কোরবানির ঈদে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়ির নতুন ঘরে ফিরবেন— এমনই স্বপ্ন ছিল মো. কামালের। দীর্ঘ ৩০ বছরের সংগ্রামে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ভ্রাম্যমাণ সবজি বিক্রি করে পটুয়াখালীর বাউফলে গ্রামের বাড়িতে একটি পাকা ঘর নির্মাণ করেছিলেন তিনি। ছাদের কাজ এখনও অসমাপ্ত। তবুও সেই ঘরেই পরিবার নিয়ে কোরবানির ঈদ করার প্রস্তুতি চলছিল।

কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই গ্যাসলাইন লিকেজের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একে একে নিভে গেল পুরো পরিবার। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে কফিনবন্দি হয়ে গ্রামের বাড়ি ফিরছেন কামাল।

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কনকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কনকদিয়া গ্রামের চান্দে আলীর ছেলে মো. কামাল (৪৫), তার স্ত্রী সায়মা বেগম (৩৫), দুই মেয়ে মুন্নি (১০) ও কথা (৪) এবং একমাত্র ছেলে মুন্না (৭)— একই পরিবারের পাঁচজনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারি আর প্রতিবেশীদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ।

পারিবারিক সূত্র ও স্থানীয়রা জানান, প্রায় তিন দশক ধরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন কামাল। জীবিকার তাগিদে তিনি ভ্রাম্যমাণভাবে সবজি বিক্রি করতেন। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার উত্তর ভুঁইগড় গিরিধারা এলাকার ৬ নম্বর সড়কে শাহজাহান মিয়ার মালিকানাধীন একটি ৯ তলা ভবনের নিচতলার পশ্চিম পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন তারা।

গত রোববার ১০ মে বাসায় গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে কামাল, তার স্ত্রী সায়মা, বড় মেয়ে মুন্নি, ছোট মেয়ে কথা ও ছেলে মুন্না গুরুতর দগ্ধ হন। পরে তাদের ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার মারা যান মো. কামাল। এরপর বুধবার মারা যায় ছোট মেয়ে কথা। বৃহস্পতিবার সকালে মারা যায় ছেলে মুন্না এবং দুপুরে মারা যায় বড় মেয়ে মুন্নি। সর্বশেষ শুক্রবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান স্ত্রী সায়মা।

একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের এমন করুণ মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে উত্তর কনকদিয়া গ্রাম। স্থানীয়দের ভাষ্য, অত্যন্ত পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন কামাল। অল্প আয়েও পরিবারের জন্য নিরলস পরিশ্রম করতেন তিনি। গ্রামের বাড়িতে নিজের একটি ঘর নির্মাণ ছিল তার বহুদিনের স্বপ্ন।

স্বজনরা জানান, গত সোমবার গ্রামের বাড়িতে কামালের দাফন সম্পন্ন হয়। শুক্রবার রাতে ঢাকায় থাকা স্ত্রী ও সন্তানদের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। শনিবার সকালে জানাজা শেষে কামালের কবরের পাশেই স্ত্রী ও সন্তানদের দাফন করা হবে।

প্রতিবেশী আলিফনুর রহমান বলেন, “ঈদের সময় পরিবার নিয়ে বাড়ি আসার কথা ছিল কামালের। কিন্তু এভাবে পাঁচটি লাশ হয়ে ফিরবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।”

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শাজাহান হাওলাদার বলেন, “ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের বাড়িতে ভিড় করছেন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সবার চোখে শুধু কান্না আর শোক।”



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *