ছবির উৎস, AFP via Getty Images
হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে চলাচলে সহায়তা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে যে অভিযান গতকাল শুরু করেছিল, একদিনের মধ্যেই সেটা আবার স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই অভিযান “অল্প সময়ের জন্য” স্থগিত থাকবে বলে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প জানান, একদিন আগে শুরু হওয়া “প্রজেক্ট ফ্রিডম” নামের এই অভিযানটি “পারস্পরিক সমঝোতার” ভিত্তিতে বন্ধ করা হয়েছে।
ইরানের সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে “বিরাট অগ্রগতি” হয়েছে বলে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এটিকে বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তারা বলছে, এই স্থগিতাদেশ প্রমাণ করে, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি পুনরায় খুলে দিতে “অনবরত ব্যর্থ” হওয়ার পর ট্রাম্প “পিছু হটেছেন।”
এমন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণাটি এলো যখন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইরানে প্রাথমিক মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শেষ হয়েছে। কারণ অপারেশন এপিক ফিউরি লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা “পাকিস্তানের অনুরোধের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত” তিনি নিয়েছেন।
তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করে দেন যে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ বহাল থাকবে।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা অনেককে অবাক করতে পারে।
এটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও, প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফসের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের দেওয়া বার্তার ঠিক উল্টো।
তারা সবাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালি এবং পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে এই অভিযান চলবে।
মঙ্গলবার রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা শান্তির পথ পছন্দ করি। প্রেসিডেন্ট (ডোনাল্ড ট্রাম্প) একটি চুক্তি করতে চান।”
এর ফলে ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা এখনও অস্পষ্ট।
মার্কিন প্রশাসন এর আগে জোর দিয়ে বলেছিল, প্রজেক্ট ফ্রিডম বন্দর অবরোধের চেয়ে “পৃথক ও স্বতন্ত্র” একটি অভিযান।
ছবির উৎস, Getty Images
যেটির মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।
প্রজেক্ট ফ্রিডমের লক্ষ্য ছিল অবরুদ্ধ জলপথ দিয়ে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে পার করে আনা। যেন এই অঞ্চল থেকে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয় এবং বিশ্ব অর্থনীতি স্থিতিশীলতায় ফেরে।
কিন্তু এই “স্থগিতাদেশ” চলাকালীন সময়ে যদি বিশ্বব্যাপী জাহাজ সংস্থা এবং বীমা কোম্পানিগুলো ইরানের বাধার মুখে পড়ে, তবে ট্রাম্পের পক্ষে এই অভিযানের সাফল্য দাবি করা কঠিন হবে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন হয়তো আশা করছে প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত করলে, যেটি নিয়ে ইরানের তীব্র আপত্তি ছিল, তাদের আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
ইরান পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আগে বলেছিলেন, “আমরা ভালো করেই জানি, বর্তমান স্থিতাবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে সেটি আমেরিকার জন্য অসহনীয় অথচ আমরা তো কেবলমাত্র শুরু করছি।”
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক গালিবাফ বলেছিলেন, “যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং অবরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি পরিবহনকে বিপন্ন করেছে। তবে তাদের এই অপকর্ম সফল হবে না।”
মঙ্গলবার রাতে ব্রিটিশ মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে একটি মালবাহী জাহাজে “অজ্ঞাত কোনো বস্তু” হামলা করেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু জানা যায়নি।
এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, টানা দুই দিন ধরে তারা ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে।
সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাত অভিযোগ করেছিল, ফুজাইরাহ তেল বন্দরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।
এটিকে “বিপজ্জনক উস্কানি” বলে অভিহিত করেছে দেশটি।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে কোনো হামলার কথা মঙ্গলবার অস্বীকার করেছে ইরান।
দেশটির এক সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, “যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হতো, তাহলে আমরা সেটি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতাম।”
ছবির উৎস, Getty Images
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এই অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু হয়। তেহরান গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যেটি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে।
এর ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ হয়।
কিন্তু এরপরেও খুব কম জাহাজই এই প্রণালি পার হতে পেরেছে।
একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নিজস্ব অবরোধ আরোপ করে।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, তারা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সাতটি স্পিডবোটে হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে, একটি মার্কিন জাহাজকে লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক গুলি ছোঁড়া হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান।
যদিও দুই পক্ষই একে অপরের দাবি অস্বীকার করেছে।
এর মধ্যে দুইটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অন্য আরেকটি জাহাজ বলেছে, এই প্রণালি অবরোধমুক্ত করার ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মার্কিন সামরিক পাহারায় নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে তারা।
হোয়াইট হাউসে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মার্কো রুবিও বলেন, ট্রাম্প একটি চুক্তি চাইলেও “ইরান এখনও পর্যন্ত সেই পথ বেছে নেয়নি।”
তিনি আরো যোগ করেন, “ভবিষ্যতে এর পরিণতি কী হতে পারে সেটি অনুমাননির্ভর।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর হামলায় “দেশটির অর্থনীতিতে কয়েক প্রজন্মের ক্ষতি করেছে” বলে দাবি করেন রুবিও।
একইসঙ্গে, দেশটির নেতাদের “যে পথে তারা এগোচ্ছেন তাতে নিজেদের ধ্বংস করার আগে সংযত হওয়া উচিত” বলেন মি. রুবিও।
ছবির উৎস, Graeme Sloan/Getty Images
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতি “শেষ হয়ে যায়নি।”
“এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতি অবশ্যই কার্যকর আছে এবং বিষয়টি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবো” বলেন মি. হেগসেথ।
জেনারেল কেইন জানান, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর ইরান মার্কিন বাহিনীর ওপর ১০ বার হামলা চালালেও “এই মুহূর্তে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি।”
ইরানের কোন পদক্ষেপ যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে গণ্য করা হবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আপনারা জানতে পারবেন কারণ আমিই আপনাদের তা জানাব।”
তবে আলোচনার মাধ্যমে এই যুদ্ধের নিরসন করা সম্ভব বলে এখনো বিশ্বাস করেন তিনি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের এসব মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে নতুন করে কোনো বড় অভিযানে জড়াতে চাচ্ছে না।
কারণ এতে বাজারের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং মার্কিন জনগণের একটা বড় অংশই এটির বিরোধিতা করবে।
ট্রাম্প আরো জানিয়েছেন, হরমুক প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে জাপানের সাথে তিনি কথা বলছেন এবং আগামী সপ্তাহে চীন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও এ বিষয়ে একটি ইতিবাচক আলোচনা হবে বলে আশা করছেন।
