দেবারুণ রায়

কাল গিয়েছিলাম  কালনা। কাল না গিয়ে আজকে গেলে হত না। নির্বাচনের পর নতুন করে নীড় বাঁধা, নীড়ে ফেরার দিন। পরিবর্তন তো এই দেশে কতই হয়েছে। কিন্তু রামধনু জোট করে যে ক্ষমতার কামধেনু এলো বলে রব উঠেছিল, সেসব পরিবর্তনের পরী উড়ে গেছে। এখন পরিমরি করে সবার আগে নিজের পরিবর্তনে তৎপর তৃণমূলের আমূল জনতা। আর আমার মতো উলুখাগড়ার কাজ নষ্টের কষ্ট পেতে হচ্ছে। কষ্টেই ছিলেম, কষ্টেই আছি। তবে কি কষ্টে থেকে নষ্ট হয়ে যাব ? না। দাঁতে মাটি  কামড়ে পড়ে আছি।পড়ি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। প্রভু নষ্ট হয়ে যাই। ভালো লাগে। সেই চন্দ্রকলায় ঘেরা কৃষ্ণকলির দিনগুলি যদি থাকতো, মনে পড়ে। আমাদের সব আছে। মন আছে। কান আছে। চোখ আছে। চোখে বেদনার বান আছে। প্রাণে নানা রঙের দিনগুলির ঘ্রাণ আছে। তাই দুবেলা মরার আগে মরব না।

কাল সারাদিন মোবাইল ( চলমান) ছিলাম। তাই মোবাইলে চোখ দিতে পারিনি। সন্ধে পেরিয়ে ইংরিজি সন্ধে মানে বাংলা মতে রাত সাড়ে ন’টায় দিল্লির এক অতিপ্রিয় ছোকড়ার ফোনে প্রথম জানলাম সোনারপুরের অভিষেক বৃত্তান্ত। মাথায় সতত সক্রিয় থাকেন শিব্রাম। বাংলার একমাত্র সর্ব অর্থেই সর্বহারা বামপন্থী লেখক। একমাত্র নিস্পাপ চক্রবর্তী। তাঁকে আজকেও বড় মিস করছি। আহা তিনি থাকলে আজ তাঁর একটুকরো ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসার কলম থেকে হীরা পান্না হাসি কান্নায় ভারী হালকা শব্দের হল্কা পেতাম। আচ্ছা যত কাণ্ড সব দক্ষিণে ! নাম মাহাত্ম্য ! সোনার বাংলা, সোনার পুর ! কে মেরেছে কে বকেছে কে দিয়েছে গাল, তাইতো সোনা রাগ করেছে, ভাত খায়নি কাল ? সোনার বাংলার  সোনার ছেলে অমুক তমুক যুগ যুগ জিয়ে। শুনে আসছি ছোট থেকে। বুড়ো বয়সেও দেখেছি ভয় দুপুর! মনে পড়ে গেল। ৪ তারিখ। দুপুর বারোটার পর ! যতই জল ঢালি, ইতিহাসের আগুন নেভে না। টালির ছাদের গালি, টালিগঞ্জের ফুলবাগানের মালী কালীঘাটের কালী, কালীগঞ্জের মরা মেয়ের বুকে লাগা বোমপটকার খুলি গলায় মাকালী, তোমার হল কী !

বন্ধুগণ আজ সকালে বামপন্থী প্রিয় বন্ধুজনের লেখা পড়ে কথা শুনে ও বলে ইস্তক সৌজন্যে তা দিচ্ছিলাম। কিন্তু ‘সৌজন্যতা’ তো হয় না। সৌজন্য হয়। সৌজন্যে আছি। সৌজন্যকে জয় করেছে যারা, তাদের ক্ষয় দেখেছি, দেখছি, সৌজন্য হীনতার ক্ষয় অক্ষয় হোক। অনিল বসু মমতাকে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করে ধুলিসাৎ হয়ে প্রমাণ করেছেন ইতিহাস কথা কয়। ভোলে না কিছুই। ভোলে না লালু আলমকে। যে লেঠেল মমতার মাথায় লাঠি মেরে তৃণমূলে শুধু জায়গা পায়নি, লেভেল পেয়েছিল। কাগজের সাংবাদিকদের কাছে সেলেব্রিটির মতো ইন্টারভিউ দিয়ে সেকথা প্রমাণ করেছে লালুশ্রী। গোপাল পাঁঠা, ত্বহা সিদ্দিকী সেলিব্রিটি বঙ্গদেশে। কী করব, মাথার চুল ছিঁড়ব ?

হঠাৎ ভেসে ওঠে স্মৃতির দুঃস্বপ্নের নগরী। হাঁটতে শিখেছে তখন কলকাতা। দুঃস্বপ্নের রণপা লাগিয়েছেন এককালের বামসাথী ও পরে ইন্দিরা গান্ধীর বাম্পার মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়। আমাদের পরের দশকের, মানে আশির দশকে জ্ঞান হয়েছে যাদের তারা এসব দেখেনি। পড়ে জানার অবকাশ সীমিত। তথ্য বিলুপ্ত। আমার মত অভাজন জানে। মানে আমাদের চোখ ফেঁড়ে দেখানো হয়েছে। কান টেনে শোনানো হয়েছে। আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামী, অ্যাক্টিভিস্ট, বিপ্লবী, লেঠেল, কোনও ধরণের রাজনৈতিক কর্মী না হয়েও ভয়ের সকাল দেখেছি।আর রাতের হল্লা শুনেছি। জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির ছাদে নাচ দেখেছি। যারা চোখে দেখেনি তারা কানে শুনেছে, কাগজে দেখেছে। অনেক সত্য অসত্য সত্যাসত্য ডিঙিয়ে সত্য এখনও বেঁচে আছে। সত্য তার শোকসভায় ঘাপটি মেরে বসে ছিল। ওকে যারা পিটিয়ে, মারা গেছে ভেবে, ফেলে পালাল, তারাই যখন শোকসভায় ওর প্রশস্তি করছিল, তখন জনতার ভেতর থেকে উঠে দাঁড়ালো সত্য। বলল, আমি এখনও মরিনি। বক্তারা তখন কী করল, তা কেউ জানতে চায় না।

কিন্তু সেদিন জয়প্রকাশ নারায়ণের প্রতি ওই অসৌজন্যের ঘটনায় গর্বিত হয়েছিলেন অনেকেই। তারা সবাই কালো রঙের রাজনীতির নন। গর্বিত বাঙ্গালীর তালিকায় আলোরঙের একজনও ছিলেন । তিনি সর্ব অর্থেই মহীয়সী ইলা মিত্র। বিধানসভায়‌ গলা মিত্রের বক্তব্যের নিন্দা করে স্পিকার অপূর্বলাল মজুমদারের কাছে ভর্ৎসিত হয়েছিলেন সাংবাদিক কল্পতরু সেনগুপ্ত। বিধানসভার অধিকার ভঙ্গের অপরাধে। অপূর্ববাবুর অপূর্ব জামাতাকে সবাই চেনে। আমার চল্লিশ বছর আগে চেনা নির্মল। নির্মল মাঝি।

অথচ বিধানসভা লণ্ডভণ্ড করার পর লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় স্পষ্টত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যে অধিকারভঙ্গের অভিযোগ করেছিলেন, তাতে বাম সরকার পাত্তা দেয়নি। সৌজন্যে তা দিয়েছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকার। কী হয়েছিল তার পরিণাম ? একুশে জুলাইয়ের হোম সেক্রেটারির কাছে, সমীর পুততুণ্ডর মতো কমরেড ডামি ক্যান্ডিডেটের পাশে দাঁড়িয়ে বধ হতে হয়েছিল বুদ্ধদেবের মতো সাক্ষাৎ  সৌজন্যকে, অভিমন্যুর মতো। 

আর কিছু বলার নেই। এবার শুধু সোনারপুরে ফিরে আসি। বাসি কথার দাম আছে মশাই। শুনুন , পুণ্যদাস বাউল গাইছেন, 

চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে, আমরা ভেবে করব কীইইইইইইইই ?

কলুবাবুর কান্না আন্নাকালী আর না    

কলু বাঁড়ুজ্যের কান্না সহ্য করতে পারছি না। ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কীভাবে কাঁদব ভাবছি। সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে ? না লুকিয়ে ? জয় মা কালী, কলকত্তাওয়ালী, এত গালাগালি, কলু কথাকলি , কী দিন দেখালি ? 

#এই কলু বাঁড়ুজ্যের কান্না আরেকবার দেখেছিলাম, ওঁর নিজের পুজো মণ্ডপে। কী কান্না ? হাউ হাউ করে। তারপর ভোট দিয়ে চোখের জল পানি মুছিয়ে দিল , সেসব জানি। 

#বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে কলু বাঁড়ুজ্যে কি সুন্দর খিস্তি করেছিলেন, টিভি ক্যামেরায়। তার অন্তত বছর বারো পরে টিভিতে বলেছিলেন, ওঁর সঙ্গে একবার কথা বলতে চেয়েছিলাম। দুঃখু প্রকাশ করতে। কিন্তু হল না। মনে একটা খোঁচ রয়ে গেল।  সেই বুদ্ধ খিস্তির পর এক ভ্রাতৃপ্রতিম সাংবাদিক ভগবানের ভয়ে ভীত একটা দৈনিক কাগজে একই ভাষায় কলম লিখে বুদ্ধদেবের নামে খেউড় গেয়েছিল। সাংবাদিক থেকে বিজেপি হয়ে ভোটে হেরে সেনাপতির সৈনিক হয়েছিল আদি কলেবরে। সে বুদ্বুদ হতে যা যা করে তাই তাই করেছিল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে নোংরা করতে পারেনি। 

#যার মুখ, যার কলম, রইল তারা পিছুর টানে কাঁদছে দেখছি কাঁদছে। বিশ্ব বাংলার লোগো হয়ে যাচ্ছে একে একে। আর নতুন মুখ্যমন্ত্রীর নামে অষ্টোত্তর শতনাম আওড়াচ্ছে। এবার ইতিহাসের নামে নামখানা, মায় খিস্তি খেউড় করবে। যাই বলুন, এসব একদম ঠিক না।  এখন কোথায় কাঁদব ! না আবোলতাবোল লিখছি। 

“কলু বাঁড়ুজ্যে” ছদ্ম নামটির জন্য এক দারুণ লেখকের  ঋণ স্বীকার করছি। তিনি শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায়। কলু বাবুর কান্না, আন্নাকালী আর না।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *