খবর অনলাইন ডেস্ক: প্রয়াত বর্ষীয়ান অভিনেতা ও চলচ্চিত্রনির্মাতা নানা পাটেকর। হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে গোয়ার নিজের বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে গোয়ার ডোনা পাউলার বাড়ি থেকে মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে সাড়া মেলেনি। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, বাড়িতে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় নানা পাটেকরকে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁর হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করার জন্য সিপিআর বা কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন দেন। দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা করেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
– বিজ্ঞাপন –
মণিপাল হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক শেখর সালকার সংবাদ সংস্থা এএনআইকে জানিয়েছেন, প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে একটানা সিপিআর দেওয়ার পরেও নানা পাটেকরকে বাঁচানো যায়নি। ঘটনায় একটি মেডিকো-লিগ্যাল কেস বা চিকিৎসা-আইনি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। তাঁর দেহের ময়নাতদন্তও করা হবে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে।
নানা পাটেকরের ছেলে মালহার পাটেকর তখন পুনেতে ছিলেন। বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তিনি গোয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
নানা পাটেকরের চলচ্চিত্রজীবন
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে বিশ্বনাথ পাটেকর নামে জন্মগ্রহণ করেন নানা পাটেকর। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক হয়। পরবর্তী সময়ে একের পর এক শক্তিশালী অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি বলিউডের অন্যতম পরিচিত অভিনেতা হয়ে ওঠেন।
‘সালাম বম্বে!’ এবং ‘পরিন্দা’ ছবিতে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। ‘পরিন্দা’ ছবিতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন আন্না শেঠের চরিত্রে তাঁর তীব্র ও প্রভাবশালী অভিনয় তাঁকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সহ-অভিনেতার সম্মান এনে দেয়। এই চরিত্রের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়ের স্বতন্ত্র ও নাটকীয় ধরন আরও প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিজ্ঞাপন
এর পর ‘অঙ্গার’, ‘তিরঙ্গা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘যশবন্ত’, ‘অব তক ছাপ্পান’, ‘অপরহণ’ এবং ‘রাজনীতি’-র মতো ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। প্রতিটি ছবিতেই তাঁর অভিনয়ের ধরন ছিল আলাদা এবং দর্শকের কাছে তা বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য হয়।
২০০৭ সালের জনপ্রিয় ছবি ‘ওয়েলকাম’-এ উদয় শেঠির চরিত্রে তাঁর অভিনয়ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ছবির সংলাপ ও চরিত্রটি পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে এবং নানা পাটেকরের অভিনীত অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র হিসেবে জায়গা করে নেয়।
তিনটি প্রধান অভিনয় বিভাগেই ফিল্মফেয়ার পুরস্কার
হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি বিশেষ নজিরও রয়েছে নানা পাটেকরের। ফিল্মফেয়ারের তিনটি প্রধান অভিনয় বিভাগেই পুরস্কার জেতা প্রথম অভিনেতা হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়।
‘পরিন্দা’ ছবির জন্য তিনি সেরা সহ-অভিনেতার পুরস্কার পান। ‘ক্রান্তিবীর’-এর জন্য সেরা অভিনেতা এবং ‘অঙ্গার’ ও ‘অপরহণ’-এর জন্য সেরা খলনায়কের পুরস্কার পান তিনি।
‘অগ্নিসাক্ষী’ ছবিতে এক অতিরিক্ত অধিকারবোধসম্পন্ন স্বামীর চরিত্রে তাঁর অভিনয়ও ব্যাপক প্রশংসা পায়। এই অভিনয়ের জন্য তিনি দ্বিতীয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সহ-অভিনেতার সম্মান অর্জন করেন।
পদ্মশ্রী সম্মান
চলচ্চিত্র ও শিল্পকলায় তাঁর দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে নানা পাটেকরকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়। ভারত সরকারের দেওয়া দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক সম্মানগুলির মধ্যে পদ্মশ্রী চতুর্থ সর্বোচ্চ স্তরের সম্মান।
দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর কখনও নায়ক, কখনও খলনায়ক, আবার কখনও চরিত্রাভিনেতা হিসেবে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁর সংলাপ বলার ধরন, আবেগঘন অভিনয় এবং শক্তিশালী পর্দা উপস্থিতি তাঁকে হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম স্বতন্ত্র অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তাঁর মৃত্যুতে হিন্দি চলচ্চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
