অবসরের জন্য সঞ্চয় শুরু করতে বিপুল অঙ্কের টাকা প্রয়োজন—এমন ধারণা অনেকেরই রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত অল্প অল্প করে বিনিয়োগ করেও তৈরি করা যায় একটি উল্লেখযোগ্য অবসরকালীন তহবিল। জাতীয় পেনশন ব্যবস্থা বা NPS (National Pension System)-এ মাসে ১০০০ টাকা করে বিনিয়োগ তারই একটি উদাহরণ।
ধরা যাক, কোনও বিনিয়োগকারী প্রতি মাসে ১০০০ টাকা করে NPS-এ জমা করছেন। ২০ বছরে তাঁর মোট বিনিয়োগের পরিমাণ হবে ২.৪০ লক্ষ টাকা। গড় বার্ষিক ৯ শতাংশ রিটার্ন পাওয়া গেলে, এই বিনিয়োগের সম্ভাব্য মূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬.৭৩ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ, নিজের পকেট থেকে জমা করা ২.৪০ লক্ষ টাকার পাশাপাশি সম্ভাব্য রিটার্ন হতে পারে প্রায় ৪.৩৩ লক্ষ টাকা।
– বিজ্ঞাপন –
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ৯ শতাংশ রিটার্ন কোনও নিশ্চিত বা গ্যারান্টিযুক্ত রিটার্ন নয়। NPS বাজার-নির্ভর বিনিয়োগ ব্যবস্থা হওয়ায় প্রকৃত রিটার্ন বাজারের পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীর বেছে নেওয়া সম্পদ বণ্টনের উপর নির্ভর করবে।
কী এই NPS?
NPS হল অবসরকালীন সঞ্চয়ের জন্য তৈরি একটি সরকারি নিয়ন্ত্রিত পেনশন ব্যবস্থা। যোগ্য ভারতীয় নাগরিকরা দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত টাকা বিনিয়োগ করে অবসরের জন্য একটি তহবিল তৈরি করতে পারেন। ফিক্সড ডিপোজিটের মতো নির্দিষ্ট সুদের হার এখানে পাওয়া যায় না। NPS-এর রিটার্ন নির্ভর করে বিভিন্ন সম্পদ শ্রেণির পারফরম্যান্সের উপর।
বিনিয়োগকারীরা তাঁদের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা ও আর্থিক লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইক্যুইটি, কর্পোরেট বন্ড এবং সরকারি সিকিউরিটিজ-এর মতো বিকল্পে সম্পদ বণ্টন করতে পারেন।
রয়েছে দুই ধরনের অ্যাকাউন্ট
NPS-এ মূলত Tier-I এবং Tier-II—এই দুই ধরনের অ্যাকাউন্ট রয়েছে। Tier-I হল মূল অবসরকালীন অ্যাকাউন্ট, যেখানে টাকা তোলার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। অন্যদিকে Tier-II অ্যাকাউন্ট তুলনামূলক বেশি নমনীয় এবং নির্দিষ্ট শর্ত মেনে এখান থেকে টাকা তোলার সুযোগ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অবসরের সময় কী হয়?
NPS-এর উদ্দেশ্য মূলত অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি করা। তাই অবসরের সময় পুরো জমা টাকা একসঙ্গে তুলে নেওয়ার পরিবর্তে, প্রযোজ্য নিয়ম ও শর্ত অনুযায়ী একটি অংশ এককালীনভাবে তোলার সুযোগ থাকে। অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে annuity কেনার ব্যবস্থা রয়েছে। সেই annuity থেকে অবসরের পর নিয়মিত আয় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ, NPS অবসরের পরে একদিকে এককালীন অর্থের জোগান দিতে পারে, অন্যদিকে annuity-এর মাধ্যমে নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থাও করতে পারে।
করছাড়ের সুবিধাও রয়েছে
NPS-এ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আয়কর আইনের নির্দিষ্ট ধারায় করছাড় পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে Section 80CCD(1) এবং Section 80CCD(1B)-এর অধীনে নির্দিষ্ট শর্ত ও সীমার মধ্যে করছাড়ের সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। তবে করের নিয়ম এবং করছাড়ের সুবিধা বিনিয়োগকারীর পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য করব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে সর্বশেষ আয়কর বিধি যাচাই করা জরুরি।
মাসে ১০০০ টাকা কি যথেষ্ট?
মাসে ১০০০ টাকা দিয়ে NPS-এ বিনিয়োগ শুরু করা নিঃসন্দেহে একটি ভালো সূচনা হতে পারে। কিন্তু অবসরের জন্য এই পরিমাণ বিনিয়োগ সবার ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে, এমনটা বলা যায় না। অবসরের বয়স, বর্তমান আয়, জীবনযাত্রার খরচ, ভবিষ্যতের প্রয়োজন, মুদ্রাস্ফীতি এবং বিনিয়োগের সময়সীমার মতো একাধিক বিষয়ের উপর প্রয়োজনীয় অবসরকালীন তহবিল নির্ভর করে।
তাই ১০০০ টাকাকে চূড়ান্ত বিনিয়োগের পরিমাণ না ভেবে শুরু করার অঙ্ক হিসেবে দেখা যেতে পারে। আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে অবসরকালীন তহবিল আরও বড় করার সুযোগ থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সময়। দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত বিনিয়োগ করলে চক্রবৃদ্ধি হারে রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে NPS বাজার-নির্ভর হওয়ায় রিটার্ন নিশ্চিত নয়। তাই বিনিয়োগের আগে নিজের বয়স, অবসরের লক্ষ্য, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক প্রয়োজন বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
