ছবির উৎস, MITHUN GOSWAMI
“সবাই বাস থেকে নেমে ঘাটের পাশ দিয়ে হেঁটে আসছিলাম। সামনে তাকাই দেখি আমাদের বাসটা গতির সাথে চোখের পলকে পানিতে পড়ে গেল।”
এভাবেই বলছিলেন রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দুর্ঘটনা কবলিত বাসের যাত্রী আব্দুল আহাদ। তিনি জানান, ফেরিঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়, শুরুতে কয়েকজন যাত্রী বাস থেকে নামতে রাজি ছিলেন না।
“কয়েকজন নামতে চাচ্ছিল না, পরে তাদেরকে অনেকটা জোর করেই বাস থেকে নামানো হয়,” বলেন মি. আহাদ।
শুক্রবার সকালে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায় কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ নামের যাত্রীবাহী বাসটি।
এই দুর্ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে নৌপুলিশ এবং রাজবাড়ি জেলা প্রশাসন। বেলা বারোটা নাগাদ বাসটিকে নদী থেকে টেনে তোলা সম্ভব হয়েছে বলেও জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
নৌ পুলিশ বলছে, দুর্ঘটনার পরই ডুবে যাওয়া বাসটির চালক এবং তার সহযোগীকে উদ্ধার করে দৌলতদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের মার্চে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহন নামের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে গেলে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
ওই দুর্ঘটনার পর থেকেই- ফেরিতে ওঠার সময় ঘাট এলাকায় যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা দিয়েছিল প্রশাসন।
ছবির উৎস, MITHUN GOSWAMI
দুর্ঘটনা নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
শুক্রবার সকালে ৩৮ জন যাত্রী নিয়ে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে এসবি সুপার ডিলাক্স পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস।
সকাল দশটার কিছু আগে দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় বাসটি দুর্ঘটনার শিকার হয়। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যায় পদ্মা নদীতে।
বাসের যাত্রী এবং স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা জানিয়েছেন, ফেরিতে ওঠার সময় দাঁড়িয়ে থাকা অন্য একটি ফেরিতে ধাক্কা খায় দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি।
পানিতে পড়ার পর মুহূর্তেই বাসটি তলিয়ে যায়। এসময় বাসের চালক এবং তার সহকারী পানিতে ভেসে উঠলে তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ফেরিঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় যাত্রীদেরকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও নিশ্চিত করেন বাসটির একজন যাত্রী।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী মিঠুন গোস্বামী বলছেন, বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর নামে একটি ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারায় যাত্রীবাহী বাসটি।
মূলত ফেরিতে ওঠার সময় ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য একটি ফেরির র্যামে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনাকবলিত বাসের চালক নিয়ন্ত্রণ হারান বলে জানান মি. গোস্বামী।
দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ পরই উদ্ধার অভিযান শুরু করে ফায়ার সার্ভিস এবং বিআইডব্লিউটিএ এর ডুবুরি দল। পরে উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয় উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা।
ছবির উৎস, MITHUN GOSWAMI
নৌ পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল দশটার একটু আগে এই দুর্ঘটনা ঘটে। ডুবে যাওয়া বাসের যাত্রীদেরকে ফেরিতে ওঠার আগেই নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও জানায় পুলিশ।
“উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা আসছে, কাজ শুরু করেছে। আমার নৌ-পুলিশ উপর থেকে যাত্রীদেরকে নামিয়ে দিয়েছিল। ড্রাইভর, হেলপার, সুপারভাইজারকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে জানান দৌলতদিয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ত্রিনাথ সাহা।
ফেরিতে ওঠার সময় বাসটিতে কোনো যাত্রী না থাকায় বড়ো ধরনের হতাহতের ঘটনা এড়ানো গেছে বলে জানিয়েছেন রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন।
“বাসটিতে থাকা ৩৮ জন যাত্রীকে ফেরিঘাটেই নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনায় উদ্ধার অভিযান চলছে, এখনও কোনো হতাহতের খবর নেই। কারো নিখোঁজ থাকার দাবিও প্রশাসনে কাছে কেউ করেনি,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
এদিকে, প্রায় দুই ঘণ্টার অভিযানে বেলা বারোটার দিকে বাসটিকে পানি থেকে টেনে তোলে উদ্ধারকারীরা।
রাজবাড়ী ফায়ারসার্ভিসের কর্মকর্তা সোহেল রানা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাকবলিত বাসের চালক এবং তার সহকারিকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়েছে।
জীবিত বা মৃত আর কাউকে বাসের ভেতরে পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।
“কম সময়ের মধ্যেই আমরা বাসটিকে উদ্ধার করতে পেরেছি। বাসের ভেতরে কিংবা অন্য কোথাও কেউ নিখোঁজ আছে এমন অভিযোগ নেই,” বলেন মি. রানা।
ছবির উৎস, NASRIN AKHTAR
কদিন আগে ডুবেছিল আরেকটি বাস
চলতি বছরের ২৫শে মার্চ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায় সোহার্দ্য পরিবহন নামে একটি যাত্রীবাহী বাস।
ঈদুল ফিতর এর পরে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে ঘটা সেই দুর্ঘটনায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন যে, ডুবে যাওয়া বাসটিতে নারী-শিশুসহ প্রায় ৫০ জন যাত্রী ছিল।
দৌলতদিয়ার তিন নম্বর ঘাটে ফেরির জন্য অপেক্ষা করার সময় ওই দুর্ঘটনা ঘটে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
মি. হোসেন জানান, “সোয়া পাঁচটার দিকে ‘হাসনা হেনা’ নামের একটি ইউটিলিটি (ছোট) ফেরি এসে জোরে পন্টুনে আঘাত করে। এ সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।”
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ওই ঘটনার একাধিক ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল যে, পানিতে পড়ার পর মুহূর্তেই তলিয়ে যায় দুর্ঘটনা কবলিত বাসটি। এসময় বেশ কয়েকজনকে সাঁতরে নদীর পাড়ে আসার চেষ্টা করতেও দেখা যায়।
পরে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে বাসটি উদ্ধার করে।
রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলছেন, গত মার্চে দৌলতদিয়া ঘাটে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি ডুবে যাওয়ার পর থেকেই ফেরিঘাটে বাড়তি নজরদারি নিশ্চিত করেছিল পুলিশ ও প্রশাসন।
“বাস থেকে যাত্রীদেরকে নামিয়ে দেওয়ার কারণেই আজকে আবারও একটি বড়ো দুর্ঘটনার হাত থেকে মানুষের প্রাণ রক্ষা পেলো,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
