার ও উত্তর প্রদেশ থেকে জয়প্রকাশ আন্দোলন বা যাকে ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’ আন্দোলনও বলা হয়, তার দাবির মূলে ছিল দুর্নীতি, মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থানজনিত কারণগুলো।
এক্ষেত্রে আন্দোলন যদিও মূলত গড়ে উঠেছে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। জহর সরকারের মতে, এর সঙ্গে যুব সমাজের শিক্ষা, কর্মসংস্থানের দাবিগুলোও জড়িয়ে গেছে।
‘পরিস্থিতি মেনে নিতে নারাজ যুব সমাজ’
জুলাই মাসে ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলন মূলত সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এ কথিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে হলেও ওই আন্দোলন থেকে যুব সম্প্রদায় কর্মসংস্থান ও শিক্ষার মতো বিষয়গুলো উত্থাপন করতে শুরু করেছিল।
বামপন্থি নেত্রী নেহা বোরা, যিনি নকশালপন্থি দল সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বা আইসার সর্বভারতীয় সভাপতি, তিনি বলেন, “সিজেপির মঞ্চ থেকে আলোচনা হচ্ছিল এই বিষয়েও যে, তাদের (বিজেপি ও আরএসএস) বিভাজনের রাজনীতি দেশকে এমন অবস্থায় এনে ফেলেছে, যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস আর বড় কোনো বিষয় বলে মনে হয় না। কিন্তু এসব আলোচনা মূলধারায় উঠে এলেই হিন্দু-মুসলমান সংক্রান্ত বয়ান এসে হঠাৎই মানুষের সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নেয়।”
তিনি এও বলেছিলেন, “আমার মনে হয়, এই আন্দোলন আমাদের সবাইকে যে শিক্ষা দিয়েছে, তা শুধু এই উপলব্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় যে, ফ্যাসিবাদীদের কাছ থেকেও জবাবদিহি আদায় করা সম্ভব।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক সঞ্জীব শ্রীবাস্তব বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেন, “দেশের তরুণ সমাজের উদ্দীপনা এখন নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে। তারা আর আগের মতো পরিস্থিতি যেমন আছে তেমনই মেনে নেওয়া ও হাত গুটিয়ে বসে থাকায় সন্তুষ্ট নয়।”
তিনি বলেন, “আমরা এতদিন মনে করতাম, ভারত এমন একটি সমাজ যেখানে মানুষ বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পরিবর্তন চায় না। কিন্তু গত কয়েক মাসে সেই ধারণা ভাঙতে শুরু করেছে।”
ছবির উৎস, Faceboon/Jawhar Sircar
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরতি জেরথ বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেন, আজ যে পরিবর্তনটি চোখে পড়ছে, বিষয়টি তার চেয়েও গভীর।
তিনি বলেন, “আজ যারা রাস্তায় নেমে আসছেন, তারা বিজেপির ভোটারদের সন্তান। তাদের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাবা-মায়েরা বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন। এই শ্রেণির মধ্যে বিপুল সংখ্যক নারী ভোটারও ছিলেন। বিশেষ করে এই নারীরাই নরেন্দ্র মোদীর সমর্থনের অন্যতম বড় ভিত্তি হয়ে উঠেছিলেন।”
তিনি আরও বলেন, “এই আন্দোলনগুলোতে যে বিপুল সংখ্যক নারী অংশ নিয়েছেন, তাতে সরকার পুরোপুরি নড়ে গেছে।”
“অন্য আন্দোলনগুলো সরকার সামাল দিতে পেরেছিল। কিন্তু এখন এই মানুষগুলোই শিক্ষা, চাকরি এবং বেকারত্বের মতো মৌলিক ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।”
“এগুলো এমন বিষয়, যার প্রভাব সারা দেশের সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এবং সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনেই এর প্রভাব রয়েছে।”
ভারতের রাজনীতিতে এর কী প্রভাব পড়বে?
জেন জি আন্দোলনের অন্যতম মুখ যে স্লোগান তুলেছিল, সেই স্লোগানই ব্যবহার করছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যরা। ফলে এটা পরিষ্কার যে জেন জিই অনেকাংশে ভারতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিপ্রকৃতি ঠিক করে দিচ্ছে।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের আন্দোলন সফল হওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রী মোদীও ইনস্টাগ্রামে রিল বানিয়ে জনসংযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। একই প্রচেষ্টা কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যান্য মন্ত্রীরাও করেছেন।
উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও জেন জি প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে কয়েকটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।
তবে আরতি জেরথের কাছে বিষয়টি কিছুটা অদ্ভুত মনে হয়েছে। তিনি বলেন, “যখন দেশে কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগের প্রয়োজন, তখন ভারতের কিছু সংস্থা নিজেদের ইস্পাত কারখানা বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করছে।”
তিনি বলেন, “তাই সরকার কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে, তা আমি সত্যিই জানি না।”
“আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি যে আগামী বছর কয়েকটি নির্বাচন রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উত্তর প্রদেশের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ।”
“আমার মনে হয়, বিজেপি এবং বিরোধী শিবির কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, তার প্রকৃত পরীক্ষা হবে এই নির্বাচনগুলোতে।”
“তাই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আমাদের এই নির্বাচনগুলোর ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।”
