প্রায় জলহীন, বিদ্যুৎহীন গ্রাম। এমতাবস্থায় গ্রামে থাকতে পারেননি কেউ। সেখানকার বাস ছেড়ে একে একে সবাই চলে গিয়েছিলেন শহরে। ‘পরিত্যক্ত’ সেই গ্রামে ঘরের দেওয়াল ভেঙে পড়েছে। কোনও বাড়ির চাল অবশিষ্ট নেই। পরপর ভাঙাচোরা বাড়ির ভিতর পড়ে ধুলোমাখা আসবাবপত্র, ভেঙে পড়া দরজা, পুরনো জুতো, খেলনা, টায়ার, স্টোভ, আরও কত কী! কিন্তু এতদিন পর চিনের ইউনান প্রদেশের সেই পরিত্যক্ত পাহাড়ি গ্রাম ‘ভ্যালি এস’ হয়ে উঠেছে পর্যটনস্থল। আর মিস ঝাংয়ের হাত ধরে গ্রামের সেই ‘পোড়ো বাড়ি’গুলি বদলে গিয়েছে হোম স্টে-তে। পুরনো সব কিছু অটুট রেখে।

আরও পড়ুন:
শুধু ‘ভ্যালি এস’ নয়। চিনের ইউনান প্রদেশের একের পর এক গ্রামে তৈরি হয়েছে হোম স্টে। তার মধ্যে কয়েকটি কুনমিং শহর থেকে ঘণ্টাখানেক বা দেড়েকের রাস্তা। যেমন পাহাড়ঘেরা গ্রাম ওয়ান শি, যার সঙ্গে খুবই মিল রয়েছে আমাদের দার্জিলিং বা সিকিমের। আবার ঝংয়ের মতো কয়েকটি গ্রাম বা শিঝৌ, শুয়াংলাংয়ের মতো পুরনো শহরগুলি দালি শহরের এরহাই হ্রদ ঘেঁষে। তাই হোম স্টে-র মালিকরা শুধু ড্রাগন দেশের বাসিন্দাই নয়, বিদেশ, এমনকী, বাংলার নবদম্পতিদেরও আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন চিনের কুনমিং বা দালিতে গিয়ে মধুচন্দ্রিমার দিনগুলি কাটাতে। দালি থেকে ৫০ মিনিটের দূরত্বের পাহাড়ি সঙ্গীতগ্রাম ‘আনি মো’তেও রয়েছে সুদৃশ্য একাধিক হোম স্টে। মেলে আখরোট আর গ্রামজুড়ে ঘুরে বেড়ানো দেশি মুরগি। এরহাই লেক ঘেঁষা গ্রামগুলিতে রাত প্রতি ঘরের দর ৮০০ থেকে ২০০০ ইউয়ানের মধ্যে। তবে কুনমিং-এর কাছের গ্রামগুলিতে ঘরের দর ২০০ থেকে ৩০০ ইউয়ানের মধ্যেই পড়ে। প্রত্যেকটিতেই প্রাতঃরাশ বিনামূল্যে। মিলবে ‘অথেনটিক’ চিনা খাবারও।

তবে ‘ভ্যালি এস’-এর গল্পটা একটু অন্যরকমের। ‘কপূরের জঙ্গল’ বা ক্যাম্ফর ফরেস্টের মধ্যেই পাহাড়ি গ্রাম ‘ভ্যালি এস’। এই ‘কপূর’ গাছের পাতা লাগে ডিম রান্নার কাজে। আবার জঙ্গলে অভাব নেই বাঁশ গাছেরও। পাশ দিয়ে ‘হুশ’ করেই চলে যায় চিনের হাই স্পিড ট্রেন। কুনমিং শহর থেকে প্রায় ৪৫ মিনিটের দূরত্বে প্রায় একশো বছরের এই গ্রামে একসময় ছিল বিদ্যুৎ, জলের অভাব। দরিদ্র এই গ্রামের বাসিন্দারা ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যান শহরে। গ্রামের ২৭ নম্বর বাড়িটি দাপানছিয়াও টাউন কমিটির এক পার্টি সদস্যের। তিনিও পরিবার নিয়ে থাকতে পারেননি তখনকার এই জল-বিদ্যুৎহীন গ্রামে। তাঁর বাড়ির ভিতর এখনও পড়ে রয়েছে পুরনো জুতো, টায়ার, বাঁশের টুকরি আর কিছু আসবাবপত্র।

কিন্তু কয়েক বছর আগে আশ্চর্য মোড় নেয় সবকিছু। সেখানে আসেন মিস ঝাং। চিন সরকারের সহযোগিতায় ৩০ জনের টিমের সাহায্যে নতুন করে গ্রাম তৈরির কাজে হাত দেন। এখন সেখানে বিদ্যুৎ এসেছে। জলের সরবরাহ কাছেই একটি বাঁধ থেকে। বিভিন্ন হস্তশিল্প অনলাইনে কিনতে হয় এই গ্রামের মাধ্যমেই। এখানেই তৈরি হচ্ছে একের পর এক হোম স্টে। কিন্তু ভেঙে পড়া দেওয়াল, দরজা, ঘরের চাল সবকিছু অটুট রেখে। ব্যবস্থা এমনই যে, প্রয়োজনে ‘ভ্যালি এস’-এর হোম স্টে-তে রান্না করেও খাওয়া যায়। গ্রামের বাসিন্দারা যেভাবে নিজেদের প্রিয় জিনিস, আসবাবপত্র ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলেন, এখনও সেগুলি পড়ে রয়েছে একইভাবে। আর সেগুলি দেখতেই এখন জমে পর্যটকদের ভিড়। ঝাংয়ের টিমের আশা, ধীরে ধীরে এই গ্রামে ফিরে আসুন পুরনো বাসিন্দারা। থাকতে শুরু করুন নিজেদের ভিটেমাটিতেই। এভাবেও যে ফিরে আসা যায়!
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
