ছবির উৎস, Social media / Reuters
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
নেপালে একটি ভূমিকম্পের পর তুষারধস ও আকস্মিক বন্যায় শত শত মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচ শতাধিক জন বিদেশি পর্যটক রয়েছেন।
নেপালি পুলিশের নিশ্চিত করা সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ পর্যটকের সংখ্যা এখন ৫৭৯-এ দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ৪৬৬ জন ২৮টি ভিন্ন দেশের বিদেশি নাগরিক।
তারা বলছে, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ১১৩ জন নেপালি, ৫৪ জন মার্কিন নাগরিক এবং নিখোঁজ ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা ৩৩ জন।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন রয়েছেন।
ট্যুর অপারেটরদের তথ্য উদ্ধৃত করে পর্যটন বোর্ড বলছে, অধিকাংশ যাত্রী ভারত ও নেপালের সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত মানসারোভরের পথে ছিলেন।
এদিকে, নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বুধবার সন্ধ্যার পর জানায় যে, এখন পর্যন্ত ৯৫টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চলছে বলে নেপাল পুলিশ জানিয়েছে।
বুধবার ভোরের দিকে নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুর উত্তরে অবস্থিত রসুয়া জেলায় এ বন্যা আঘাত হানে।
ছবির উৎস, EPA
ছবির উৎস, Reuters
স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে এলাকাটিতে ভূমিকম্প আঘাত হানে বলে প্রাথমিক তথ্যের বরাতে পার্লামেন্টকে জানিয়েছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল।
তিনি জানান, ভূমিকম্পের পর তুষারধস শুরু হয় এবং এর ফলে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। তবে তথ্যগুলো এখনো যাচাই করে দেখা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খানাল বলেন, নেপালের পাশাপাশি চীনও “ব্যাপক ক্ষতির” মুখে পড়েছে।
তিনি জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে নেপাল চীনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত ২৬ জন পুলিশ সদস্য, নয়জন সশস্ত্র পুলিশ সদস্য এবং ৪৪ জন সেনা সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন।
কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের কয়েকজন কর্মকর্তাও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া সড়ক, সেতু, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রসুয়া ও নুওয়াকোট জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ছবির উৎস, Getty Images
চীন ও ভারতে সতর্কতা
দুই দেশের সীমান্তবর্তী একটি বাণিজ্য কেন্দ্রে ভূমিধসের ঘটনায় “ব্যাপক হতাহতের” খবর দিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ তৎপরতা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মাধ্যমিক দুর্যোগ এড়াতে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আগাম সতর্ক বার্তা চালুর তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
চীনা সরকারের পক্ষ থেকেও উদ্ধার ও ত্রাণ কাজ চালানোর জন্য উদ্ধারকারী দলকে তিব্বতে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভি চীন নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর জানায়। স্থানীয় সময় রাত ৮টা পর্যন্ত তিব্বতের জিরং-এ ভূমিধসে তিনজন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ হয়েছেন বলে খবর প্রকাশ করে তারা। সেখানে উদ্ধার অভিযান চলছে বলেও জানানো হয়েছে।
চীনের বিমানবাহিনী তিব্বত সীমান্তবর্তী জিরং শহরের আকাশে একটি ড্রোন উড়াতে সক্ষম হয়েছে, যাতে ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাটির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা যায় বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
ফুটেজে সীমান্ত এলাকায় পানি ও কাদার একটি ভয়াবহ ঢেউ আঘাত হানতে দেখা যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, পিপলস লিবারেশন আর্মি তাদের জরুরি সাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা সক্রিয় করেছে এবং আরও আকাশপথে নজরদারি ও বিমানযোগে সহায়তা মিশনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। পরিবহন বিমান, হেলিকপ্টার এবং ড্রোনও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ভারতেও সতর্কতা
নেপালের দক্ষিণে অবস্থিত ভারতের বিহার রাজ্যের কর্মকর্তারা গণ্ডক নদীর সম্ভাব্য বন্যা নিয়ে সতর্কবার্তা জারি করে বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী বলেছেন, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় বাঁধ পর্যবেক্ষণ, রাতের টহল এবং জরুরি সেবাকর্মী দল মোতায়েনের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
স্থানীয় রেড ক্রস জানিয়েছে, সম্ভাব্য তিন মিটার উচ্চতার ঢেউয়ের আশঙ্কা রয়েছে। তারা বলছে, আজ এর আগে কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর থেকে এলাকায় প্রস্তুতি কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে এবং রাজ্যের তিনটি জেলায় জরুরি সেবাদল মোতায়েন করা হচ্ছে।
প্রয়োজনে সরিয়ে নেওয়ার জন্য এসব দল একটি পরিকল্পনাও প্রস্তুত করেছে।
ছবির উৎস, EPA
নেপালের সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ৮৮ জন বন্যা দুর্গতকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং সৈন্যরা মাইলুং গ্রাম থেকে আরও ১১৫ জনকে উদ্ধারের চেষ্টা করছে।
রাজারাম বাসনেট বিবিসিকে জানিয়েছেন, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের জন্য ১৫টি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে।
নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিমুরে, সিয়াব্রুবেসি এবং বেত্রাবতীতে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, এই বন্যায় ত্রিশুলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষতি হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানের সেতু ভেসে গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, আকস্মিক বন্যার পর আটজন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকের সঙ্গে বর্তমানে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। নিখোঁজ ব্যক্তিরা ওই এলাকায় একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছিলেন।
এতে আরও বলা হয়েছে যে, আরও ১০ জন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক ওই এলাকায় আটকা পড়েছেন এবং উদ্ধারের অপেক্ষায় আছেন। নেপাল সরকার তাদের উদ্ধারের জন্য একটি হেলিকপ্টার পাঠিয়েছে।
ছবির উৎস, Getty Images
নেপালে অবস্থিত চীনা ব্যবসায়ী ইয়ে লিয়াং, যিনি কাঠমান্ডুভিত্তিক একটি লজিস্টিকস কোম্পানির মালিক, বলেছেন যে আকস্মিক বন্যাকবলিত এলাকায় তার প্রতিষ্ঠানের সাতটি কনটেইনার ট্রাক রয়েছে। ট্রাকগুলোতে নেপালি কর্মীরা কাজ করছিলেন।
তিনি বিবিসিকে বলেন, “আমরা তাদের কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারছি না। সেখানে কোনো সিগনাল নেই, তাই কারও কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।”
ইয়ে বলেন, তার জানা মতে, এ বিষয়ে আগে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, “মাঝেমধ্যে কাদাধস এবং ভূমিধস হতো, বিশেষ করে বর্ষাকালে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি অনেক বেশি গুরুতর বলে মনে হচ্ছে।”
তিব্বতের দিকে, সিচুয়ান প্রদেশের গুয়ান দাওশুয়ান বিবিসিকে জানান যে বুধবার বেলা গড়ানোর দিকে তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেন। তার স্ত্রী তিব্বতে সড়ক ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে যুক্ত একটি রাষ্ট্রায়ত্ত নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন।
গুয়ান বলেন, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় নেপালের কর্তৃপক্ষ একটি হেলিকপ্টার পাঠিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করেছিল। তবে প্রবল বাতাসের কারণে উড়োজাহনটির ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছিল।
ছবির উৎস, EPA
