নয়াদিল্লি: জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়ার উপর নির্ভরতা আরও বাড়াচ্ছে ভারত। চলতি জুন মাসে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির ৫০ শতাংশেরও বেশি, অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ২৫ লক্ষ ব্যারেল তেল রাশিয়া থেকে আসতে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার জেরে রাশিয়া যে পরিমাণে তেল এশিয়ার বাজারে পাঠাতে শুরু করেছে, তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশগুলির মধ্যে অন্যতম ভারত।
বর্তমানে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে আসা অন্তত আটটি ট্যাঙ্কার ভারতের বিভিন্ন বন্দরে নোঙর করেছে বা প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। পশ্চিম উপকূলের ভাদিনার থেকে শুরু করে পূর্ব উপকূলের বিশাখাপত্তনম পর্যন্ত একাধিক বন্দরে রুশ তেলের জাহাজ দেখা যাচ্ছে।
– বিজ্ঞাপন –
এনজিপি এনার্জি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ আনাস আলহাজ্জির কথায়, “ভারতের বন্দরে একসঙ্গে এত সংখ্যক রুশ তেলবাহী ট্যাঙ্কার আগে কখনও দেখিনি।”
ইউক্রেন যুদ্ধের পর বদলে গিয়েছে চিত্র
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলি মস্কোর উপর একাধিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তার পর থেকেই রাশিয়া ইউরোপের পরিবর্তে এশিয়ার বাজারে তেল রফতানি বাড়াতে শুরু করে। যুদ্ধের আগে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির এক শতাংশেরও কম আসত রাশিয়া থেকে। বর্তমানে রাশিয়াই ভারতের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ওঠানামার মধ্যেও রাশিয়ার ছাড়ে পাওয়া তেল ভারতের আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করছে।
ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় ভারতের লাভ
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার একাধিক তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মস্কোকে আগের তুলনায় বেশি অপরিশোধিত তেল বিদেশে রফতানি করতে হচ্ছে। তথ্য ও বিশ্লেষণ সংস্থা ক্লেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সুমিত রিটোলিয়া জানিয়েছেন, ইউক্রেনের হামলার কারণে রাশিয়ার পরিশোধন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে রফতানিযোগ্য অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
একই সময়ে চিনের অর্থনৈতিক গতি মন্থর হওয়ায় দেশটির অপরিশোধিত তেলের চাহিদাও কমেছে। সাম্প্রতিক সময়ে চিনের আমদানি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যাওয়ায় সেই অতিরিক্ত রুশ তেল ভারতের বাজারে আসছে।
বর্তমানে ভারত প্রতি ব্যারেল রুশ তেলের ক্ষেত্রে ২ থেকে ৫ ডলার পর্যন্ত ছাড় পাচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলির জুলাই এবং আগস্টের প্রথমার্ধ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তেলের মজুত ইতিমধ্যেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে
স্বল্পমেয়াদে পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক হলেও ভারতের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং-এর এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের কৌশলগত তেল মজুত দেশের মাত্র ৪.৯ দিনের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম।
অন্যদিকে, চিনের কৌশলগত মজুত রয়েছে প্রায় ৯২.২ দিনের, জাপানের ৭৭ দিনের এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ৩১ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি, সার, খাদ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ আমদানির উপর ভারতের নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে বিঘ্ন বা মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে দেশের কৌশলগত তেল মজুত আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
আমদানি নির্ভরতা বেড়েই চলেছে
২০০০ সালে ভারতে দৈনিক প্রায় ২৫ লক্ষ ব্যারেল তেলের চাহিদা ছিল এবং তার প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি করতে হত। বর্তমানে দেশের দৈনিক চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ থেকে ৫৬ লক্ষ ব্যারেল, যার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর।
যদিও আমদানিকৃত তেলের একাংশ ভারতে পরিশোধন করে বিদেশে রফতানি করা হয়, তবুও দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা এখনও আন্তর্জাতিক বাজার এবং রাশিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থার উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতত রাশিয়ার সস্তার তেল ভারতের জন্য স্বস্তির কারণ হলেও, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের উপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
