ছবির উৎস, Sanchit Khanna/Hindustan Times via Getty Images
দক্ষিণ দিল্লির সাকেত অঞ্চলে আগুল লাগার ঘটনায় কমপক্ষে ২১ জন মানুষের মৃত্যুর পরে আবারও প্রশ্ন উঠছে যে, জাতীয় রাজধানী দিল্লির অভ্যন্তরেই গজিয়ে ওঠা ‘আরবান ভিলেজ’গুলো কেন মরণফাঁদ হয়ে উঠেছে? কেন ঘিঞ্জি এলাকায় নজরদারি এড়িয়ে তোলা হয় বহুতল ভবন? কেন অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না ওই সব এলাকায়?
বুধবার সকালে দক্ষিণ দিল্লির মালভিয়া নগরের একটি আবাসিক হোটেলে আগুন লাগে। ওই এলাকাটি নামকরা চিকিৎসাকেন্দ্র ‘ম্যাক্স হসপিটালের’ খুব কাছেই।
বাংলাদেশি সহ অনেক বিদেশি নাগরিকই দিল্লিতে চিকিৎসা করাতে এসে ওই অঞ্চলের হোটেলগুলিতে ওঠেন।
ইতিমধ্যে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, বুধবারের অগ্নিকাণ্ডে ছয় জন বাংলাদেশি নাগরিককে সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং তিন জন বাংলাদেশি নাগরিকের খোঁজ এখনও মেলেনি।
বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে পাওয়া সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, একজন বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।
ওই হাসপাতালটির সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, মাসে প্রায় দুশো থেকে তিনশো বাংলাদেশি নাগরিক চিকিৎসাজনিত কারণে ম্যাক্স হাসপাতালে আসেন।
ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসা করতে আসা বিভিন্ন বিদেশি রোগী ও রোগীর পরিবারেরা সাধারণত এই অঞ্চলের সস্তা হোটেলগুলোতে এসে ওঠেন ও রাত্রিযাপন করেন।
যে জায়গায় ঘটনাটি ঘটেছে সেটি দিল্লির একাধিক আরবান ভিলেজের মধ্যে একটি। এই অঞ্চলগুলির বৈশিষ্ট হলো ঘিঞ্জি বসতি অঞ্চল, সরু রাস্তা ও বহুতল ভবনের আধিক্য। অনেক সময় একই ভবনে আবাসিকরা যেমন থাকেন, একই সঙ্গে চলে বাণিজ্যিক কর্মকান্ডও।
এধরনে এলাকাগুলি একসময়ে গ্রাম ছিল, পরবর্তীতে দিল্লি শহর যত বেড়েছে এই গ্রামীণ এলাকাগুলিও জুড়ে গেছে শহরের সঙ্গে।
ছবির উৎস, Sanchit Khanna/Hindustan Times via Getty Images
তদন্তে কী জানা যাচ্ছে?
আগুন লাগার প্রাথমিক কারণ হিসেবে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, শর্ট সার্কিটের কারণেই আগুন লাগার অম্ভাবনা বেশি। যেখানে প্রথম আগুন লাগে, সেখানে রাখা ছিল কয়েকটি এলপিজি সিলিন্ডার, যার মধ্যে একটিতে বিস্ফোরণ হয়ে আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
তদন্তে নেমে দিল্লি পুলিশ ওই ভবনটির মালিক লবকেশ বাজাজকে বুধবার রাত্রেই গ্রেফতার করেছে। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, ওই ভবনটিতে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র থাকলেও সেটি বিকল হয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে ভবনটির ঘরগুলিতে একাধিক দাহ্য বস্তু ও আসবাবপত্র ছিল, যা আগুন ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে বলে দাবি করেছে দমকল দফতর।
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে যে ওই ভবনটিতে একাধিক অনিয়ম রয়েছে। ওই ভবনটিতে ২৬টি ঘর ছিল কিন্তু অনুমতি ছিল মাত্র ৬টি ঘরের।
যদিও এই অনিয়ম নিয়ে খুব একটা অনুতপ্ত হতে শোনা যায়নি মালিক লবকেশ বাজাজকে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দিল্লি পুলিশের এক তদন্তকারী জানিয়েছেন, মি. বাজাজকে অনিয়মের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দেন, “দিল্লিতে তো সবই চলে।”
ছবির উৎস, Amarjeet Kumar Singh/Anadolu via Getty Images
সিল করা হয়েছিল জানালা
দিল্লি ফায়ার ডিপার্টমেন্টের মতে, হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে ছাড়পত্র বা এনওসি সংগ্রহ করেনি। উপরন্তু, হোটেলটিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অভাব ছিল।
দিল্লির চিফ ফায়ার অফিসার অভিলাষ মালিক জানিয়েছেন, হোটেলটিকে দিল্লি পর্যটন বিভাগ থেকে বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট হোটেল বা বিঅ্যান্ডবি ) লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল এবং ফায়ার ডিপার্টমেন্টের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি।
অভিলাষ মালিক বলেন, “ভবনটিতে একটি বেসমেন্ট, একটি গ্রাউন্ড ফ্লোর এবং তার উপরে পাঁচটি তলা রয়েছে। বেসমেন্টে দুটি ঘর, প্রতিটি তলায় পাঁচটি করে ঘর এবং ছাদে চারটি ঘর ছিল, যার মধ্যে দুটি গেস্ট রুম হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।”
“ভবনটির কাঠামোর কারণে আগুন নেভানো এবং লোকজনকে উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন ছিল,” জানান মি. মালিক।
বিবিসি ঘটনাস্থল থেকে রেকর্ড করা বেশ কয়েকটি ভিডিও দেখেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে সকাল ১০:৫০-এর পরেও ভবনটি থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এছাড়াও আরও কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছেে লোকজন ভবনটি থেকে লাফিয়ে নিজেদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছেনে।
গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময়ে অভিলাষ মালিক উদ্ধারকর্মীরা যেসব অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছেন, সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, “এই আগুন নেভাতে আমরা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি, কিন্তু ভেতরে থাকা মানুষদের জন্য সমস্যাটা ছিল আরও বেশি।”
ছবির উৎস, Sanchit Khanna/Hindustan Times via Getty Images)
কেন আগুন নেভানো দিল্লিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ?
দিল্লি শহরের মধ্যে যে ছোট ছোট আবাসিক কলোনিগুলি আছে, সেগুলিকে চলতি ভাষায় ‘আরবান ভিলেজ’ বা ‘গাঁও’ বলা হয়। অত্যন্ত ঘিঞ্জি এই অঞ্চলগুলিতে রাস্তাঘাট থাকে অত্যন্ত সরু।
যে জায়গাটিতে আগুন লাগে, সেই অঞ্চল অর্থাৎ হজ রানি অঞ্চলে এমন বহু রাস্তা আছে যেখানে তিনজন মানুষ পাশাপাশি চলতে পারেন না। যদিও রাস্তার দুই দিকে বহু বহুতল ইমারত থাকে।
মুনিরকা, শাহপুর জাট, হজ রানি, খিড়কি এক্সটেনশন, মালভিয়া নগর ইত্যাদি অঞ্চলে এমন বহু ‘আরবান ভিলেজ’ রয়েছে।
এই অঞ্চলের ভবনগুলি একটির সঙ্গে একটি গায়ে গায়ে লেগে থাকে। যাতায়াতের জন্য থাকে একটি মাত্র রাস্তা। বহু ক্ষেত্রে একতলাগুলি দোকানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয় এবং উপরের তলায় বাসিন্দারা থাকেন।
ঘিঞ্জি অবস্থান ও তিন দিক বদ্ধ থাকার কারণে আগুন লাগলে মানুষ অনেক সময়েই ভবন ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারেন না। এই ঘটনাই ঘটেছিল মালভিয়া নগরের আগুন লাগা ওই ভবনটিতে।
মি. মালিক জানিয়েছেন, “ভবনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে ভেতরে থাকা মানুষদের পালানোর প্রায় কোনো সুযোগই ছিল না। জানালাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ ছিল এবং কোনো বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না।”
তিনি বলেন, “এই ধরনের ভবনগুলো খাদের মতো কাজ করে। আগুন লাগার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভবনটি তাপ ও ধোঁয়ায় ভরে যায়, যার ফলে লোকজনকে উদ্ধার করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।”
জনৈক মার্কিন নাগরিক মি. মাইকেল তার পরিবারের চিকিৎসার জন্য দিল্লিতে এসেছিলেন। তিনি পাশের একটি একই ধরনের হোটেলে থাকছিলেন।
বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মি. মাইকেল বলেন, “ভবনটি আগুনে পুড়ে যাচ্ছিল। আমি অনেককে লাফাতে দেখেছি। সেখানে ঢোকা ও বেরোনোর মাত্র একটি পথ ছিল; বের হওয়ার অন্য কোনো উপায় ছিল না।”
আগুন লাগার পর থেকে মি. মাইকেলের অনেক আফ্রিকান-আমেরিকান বন্ধু নিখোঁজ রয়েছেন।
তিনি বিবিসি-কে বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, এত বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির সবচেয়ে বড় কারণ হলো ঢোকা ও বেরোনোর একটিমাত্র পথ। আমার অনেক বন্ধু নিখোঁজ; আমি তাদের সম্পর্কে খোঁজ খবর করছি।”
আগুন লাগার পর স্থানীয় লোকজনই প্রথম এগিয়ে আসেন।
ম্যাক্স হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী ওয়াসিম রাজা এবং তার বেশ কয়েকজন বন্ধু আগুনে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে ব্যস্ত ছিলেন।
মি. রাজা বিবিসিকে বলেন, “হোটেলের প্রধান ফটকটি বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল, সেটি কাটার দিয়ে কাটতে হয়েছিল। বেরোনোর পথ বন্ধ থাকায় লোকজন আটকিয়ে পড়েছিল এবং তাদের কাছে পৌঁছাতে আমাদের অনেক বেগ পেতে হয়েছে।”
