
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বাংলাদেশের কুমিল্লায় হত্যাকাণ্ডের শিকার কিশোর অপ্রতিমের দুই দফা জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন তার পিতা।
ঢাকায় সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন সব আসামিকে গ্রেফতার ও সব আলামত জব্দ করেছে পুলিশ।
“আজ এক জন ও আগে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা অনেকটা কিশোর অপরাধী চক্রের মতো। তাদের সাথে এই ছেলের (অপ্রতিম) সম্পর্ক ছিল, ওঠাবসা ছিল, বন্ধুত্ব ছিল। প্রায় সময় আড্ডা দিত। খোঁজখবর ও অন্য তথ্য নিয়ে দেখা গেছে,” প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন তিনি।
ঢাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রিফিংয়ের কিছুক্ষণ পর কুমিল্লায় সংবাদ সম্মেলন করে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো: আনিসুজ্জামান। তিনি দাবি করেন, আইফোন ছিনিয়ে নিতে বাধা দেওয়ায় অপ্রতিমকে নিখোঁজ হওয়ার দিন বিকেল ৫-৬টার মধ্যে মেরে ফেলার তথ্য দিয়েছেন আটককৃতরা।
এদিকে অপ্রতিমের হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও দ্রুত বিচারসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
কুমিল্লা থেকে বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা নাগিব বাহার জানিয়েছেন, ঘটনাটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নিহত কিশোরের মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক। স্থানীয় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী কিশোরটি সেখানেই জন্মের পর বেড়ে উঠছিল।
ছবির উৎস, Nagib Bahar
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ ঘটনায় দেশবাসী মর্মাহত ।
“একটা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। তার ১২ ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহভাজন সব আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আজ ১ জন ও আগে ৩ জন গ্রেফতার হয়েছে। তারা অপরাধ স্বীকার করেছে। এখন বাকী আইনানুগ প্রক্রিয়া চলমান,” বলেছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ” দুই জনের বয়স ১৮ বছরের বেশি। একজনের বয়স কম হতে পারে, এনআইডি চেক করা হচ্ছে। তারা অনেকটা কিশোর অপরাধী চক্রের মতো। তাদের সাথে এই ছেলের (অপ্রতিম) সম্পর্ক, ওঠাবসা, বন্ধুত্ব ছিল। প্রায় সময় আড্ডা দিত। খোঁজখবর ও অন্য তথ্য নিয়ে দেখা গেছে। তারা এই ছেলের ৫-১০ বছরের বড়”।
তিনি বলেন, যে মোবাইল নিয়ে ঘটনা সেটা উদ্ধার করা হয়েছে প্রধান সন্দেহভাজন আসামির কাছে। সব আলামত পাওয়া গেছে। তারা ঘটনা স্বীকার করেছে। পুলিশ অন্য আইনি কার্যক্রম বা ১৬৪ করানো যায় কি না তা নিয়ে কাজ করছে।
“পুলিশের প্রশংসা করতে পারি যে তারা ১২ ঘণ্টার মধ্যে সব আসামি গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। আলামত জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে।তারা ফরেনসিক এনালাইসিস করছে। আশা করি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার সংক্ষিপ্ত সময়ে সমাপ্ত করাতে পারবো। বিচার করবে আদালত। আমরা সহযোগিতা করবো। আশা করি বিচার বিভাগ গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নিবেন,” বলেছেন মি. আহমদ।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো: আনিসুজ্জামান এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন যে, ঘটনার সাথে জড়িতদের আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার মূল রহস্য তারা উদঘাটন করেছেন।
আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়ার তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ”পরিকল্পিতভাবে নির্জন স্থানে নেওয়ার পর আইফোন ছিনিয়ে নিতে বাধা দেওয়ায় অপ্রতিমকে ঘটনার দিন বিকেল ৫-৬টার মধ্যে মেরে ফেলা হয়েছে। এ সময় তিন জন বাঁশ দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেছিল”।
“হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করেছি। মূল আসামি গ্রেফতার করেছি। যে আইফোনের কারণে হত্যাকাণ্ড সেটি আসামিদের দেখানো মতে গ্রেফতার করেছি। দ্রুত আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করবো,” বলেছেন তিনি।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, “অপ্রতিমের যে আইফোন ছিল তা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতিম বাধা দেয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এসময় প্রথমে তুহিন, পরবর্তীতে ফাহাদ ও কামরুল বাশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় উপুর্যপুরি আঘাত করে। এক পর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হলে তুহিন অপ্রতিমের আইফোন নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এছাড়া সিয়াম নামে আরেকজনকে আটক করা হয়েছে। তার বিষয়ে যাচাই বাছাই করা হচ্ছে”।
“আমরা ইতোমধ্যে ঘট্নার সাথে জড়িত ফাহাদ, তুহিন ও কামরুলকে ঘটনার সাথে জড়িত হিসেবে গ্রেফতার করেছি। ঘটনার সাথে জড়িত অন্য বিষয় এবং আরও কার সম্পৃক্ত আছে কি-না সে বিষয়ে তদন্ত চলমান আছে,” বলেছেন তিনি।
সন্দেহভাজন আসামিদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, “অসম বন্ধুত্ব ছিল। অপ্রতীম ক্লাস সেভেনে পড়ত। এরা তার সহপাঠী ছিল না। এরা বয়সে তার সিনিয়র ও বখাটে ছিল। কিছু ভিডিও আছে টিকটক করতো অপ্রতীমসহ বাকী আসামিরা। আমরা রহস্য উদঘাটন করেছি। আসামির দেখানো মতে আইেফানটি উদ্ধার করেছি। দ্রুত পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করবো,” বলেছেন পুলিশ সুপার।

বিক্ষোভ, মামলা ও দাফন
শুক্রবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম।
পরে জানা যায়, মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য বেড়িয়েছিল শিশুটি। এরপর থেকে তাকে আর পাওয়া যাচ্ছিল না।
ওইদিনই ছেলেকে নিয়ে তার মায়ের একটি ফেসবুক পোস্ট সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদের পাশাপাশি তাকে খুঁজে বের করার আকুতিতে জানিয়ে দেওয়া পোস্টে সয়লাব হয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যম।
ওইদিন থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন শিশুটির পিতা।
পরে শনিবার দুপুরে কিশোরটির রক্তাক্ত মরদেহ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে পুলিশ শিশুটির শরীরে আঘাত থাকার কথা জানায়।
লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গলে কাজ করতে গিয়ে অপ্রতিমের মরদেহ দেখতে পান স্থানীয় যুবক মোহাম্মদ আব্দুল কাদির জ্বিলানী।
তিনি জানান, “আমার ভাতিজা প্রথমে জঙ্গলে একটা বাচ্চাকে পড়ে থাকতে দেখে। আমাকে বললে কাছে এসে দেখি বাচ্চাটা পড়ে আছে, মাথায় রক্ত। দেখে আমরা ভয় পেয়ে কাজ ফেলে চলে গেছি।”
পরে স্থানীয় লোকজন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশকে জানালে দুপুরের দিকে ওই জঙ্গল থেকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এরপরই সন্দেহভাজন কয়েকজনের সাথে শিশুটির ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ছবির উৎস, JIBON
সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে শনিবার রাত দশটা পর্যন্ত এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটকের কথা জানিয়েছিল পুলিশ। আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও একজনকে গ্রেফতারের তথ্য দিয়েছে।
এর মধ্যে একজনের বাড়ি থেকে অপ্রতিম সাথে করে নিয়ে যাওয়া আইফোনটি উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
ওদিকে আজ সকালে প্রথমে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে ও পরে বেলা ১১টায় অপ্রতিমের বাসা সংলগ্ন এলাকায় গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন হয়। এসব জানাজায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও স্থানীয়রা অংশ নিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় মাঠের জানাজায় তার পিতা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার অশ্রুসজল কণ্ঠে বলেন, “আমার একটাই ছেলে। আমার ছেলে আপনাদের কুমিল্লায় আবহাওয়ায়, কুমিল্লার আকাশের নীচে আপনাদের ভালোবাসায়, আপনাদের স্নেহে বড় হয়েছিল। ওর বয়স ১৩ বছর। ওর বাবা হিসেবে ক্ষমাপ্রার্থী, ওর আচরণে ত্রুটি থাকলে ক্ষমতা করে দিবেন। আমার একটাই সন্তান। মাতৃভূমি বলেন এটাই। ও ছোটো থেকে এখানে বড়, আপনাদের ভালোবাসায় বড় হয়েছে”।
পরে ঈদগাহ মাঠের জানাজায় তিনি বলেন, “কাউকে যেন আমার মতো সন্তান হারাতে না হয়। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ কতটা কষ্টের, সেটা আজ বুঝতে পারছি”।
পরে পরিবারের ইচ্ছায় কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকায় নিজেদের বাড়ি সংলগ্ন এলাকাতেই তাকে দাফন করা হয়েছে।
এর আগে সকাল থেকে আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীসহ অসংখ্য মানুষ শিশুটির বাসায় ভিড় করতে থাকে। এসময় তার মরদেহ একটি লাশবাহী গাড়িতে রাখা ছিল।
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দ্রুত সব অপরাধীতে গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করে এবং এক পর্যায়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে।
ঘটনাস্থল থেকে বিবিসি সংবাদদাতা নাগিব বাহার বলেছেন, “শিক্ষার্থীরা বলেছেন যে ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত বিচার করে শাস্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা”।
ঢাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সব আসামি গ্রেফতার ও আলামত জব্দ হওয়ায় আদালতে এ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার সম্ভব হবে তারাও আশা করছেন।
