ছবির উৎস, Sony Ramani/NurPhoto via Getty Images
বাংলাদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বেড়েই চলেছে। এমনকি অনেক এলাকায় এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারই পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের’ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় বলেছে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হলে কিংবা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোমবারই জ্বালানিমন্ত্রীকে আমদানিকারক ও অপারেটররা জানিয়েছিলেন যে, এলপি গ্যাসের কোনো সংকট নেই। কিন্তু এরপরই ঢাকাসহ সারাদেশে গ্যাসসহ সিলিন্ডার সংকট আরও তীব্র হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন জায়গায় একটি ১২ কেজির সিলিন্ডারের জন্য অতিরিক্ত ৬/৭শ টাকা দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
আবার বেশি দামে বিক্রি ঠেকাতে কর্তৃপক্ষের চলমান অভিযান এড়াতে কিছু এলাকায় এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের দোকান বন্ধ রেখেই অতিরিক্ত দাম চাওয়া হচ্ছে।
বৈশ্বিক সংকটের কারণে আমদানি আদেশ কম হওয়ায় আগামী মাসে সরকারকে বাধ্য হয়েই দাম বাড়াতে হতে পারে- এমন ধারণা থেকে বাজারে সিলিন্ডার সরবরাহ আরও কমিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
যদিও আমদানিকারক ও অপারেটররা বলছেন, খুচরা বাজারে দাম বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত দামের দায় আমদানিকারকদের নয়।
“দেশে হাজার হাজার খুচরা ব্যবসায়ীকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করি না। কারা সংকট তৈরি করছে তাদের চিহ্নিত করা উচিত। কেউ দাম বেশি নিলে সরকারের উচিত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবের সভাপতি আমিরুল হক।
তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, অতিরিক্ত লাভের জন্য দাম বাড়ানোর চেষ্টা কেউ করতে পারে, কিন্তু সরকার তাতে হস্তক্ষেপ করছে।
“এলপিজি আমদানি করে প্রাইভেট সেক্টর। যেহেতু দাম বাড়ছে তাই সরকার হস্তক্ষেপ করছে। আমি ডিসিদের বলেছি দাম কেন বাড়ছে সেটি বের করতে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

পরিস্থিতি আসলে কেমন
এলপি গ্যাসের দাম প্রতি মাসে সমন্বয় করে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। সে অনুযায়ী চলতি মাসের শুরুতে এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল এক হাজার ৫৮৫ টাকা।
কিন্তু মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই বাজারে এই সিলিন্ডারের জন্য বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠতে থাকে। এখন কোনো কোনো এলাকায় অতিরিক্ত ৬/৭শ টাকা পর্যন্ত দিয়েও গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
বুধবার সকাল সাড়ে এগারটা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত সময়ে ঢাকার আফতাবনগরে বটতলা মোড় সংলগ্ন এলাকায় তিনটি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রির দোকানের মধ্যে দুটি পুরোপুরি বন্ধ এবং অন্য একটির দোকানে শাটার অর্ধেক নামানো অবস্থায় পাওয়া যায়।
বন্ধ একটি দোকানের নাম ‘চাচা ভাতিজা এলপি গ্যাস হাউজ’। পরে বেলা তিনটার দিকে দোকানের সাইনবোর্ডে থাকা ফোন নম্বরে কল দিলে তা রিসিভ করেন দোকানে স্বত্ত্বাধিকারী মো. হালিম হোসেনের ভাতিজা।
দোকান বন্ধ কেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “দোকান খোলা রেখে কী করবো, গ্যাসই তো নাই। আজ কয়েকটা সিলিন্ডার পাইছি। বিক্রি করে দোকান বন্ধ করে রাখছি”।
এ সময় ১২ কেজির সিলিন্ডার কত দামে বিক্রি করছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এক দাম ২৩শ টাকা”।
কিন্তু এত বাড়তি দাম চাইছেন কেন- জানতে চাইলে তিনি শুধু বলেন, “গ্যাসই তো নাই”।
বটতলার কাছেই আঙ্গারজোড়া এলাকার এলপি সিলিন্ডার বিক্রির বড় একটি দোকানও আংশিক বন্ধ পাওয়া গেছে। সেখানে ঢুকে সিলিন্ডার নেওয়া যাবে কি-না জানতে চাইলে দোকানে থাকা কর্মচারী ফোনে একজনের সঙ্গে কথা বলে জানান, ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম তারা ২১৫০ টাকা রাখতে পারবেন।
কাছেই সাত নম্বর সড়কে সিলিন্ডার বিক্রির আরেকটি দোকান শাটার নামানো অবস্থায় পাওয়া যায়। দোকানটি ভেতর থেকে আটকানো অবস্থায় ছিল।

বটতলা মোড়ে স্থানীয় এক দোকানদারের কাছে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার কোথায় পাওয়া যাবে- জানতে চাইলে তিনি শামীম নামে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের স্থানীয় একজন ব্যবসায়ীর ফোন নম্বর দেন।
ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে তখনি ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “দোকান বন্ধ। কিন্তু সিলিন্ডার লাগলে দেওয়া যাবে। বাসায় পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু ১২ কেজির জন্য ২৩শ টাকা দিতে হবে”।
দোকান কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “গ্যাস পাওয়া যায় না, তাই এখন দোকান নেই। দেখা করারও দরকার নেই। আপনার লাগলে বলেন, সিলিন্ডার পৌঁছায়া দিব”।
ঢাকার আরও কয়েকটি এলাকায় এবং ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলা থেকেও এলপি গ্যাস সংকট নিয়ে প্রায় একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে।
যদিও সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর সাথে পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেছিলেন এলপি গ্যাসের অপারেটররা। দেশের বর্তমান এলপিজি আমদানির পরিমাণ, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি, বাজার দর এবং আনুষঙ্গিক বিষয় পর্যালোচনার জন্য ওই সভাটি ডাকা হয়েছিল।
ওই বৈঠকে বলা হয়েছিল, অগাস্ট মাসে এক লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন এবং চলতি সেপ্টেম্বর মাসে (২২ তারিখ পর্যন্ত) এক লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, “বর্তমানে এলপি গ্যাসের কোনো ধরনের সংকট নেই বলে সভায় জানান এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটরগণ”।
কিন্তু বাস্তবতা হলো দোকানগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আবার বেশি টাকা নেওয়ার জন্য ভোক্তা অধিদফতরের অভিযানের মুখে পড়ার আশংকায় অনেক খুচরা ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ রেখে গোপনে বেশি দাম নিয়ে গ্রাহকদের সিলিন্ডার সরবরাহ করছেন।
লোয়াবের সভাপতি আমিরুল হক বলছেন, তারা এলপিজি আমদানি করে তা ডিলারদের দেন এবং ডিলারদের মাধ্যমে তা খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে যায়।
“এখন দেখুন আমদানি কম করেছি কি -না। কিংবা দেখুন যা আমদানি করেছি সেটা ডিলারদের দিয়েছি কি-না। সেখানে তো কোনো ঘাটতি নেই। ডিলাররা পাচ্ছে কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে মানুষ পাচ্ছে না। সেই দায় তো আমাদের না। এটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. হক।
আমদানি অর্ডার কম হওয়ার তথ্য কতটা সঠিক জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সরকারের দিক থেকে এলপিজি এনে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তো সরকার যদি আনে তাহলে বেসরকারি আমদানিকারকরা এনে কী করবে। আর অক্টোবর মাসের জন্য যে অর্ডার সেখানে সেপ্টেম্বরের চেয়ে দামের পার্থক্য ৬৪ ডলার। এটিও বিবেচনায় রাখতে হবে”।

দাম এভাবে বাড়ছে কেন
বিইআরসির তথ্য মতে, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স নেওয়া ৫২টি কোম্পানির মধ্যে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরতে ৩২টি কোম্পানির নিজস্ব প্ল্যান্ট আছে। আর আমদানি করতে পারে এমন কোম্পানি হলো ২৩টি।
কিন্তু তারা সবাই নিয়মিত আমদানি করে না। মূলত ৮/৯টি কোম্পানিই এলপিজি নিয়মিত আমদানি করে থাকে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাঝে কয়েক মাস এলপিজি সরবরাহ ঠিক থাকায় দাম কমানো গেলেও আগামী মাসের জন্য আমদানি আদেশ কম হয়েছে। ফলে আগামী মাসে দেশে এলপি গ্যাসের সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, দাম বৃদ্ধির মুল কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা। এছাড়া সামনে শীত মৌসুমের আগে ইউরোপে এই গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়।
আবার জাহাজ চলাচলে সংকটের পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে গ্যাস আমদানির জন্য পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
এসব কারণে আগামী মাসের জন্য এলপিজি আমদানি করতে গত মাসে কম অর্ডার হয়েছে, যে কারণে আগামী মাসে সরবরাহ কম থাকবে ধারণা করে ব্যবসায়ীরা আগের দু মাসে যা এসেছে সেখান থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্যাস সিলিন্ডারে ভরে বাজারে সরবরাহ করছে না।
অর্থাৎ আগামী মাসেই সরকার দাম বাড়াতে বাধ্য হবে মনে করে গ্যাস সিলিন্ডার মজুত করা হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। সে কারণেই এখন গ্রাহকদের চড়া দামে সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ এক বিজ্ঞপ্তিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, দেশের কোথাও এলপি গ্যাসের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে এ নিয়ে আজ ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন তিনি।
সেখানে কেন এলপিজির ঘাটতির কথা শোনা যাচ্ছে এবং কেন অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে তথ্য ও প্রমাণসহ প্রতিবেদন পাঠাতে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন।
“দেশে এলপি গ্যাসের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হলে কিংবা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে,” মন্ত্রী ওই বৈঠকে বলেছেন বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
জ্বালানীমন্ত্রী বিবিসিকে বলেছেন, এলপি ব্যবসা বেসরকারি খাতের হলেও গ্রাহক পর্যায়ে অতিরিক্ত দাম ঠেকাতেই সরকার এখন প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করছে।
