চলতি মাসে প্রকাশিত হবে এইচএসসি পরীক্ষার ফল। এ বছর যারা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে এ খবর ইতিমধ্যে তাদের ভেতর মানসিক চাপ তৈরি করেছে। দিন দিন বাড়ছে এই চাপ। তাছাড়া আমরা এমন এক সময়ে আছি, যখন বিশ্বব্যাপী মানসিক চাপ বেড়ে চলেছে। বড়দের মতো কিশোর-কিশোরীরাও এ মুহূর্তে লড়াই করছে। আমরা অদ্ভুত সব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। পরিবর্তনগুলো সহজ নয়, কঠিন। তবে আরও অনেক বিষয় আছে, যা কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। সেসব বিষয়ের মধ্যে আছে- বাড়িতে নেতিবাচক পরিস্থিতি, বন্ধুবান্ধবের অসংগত আচরণ। কখনো আবার নতুন বন্ধু বানানোর মতো ইতিবাচক পরিবর্তনও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপের লক্ষণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। এ কাজ করতে বড়রা কিশোর-কিশোরীদের সহায়তা করবেন। কিশোর-কিশোরীরা যখন মানসিক চাপ অনুভব করে, তখন তা সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করা জরুরি। যাতে সে আরও বেশি মানসিক চাপের ভেতর পড়ে না যায়।
মানসিক চাপের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য যা করা দরকার : মানসিক চাপের কারণ চিহ্নিত করা : চাপ কখন অনুভূত হয় সেই সময়ের কথা মনে রাখতে চেষ্টা করা দরকার। মানসিক চাপের সময় প্রতিক্রিয়া দেখানোর পন্থাগুলো খেয়াল করতে হবে। তখন কী ঘটছিল, মানসিক চাপ অনুভব করার ঠিক আগে মনে কোন ভাবনা এসেছিল, কী অনুভূত হচ্ছিল? যাতে চাপ অনুভূত হয় এমন অসুবিধাগুলো শনাক্ত করতে পারলে, মানসিক চাপ প্রতিরোধ করার বা দ্রুত সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করা সম্ভব হবে। প্রয়োজনে বাবা-মা কিংবা ভরসা করা যায় এমন বড় কারও সহায়তা নিলে ভালো। ভালোবাসার সঙ্গে উত্তর দেওয়া : যদি কারও বন্ধু মানসিক চাপের ভেতর দিয়ে যায় বা কোনো বাবা-মায়ের কিশোর বয়সের সন্তান এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, তবে তাকে বাড়তি ভালোবাসা, সময় এবং তার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। মানসিক চাপ তাদের স্বাস্থ্য, আচরণ, চিন্তা বা অনুভূতিকে প্রভাবিত করছে কি না তা খেয়াল করতে হবে। তাদের কথা শুনতে হবে, সদয়ভাবে কথা বলতে হবে এবং তাদের আশ্বস্ত করতে হবে যে এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। রোল মডেল হওয়া : কেউ নিজে যেভাবে মানসিক চাপের পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে সে সম্পর্কে বন্ধুকে জানাতে হবে। বা বাবা-মা সন্তানকে জানাবেন। নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার মাধ্যমে, বন্ধু বা সন্তানকে মানসিক চাপ সামাল দেওয়ার অভ্যাস খুঁজে পেতে উৎসাহিত করতে হবে, যা তাদের জন্য কাজে আসবে।
ইতিবাচক চিন্তার প্রচার : কিশোর-কিশোরীদের জন্য নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা করা স্বাভাবিক। যদি সে সবসময় ‘আমি কোনো কিছুতেই ভালো নই’, ‘আমি নিজেকে পছন্দ করি না’ বা ‘আমি বাইরে যেতে ভয় পাই’ এমন কথা বলতে থাকে, তাহলে নিজে নিজেকে কিংবা বন্ধু বা বাবা-মা সন্তানকে জিজ্ঞাসা করবেন যে তার এই অনুভূতির কারণ কী এবং তাকে এমন সব সময়ের কথা স্মরণ করতে হবে, যখন সে কোনো কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছিল, আর কীভাবে তা করেছিল। এ ধরনের ইতিবাচক কথা ভাবলে বা শুনলে, মানসিক চাপ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে এবং বিষয়টি বুঝতে পারবে ও আত্মবিশ্বাসী হবে। ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা : ঘুম এবং ভালো খাওয়া-দাওয়া মানসিক চাপের মূল উপশমকারী। বিশেষজ্ঞরা ৬ থেকে ১২ বছর বয়সীদের জন্য রাতে ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেন। কিশোর-কিশোরীদের রাতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। ভালো ঘুমের জন্য রাতে স্ক্রিন ব্যবহার সীমিত করতে হবে এবং বেডরুমে ডিজিটাল ডিভাইস রাখা এড়িয়ে চলতে হবে। একজন কিশোর বা কিশোরী যত ভালো পুষ্টি ও বিশ্রাম পাবে, তত বেশি সে মানসিক চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে। আনন্দময় সময় কাটানো : কিশোর-কিশোরীদের উচিত বাইরে যাওয়া, খেলাধুলা করা এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো। যোগ ব্যায়াম ও গভীরভাবে শ্বাস নেওয়ার মতো ব্যায়াম ও কার্যকলাপ মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। গভীর শ্বাস (শ্বাস নেওয়ার সময় পেট ফুলে উঠবে) খুবই প্রশান্তিদায়ক এবং এটা ফুসফুসের গভীরে অক্সিজেন সরবরাহে সাহায্য করে। এখানে একটি সহজ প্রক্রিয়ার কথা বলা হলো। পেটে হাত রেখে গভীরভাবে শ্বাস টানতে হবে। ৫ সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিয়ে, ৫ সেকেন্ড ধরে নিঃশ্বাস ছাড়তে হবে। শ্বাস নিতে হবে নাক দিয়ে এবং নিঃশ্বাস ছাড়তে হবে মুখ দিয়ে। ব্যাপারটা খানিকটা বেলুন ফোলানোর মতো। কেউ যখন শ্বাস নেবে, তখন সে বেলুনের মতো নরমভাবে পেট ফোলাবে এবং যখন বাতাস ছাড়বে তখন আবার বেলুন থেকে ধীরে ধীরে বাতাস বের করে দেবে।
বড়দের মতো কিশোর-কিশোরীদেরও মাঝেমাঝে নিজের প্রতি সদয় হতে হবে। মানসিক চাপ একটি মানবিক অভিজ্ঞতা যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং কয়েকটি সহজ কৌশল ব্যবহার করে কাটিয়ে ওঠা যেতে পারে। যদি কোনো কিশোর বা কিশোরী মানসিক চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যায় পড়ে, তাহলে একজন প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দেখা করার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে, যিনি সাহায্য করতে পারবেন। পরামর্শের জন্য প্রথমে পারিবারিক চিকিৎসক বা একজন পরামর্শদাতার সঙ্গে কথা বলতে হবে। তিনি বিদ্যমান চিকিৎসার ব্যাপারে পরামর্শ দিতে সক্ষম হবেন। যেমন, একজন মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে দেখা করা, যিনি মানুষকে মানসিক চাপ সামাল দিতে এবং ইতিবাচক মানসিক স্বাস্থ্যের অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা দিয়ে থাকেন। অভিভাবকরা বেশিরভাগ সময় কিশোর-কিশোরীদের জন্য পেশাদার কারও কাছ থেকে সাহায্য চাইতে ভয় পেয়ে থাকেন। এটা অনেকটা সামাজিক ভয়। অনেকে আশঙ্কা করে থাকেন যে মনোবিদের কাছে গেলে অন্যরা ভাববে তার সন্তান মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে গেছে। সেই ভয়ে অনেকে পেশাদার কারও কাছে সহায়তা নিতে চান না। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যদি মানসিক চাপ সন্তানের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব সাহায্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সে মানসিকভাবে ভালো অনুভব করতে পারে।
এছাড়া মানসিক চাপ দূর করার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে : নিয়মিত ব্যায়াম করা : ব্যায়াম মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোনের নিঃসরণ কমায়। সুখী হরমোন হিসেবে পরিচিত এনডোরফিনের মাত্রা বাড়ায়। তাই যত ব্যস্ততাই থাকুক না কেন একটু সময় বের করে ব্যায়াম করার চেষ্টা করতে হবে। যদি জিমে গিয়ে ব্যায়াম করার সময় না হয় তবে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সেটাও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। ঘুমানো : ঘুম শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। ঘুমুতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করা দরকার। নিয়মিত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। সঠিকভাবে খাওয়া : মানসিক চাপে থাকলে খাওয়ার প্রতি অনীহা হতে পারে। মনে রাখতে হবে, না খেয়ে থাকা মানসিক চাপ বা সমস্যাকে কমিয়ে দেবে না বরং খাবার শরীরকে কর্মক্ষম রাখবে এবং মানসিক চাপ দূর করার পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবে। এ সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে হবে। ক্যাফেইন গ্রহণ কমিয়ে দিতে হবে। সকালের নাস্তা ভালোভাবে করা জরুরি। তাড়াহুড়ো করে সকালের নাস্তা করা বা একেবারেই না করা একদম ঠিক নয়। দিনে অন্তত ছোট-বড় মিলিয়ে ছয় বেলা খাবার খেতে হবে। গমের রুটি, পাস্তা ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে। ভিটামিন এ এবং ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া দরকার। পাশাপাশি গ্রিন টি এবং অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার খেলে ভালো হয়।
শিথিল থাকা : মানসিক চাপের সময় দেহ ও মনকে শিথিল রাখা জরুরি। মানসিক চাপের কারণ সহজেই চলে যাবে না। এটা দূর হতে সময় লাগবে। তাই এ সময় নিজেকে শান্ত রাখা প্রয়োজন। মনকে শিথিল রাখতে হালকা ধাঁচের গান শোনা যেতে পারে। আর শরীরকে শিথিল রাখতে স্নান করলে ভালো লাগবে। পার্লারে গিয়ে মানসিক চাপ কমাতে পারে এ রকম মাসাজ করানো যায়। ডায়েরি লেখা : কেউ একজন হয়তো কখনো ডায়েরি লেখেনি। তবুও মানসিক চাপের এ সময়টায় নোট প্যাড বা ডায়েরিতে কিছু লেখার চেষ্টা করা দরকার। যে বিষয়টি কষ্ট দিচ্ছে, মানসিক চাপের কারণ হচ্ছে সেটা ডায়েরিতে লিখে ফেলা। পাশাপাশি নিজের চাওয়া বা কী করলে ভালো লাগত সেই বিষয়টিও লেখা যেতে পারে। ডায়েরি লেখার এই অভ্যাসটি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। যোগ ব্যায়াম ও ধ্যান করা : মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান করা যেতে পারে। ধ্যানের সময় গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম শরীরকে শিথিল করে। ধ্যান আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি চাপ কমাতে যোগ ব্যায়ামও করা যায়। পছন্দের কাজ করা : কেউ হয়তো গান গাইতে বা ছবি আঁকতে পছন্দ করে। মানসিক চাপের সময় এই পছন্দের কাজগুলো করা দরকার এবং কাজগুলোর মাধ্যমে নিজেকে সময় দিতে হবে। নেতিবাচক চিন্তা এড়িয়ে চলা : নেতিবাচক চিন্তা হয়তো সব সময় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তবে চেষ্টা করতে হবে ইতিবাচক চিন্তা করতে। ভাবতে হবে, যা চাওয়া হচ্ছে তা ইতিবাচকভাবেই পাওয়া যাবে। এটা মানসিক চাপ দূর করতে ভীষণভাবে সাহায্য করে।
নিজেকে গোছানো : জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং সেই অনুযায়ী নিজেকে গোছানো জরুরি। জীবনযাপনকে রুটিনের ভেতরে নিয়ে আসা দরকার। খাওয়া, ঘুমানো, প্রতিদিনের আবশ্যিক কাজ এবং নিজের পছন্দের কাজ সবকিছুর জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সব পরিবর্তন হয় না : হয়তো খুব কাছের কারও মৃত্যু মনকে প্রচণ্ডভাবে ভেঙে দিতে পারে বা কোনো ঘটনা এতটাই আহত করতে পারে যে, মনে হবে এর চাপ বহন করা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। ভাবতে হবে অতীত ফিরিয়ে আনা সম্ভব বা ঠিক করা সম্ভব কি না? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে এটা নিয়ে ভাবনা বন্ধ করে দিতে হবে। কেননা সবকিছু পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আর সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণেও থাকে না। কাছের বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা : মানসিক চাপের কারণ নিয়ে কাছের বন্ধুর সঙ্গে কথা বললে ভালো লাগবে। বন্ধুকে সাহায্য করার জন্য বলা যেতে পারে। তবে এমন বন্ধুকে বলা ঠিক হবে না, যে বুঝবে না অথবা এক পর্যায়ে উপহাস করবে। নিজের সঙ্গে কথা বলা : নিজের সঙ্গে কথা বললে মানসিক চাপ কমে যায়। কোন বিষয়গুলো মানসিক চাপে ফেলছে, কী করলে চাপ কম হতো, বর্তমানে কী অবস্থা, এর পরিপ্রেক্ষিতে কী করা যেতে পারে এগুলো নিয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলা যায়। চাপ দূর করতে কী করা প্রয়োজন, তার তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। নিজের চাহিদা অনুসারে তালিকাটি সাজাতে হবে এবং সেই তালিকা অনুসারে উদ্যোগ নিতে হবে। এই কাজের চর্চা মানসিক চাপ দূর করতে সাহায্য করবে। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে এমন কোনো তালা তৈরি হয়নি, যার চাবি নেই। সব সমস্যার সমাধান আছে। অস্থির না হয়ে শান্তভাবে সমাধানের সন্ধান করে যেতে হবে।
লেখক: চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ
