চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৬৬৩ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আর এই সময়ে ২ সাংবাদিক হত্যাসহ ৩৪০ সাংবাদিক নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এইচআরএসএসের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরও মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসেও মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা উদ্বেগজনক।
সংস্থাটির তথ্য মতে, গত ৯ মাসে কমপক্ষে ১ হাজার ৫১১ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৬৬৩ জন, যাদের মধ্যে ৩৯৩ (৫৯%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। এ ছাড়া ১৫২ (২২%) জন নারী ও কন্যা শিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৯ জনকে ও আত্মহত্যা করেছেন ৯ জন নারী। এ ছাড়া ৩২৬ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ১৯৩ জন শিশু।
প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতার পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়, জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর এ ৯ মাসে কমপক্ষে ৬৯২টি ‘রাজনৈতিক সহিংসতার’ ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১০৭ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫ হাজার ৫৭৯ জন। আর এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশকেন্দ্রিক সহিংসতা, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখলকে কেন্দ্র করে। সহিংসতার এসব ঘটনা ঘটেছে বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে।
এইচআরএসএস বলছে, বছরের প্রথম ৯ মাসে ২৩৬টি হামলার ঘটনায় ৩৪০ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সব ঘটনায় হত্যা করা হয়েছে দুজন সাংবাদিকে, আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ২০৯ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৩৬ জন। ‘মব’ সহিংসতাকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৯ মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ২৩৯ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩০ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২১২ জন। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ৬১ জন আসামি মারা গেছেন। ৬১ জনের মধ্যে ১৯ জন কয়েদি ও ৪২ জন হাজতি। গত ৯ মাসে ১৭৬টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭৪ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৮২৮ জন।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কমপক্ষে ২২টি হামলার ঘটনায় পাঁচজন আহত, পাঁচটি মন্দির, ৩৭টি প্রতিমা ও ৩৮টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া জমি দখলের মতো তিনটি ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া এই সময়ে সারা দেশে ৫০টিরও বেশি মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৬১টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্র্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে ২৩ জন বাংলাদেশি নিহত, ৩৪ জন আহত, ও ৫৬ জন গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস। গত নয় মাসে কমপক্ষে ১ হাজার ৬৫ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ২০৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে, হেফাজতে ও নির্যাতনে কমপক্ষে ২৮ জন নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে আটজন সংঘর্ষে বা বন্দুকযুদ্ধের নামে, চারজন নির্যাতনে, ১০ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এবং ছয়জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়ে গত ৯ মাসে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১১ জুলাই শুক্রবার রাজধানীর ভাটারা থানায় পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় বিষপান করে ফিরোজা আশরাফ নামে এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকার মৃত্যু হয়।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের প্রথম ৯ মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং অন্য দলের নেতাকর্মীদের নামে কমপক্ষে ১৬৬টি মামলা হয়েছে। এ সব মামলায় ১০ হাজার ৩৮৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৩৪ হাজার ১৩৭ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া ৯ মাসে বিভিন্ন মামলায় এবং যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে কমপক্ষে ৪৪ হাজার ৯৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী।
