দশকের পর দশক ভারতের সবচেয়ে বড় জনসংখ্যাগত উদ্বেগ ছিল ‘অতিরিক্ত জনসংখ্যা’। এবার ছবিটা বদলাচ্ছে। জন্মহার দ্রুত কমে যাওয়ায় আগামী কয়েক দশকে ভারতে বাড়তে পারে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা, কমতে পারে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত। Moody’s Ratings-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে এমনই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত ইতিমধ্যেই ২০২৪ নাগাদ ‘ageing’ বা বার্ধক্যের প্রাথমিক পর্যায়ে ঢুকে পড়েছে। ৬৫ বছরের বেশি বয়সিদের অংশ ১৪ শতাংশে পৌঁছলে কোনও দেশকে ‘aged’ এবং ২১ শতাংশে পৌঁছলে ‘super-aged’ বলা হয়। ভারতের ক্ষেত্রে ২০৪৯ নাগাদ ‘aged’ এবং ২০৬৫ নাগাদ ‘super-aged’ পর্যায়ে পৌঁছনোর পূর্বাভাস দিয়েছে Moody’s। অর্থাৎ মাত্র ১৬ বছরের ব্যবধানে এই দুই পর্যায় পেরোতে পারে দেশ। আমেরিকার ক্ষেত্রে এই সময় প্রায় ১৯ বছর এবং ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে ২৯ বছর।
– বিজ্ঞাপন –
কমছে প্রজননহার
এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ জন্মহার কমে যাওয়া। ভারতে মোট প্রজননহার বা TFR এখন প্রায় ১.৯, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার ‘replacement level’ ২.১-এর নীচে। EAC-PM-এর একটি গবেষণাতেও একই TFR-এর উল্লেখ রয়েছে। বিহার ও উত্তরপ্রদেশকে বাদ দিলে এই হার আরও কমে ১.৬।
তবে জন্মহার কমলেও ভারতের মোট জনসংখ্যা এখনও বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ জনসংখ্যার ‘momentum’—অর্থাৎ অতীতে বেশি জন্মের ফলে তৈরি হওয়া বড় জনগোষ্ঠী এখনও প্রজননক্ষম বয়সে রয়েছে এবং একই সঙ্গে মানুষের গড় আয়ুও বেড়েছে।
অর্থনীতিতেও পড়বে প্রভাব
জনসংখ্যার বয়স কাঠামোর এই বদল শুধু সামাজিক নয়, অর্থনীতির উপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমলে শ্রমের জোগান এবং উৎপাদন ক্ষমতায় চাপ পড়তে পারে। একই সঙ্গে পরিবারের সংখ্যা ও তরুণ ভোক্তার সংখ্যা কমলে আবাসন, গাড়ি, শিক্ষা-সহ একাধিক ক্ষেত্রে চাহিদার চরিত্র বদলাতে পারে। Moody’s-এর মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির যে সুবিধা এত দিন ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে সমর্থন করেছে, জন্মহার কমার সঙ্গে সেই সুবিধা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, উন্নত দেশগুলির তুলনায় ভারত তুলনামূলক কম আয়েই বার্ধক্যের ব্যয়ের মুখোমুখি হবে। পেনশন, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার খরচ বাড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
প্রবীণ বাড়বে দ্রুত
UNFPA-র India Ageing Report-ও ভারতের দ্রুত বার্ধক্যের ছবি তুলে ধরেছে। ২০২২ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৭৯ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০৪৬ সালের মধ্যেই দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ০–১৫ বছর বয়সি শিশুদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো ভারতের জন্য বড় সুযোগ। পাশাপাশি প্রযুক্তি, দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগও জরুরি।
তবে এখনই ভারত জাপানের মতো প্রবীণ-প্রধান দেশ নয়। Moody’s-এর বিশ্লেষণেও ভারতকে এখনও তুলনামূলক তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু ‘তরুণ ভারতের’ এই সুবিধার সময়সীমা দ্রুত ছোট হচ্ছে। আগামী ১৫–২০ বছরে জনসংখ্যার এই পরিবর্তনের সঙ্গে ভারত কতটা সফল ভাবে মানিয়ে নিতে পারে, তার উপরই অনেকটাই নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গতিপথ।
