ছবির উৎস, Getty Images
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বাংলাদেশে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি নামে পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের জন্য প্রস্তাবিত আইনের খসড়া প্রকাশের পর এ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে।
বিশেষ করে নতুন আইনের খসড়া অনুযায়ী প্রস্তাবিত এসআরবির সাথে বর্তমান র্যাব বা এর কাজের ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন অনুবিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, আইনটির খসড়া সম্পর্কে এখন মতামত নেওয়া হচ্ছে, এরপর আইনটিতে কোনো সংশোধনী বা পরিবর্তন আনার দরকার হলে তা এনে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
এরপর আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় ভেটিং শেষে এটি বিল আকারে উপস্থাপনের জন্য জাতীয় সংসদে যাবে এবং সংসদে পাশ হলে এটি আইনে পরিণত হবে। এরপর ওই আইনের ভিত্তিতে র্যাব বিলুপ্ত হয়ে এসআরবি গঠিত হবে।
র্যাব ২০০৪ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে পুলিশের বিশেষ বাহিনী হিসেবে গঠন করা হয়েছিল। শুরু থেকেই এই বাহিনীটির বিরুদ্ধে কথিত ক্রসফায়ারের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠতে থাকে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেই সময় থেকে বিএনপির ক্ষমতার মেয়াদ ২০০৬ সালে শেষ হওয়া পর্যন্ত সময়েই র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৩৮০ জন নিহত হয়েছে।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এ ধরনের অভিযোগে আরও অনেকে বেড়ে গিয়েছিল এবং কক্সবাজারের একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর এই বাহিনী এবং এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির গঠিত পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলনে করে র্যাবের বিলুপ্তি দাবি করেছিল। ওই কমিটির প্রধান ছিলেন বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
ছবির উৎস, Getty Images
এসআরবির খসড়ায় কী আছে
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এসআরবি গঠনের জন্য প্রস্তাবিত আইনের যে খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, এটি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হবে।
পুলিশ ও শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা কর্মচারীদের পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এই ইউনিটটি গঠিত হবে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরও নির্ধারিত শর্তে এই ইউনিটের চাকরিতে প্রেষণে নিযুক্ত বা অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত করা যাবে।
এই ইউনিটের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কার্যাবলী সম্পর্কে আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে – দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বেআইনি অস্ত্র গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদকদ্রব্য উদ্ধার, সাইবার অপরাধ দমন, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, নারী শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, পাচাররোধ, অপহরণসহ মানবতাবিরোধী কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমন, গুম খু্ন ও ভূমি দস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অন্য বাহিনীকে সহায়তা।
খসড়ায় ‘প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দকরণ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা’- শীর্ষক অংশে এসআরবিকে ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত অন্যান্য আইন প্রতিপালন সাপেক্ষে কিছু জায়গায় প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দকরণ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
ছবির উৎস, https://moha.gov.bd/
এছাড়া অন্য আইনে যাই থাকুক এই আইনের অধীনে তল্লাশি, আটক, জব্দকরণ ও গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে এই ইউনিটের একজন কর্মকর্তা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।
এই ইউনিট কোনো সদস্য কাউকে গ্রেফতার করলে বা আলামত জব্দ করলে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি বা জব্দ করা আলামত অবিলম্বে নিকটবর্তী থানায় হস্তান্তর করবে বলে খসড়ায় বলা হয়েছে।
নতুন এই ইউনিটকে ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে আইনের খসড়ায়।
এতে শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজের জন্য বাহিনীদের সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তের এখতিয়ার মহাপরিচালকের হাতেই রাখা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, “এই আইনের অধীন সুষ্ঠু তদন্ত কার্য পরিচালনার প্রয়োজনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন এর হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকবে এবং জব্দকৃত মালামাল আদালতের আদেশমতে বা সরকারের বিধি মোতাবেক নিষ্পত্তি করতে হবে”।
আইনটিতে ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠন’ এর প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো নাগরিক অভিযোগ করলে তা প্রতিকারের কাজ করবে এই কমিটি, যার প্রধান হবেন ইউনিটের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক।
খসড়ার এই অংশে বলা হয়েছে, “প্রয়োজনে নাগরিকের অভিযোগ বা সংক্ষোভ নিরসনে নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ অনুসন্ধান দল গঠনপূর্বক বিভাগীয় কার্যপদ্ধতিতে অনুসন্ধান করা যাবে”।

নতুন কিছু হলো?
মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটন বলছেন, “বর্তমান র্যাব আছে, সেটাকে পুনস্থাপিত করা হচ্ছে এসআরবি দিয়ে। মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। নতুন মোড়কে পুরনো জিনিসই আইনের খসড়ায় দেওয়া আছে। আগের চেহারার নতুন বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে”।
তিনি বলেন, ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকায় দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো র্যাব বিলুপ্তির পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের দ্বারাই বিশেষায়িত টিম গঠনের পরামর্শ দিয়ে আসছিল।
“কিন্তু এখানে র্যাবের মতোই দেশ প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকা বাহিনী থেকেও আসার সুযোগ রাখা হয়েছে। অথচ সেনাবাহিনী ও পুলিশের কাজের ধরন এক না। তাদের প্রশিক্ষণও এক না। অভ্যন্তরীণ অপরাধ দমনে প্রয়োজনে পুলিশের বিশেষ টিম,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
নূর খান লিটন বলছেন, এছাড়া নতুন আইনেও মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ রাখা হয়নি, যা রাখা জরুরি।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান ও পুলিশ সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলছেন, আগে র্যাব শুধু গ্রেফতারসহ অন্য কার্যক্রম করতো, কিন্তু খসড়া আইন অনুযায়ী প্রস্তাবিত নতুন ইউনিটকে তদন্ত করার ক্ষমতাও দেওয়া হযেছে।
“এখানে নাগরিকদের অভিযোগ করার একটা সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে যে কোনো নাগরিক অভিযোগ করতে পারবে। এসব অভিযোগ প্রতিকারে বাহিনীর লোকজন ছাড়া অন্যদের কর্তৃপক্ষ সংযুক্ত করতে পারবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
যদিও নূর খান লিটন বলছেন, বাহিনীর লোকজনের বাইরেও কাউকে সংযুক্ত করার সুযোগ থাকলেও যেহেতু সেটি কর্তৃপক্ষই করবেন ফলে সেখানে নিরপেক্ষ লোকজন আসবে কি না এবং তারা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন সেই শঙ্কা থেকেই যাবে।
মি. ফারুক বলছেন, প্রস্তাবিত এসআরবির ক্ষেত্রে নিজেদের সদস্যদের জবাবদিহিতার ও স্বচ্ছতার বিষয়টি আইনের খসড়ায় জোরালোভাবে এসেছে, যা র্যাব আইনে ছিল না।
“স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে এবার কিছুটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে মানবাধিকারকে সুরক্ষা দিয়ে বাহিনী কীভাবে কুইক রেসপন্স করবে তা নিয়ে খসড়া কিছু বলা নেই,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খসড়ার ওপর পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে আইনটিকে আরও পরিমার্জিত করার জন্য একটি কমিটি কাজ করে যাচ্ছে।
