ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে নিজেদের আলাদা ও ‘দায়িত্বশীল শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে চীন—এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা।

বুধবার (২২ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং একদিকে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের স্বার্থ সুরক্ষিত করছে। এই প্রেক্ষাপটে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার আহ্বান জানান। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান-এর সঙ্গে ফোনালাপে তিনি শান্তিপূর্ণ সমাধান ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

চীনের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল বজায় রাখা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ বক্তব্যে সংঘাতের কোনো পক্ষকে সরাসরি দায়ী করা হয়নি। এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করে। ট্রাম্প একই দিনে সামাজিক মাধ্যমে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগতি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য করেন এবং তেহরানের ওপর নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। বিশ্লেষকদের মতে, চীন ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘নেপথ্যের শক্তি’ হিসেবে থাকতে চায়—সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সুযোগমতো লাভ তুলতে আগ্রহী। আব্বা ইবান ইনস্টিটিউটের গেদালিয়াহ আফটারম্যান বলেন, চীন অপেক্ষা করে, পরিস্থিতি বোঝে এবং সুযোগ এলে তা কাজে লাগায়—এতে যুক্তরাষ্ট্রকেই জটিল পরিস্থিতি সামলাতে হয়।

চীনের দীর্ঘদিনের ‘হস্তক্ষেপ না করার নীতি’ এবং সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল তাকে এই সংঘাতে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কমিশনের তথ্যে দেখা যায়, চীন ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে। একইসঙ্গে, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হয়েছে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গেও একযোগে সম্পর্ক বজায় রেখে ভারসাম্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে চীন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চীনের মূল আগ্রহ রাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক। তাই তারা সংঘাতের চেয়ে স্থিতিশীলতা ও শান্তিকে প্রাধান্য দেয়, যা তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে সতর্কতাও রয়েছে—সংঘাত যদি আরও তীব্র হয়, তাহলে তা চীনের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে, যা বেইজিংকে সরাসরি সম্পৃক্ত হতেও বাধ্য করতে পারে। কূটনৈতিক তৎপরতায়ও পিছিয়ে নেই চীন। দেশটির শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই যুদ্ধবিরতির আগ পর্যন্ত একাধিক ফোনালাপ করেছেন এবং বিশেষ দূতরা আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, বেইজিং ইচ্ছাকৃতভাবেই বড় ধরনের শান্তি উদ্যোগে নিজেদের ভূমিকা সীমিত রাখছে, যাতে জটিল রাজনৈতিক দায় এড়ানো যায়, অথচ ‘স্থিতিশীলতার পক্ষের শক্তি’ হিসেবে বৈশ্বিক ভাবমূর্তি বজায় থাকে। সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধের এই অস্থিরতায় সরাসরি জড়িত না থেকেও কৌশলগত ভারসাম্য, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক সক্রিয়তার মাধ্যমে চীন নিজস্ব অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *