ফুটবলের এক মহাকাব্য— মেসি (পর্ব ৫)

(লিওনেল মেসি বিশ্বের কোটি অনুরাগীর হৃদয় ভেঙে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। দীর্ঘ সময়ের অপার এক বিস্ময় তিনি। মাঠে শুধু সাফল্য-শিহরণ নয়, অপ্রাপ্তিও আছে তার। মেসিকে নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনে ৬ পর্বের বিশেষ লেখায় সেসব গল্পই তুলে আনছেন ফুটবল লেখক-বিশ্লেষক জাহিদ রহমান। আজ থাকছে পঞ্চম পর্ব)
২০১৪ সালের কথা। লিওনেল মেসি তখন ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত। সেসময়ে ফিলিস্তিনের গাজাতে ইসরায়েলের আক্রমণে প্রায় দুই হাজার প্রাণ হারায়। শিশুদের ওপর সেই নির্মম হামলার প্রতিবাদ করেছিলেন তিনি। ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি লেখেন ‘একজন বাবা এবং ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার সংঘাত থেকে আসা ছবিগুলো দেখে আমি ভীষণভাবে দুঃখিত। এই সহিংসতায় ইতিমধ্যে অনেক তরুণ প্রাণ হারিয়েছে এবং অসংখ্য শিশু আহত হয়েছে।’
তিনি আরও লেখেন- ‘শিশুরা এই সংঘাত সৃষ্টি করেনি, কিন্তু এর চূড়ান্ত মূল্য তাদেরই দিতে হচ্ছে। অর্থহীন সহিংসতার চক্র অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। সামরিক সংঘাতের পরিণতি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’ এটাই মেসি। কখনোই তিনি শুধু জনপ্রিয়তা নিয়ে বসে থাকেননি। বরং নিজের অবস্থান থেকে সুন্দর পৃথিবী নির্মাণে নিজের সামাজিক শক্তি ছড়িয়ে দিয়েছেন। হয়ত এ কারণেই এবারের বিশ্বকাপের আগেও আমরা দেখেছি গাজার আশ্রয় শিবিরে শিশুরা মেসি লেখা দশ নাম্বার জার্সি পরে দৌড়াদৌড়ি করছে। সাংবাদিকরা প্রিয় ফুটবলারের কথা জিজ্ঞেস করলে তারা এক বাক্যে বলেছে মেসির নাম।
লিওনেল মেসিকে শুধু গোল, ট্রফি আর রেকর্ড দিয়ে বোঝা অসম্ভব। মেসির আরেকটি বড় পরিচয়— মানবিক মেসি। আমরা দেখেছি যে মেসি হাজার হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন, তিনিই আবার নীরবে অসুস্থ একটি শিশুর পাশে দাঁড়িয়েছেন। যে মেসির একটি ছবি বা অটোগ্রাফের জন্য পৃথিবীর কোটি মানুষ অপেক্ষা করে, সেই মেসি নিজের জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করেছেন শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কল্যাণে। ফুটবল তাকে যতটা দিয়েছে, তার সামর্থ্য অনুযায়ী সমাজকে তিনি তা ফিরিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করেছেন।
মেসির মানবিকতার গল্প শুরু তার শৈশবের সঙ্গেও। আর্জেন্টিনার রোজারিওর সাধারণ এক পরিবার থেকে উঠে আসা এই শিশুটি খুব অল্প বয়সেই বুঝেছিল সংগ্রাম কী। ফুটবল ছিল তার স্বপ্ন, কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ কখনোই সহজ ছিল না। শারীরিক বৃদ্ধির সমস্যার চিকিৎসা, পরিবারের দুশ্চিন্তা, রোজাারিও ছেড়ে বার্সেলোনায় যাওয়া, সবমিলিয়ে তার শৈশব ছিল অন্য অনেক শিশুর চেয়ে ভিন্ন।
মেসির মানবিক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে শিশুরা। তার প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক ‘লিও মেসি ফাউন্ডেশন’ শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগে সহায়তা করেছে। এই ফাউন্ডেশন তৈরি করা হয় ২০০৭ সালে। এই ফাউন্ডেশনের মূল উদ্দেশ্য- স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা, শিক্ষা প্রকল্প গ্রহণ এবং সামাজিক ক্রীড়াকে শক্তিশালী করা। শিশুদের ক্যান্সার চিকিৎসায়ও এই প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
বিশেষ করে অসুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কাজ করা তার মানবিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০১৭ সালে এই ফাউন্ডেশনের অনুদানে সিরিয়ায় বিভিন্ন স্কুলে প্রি-ফ্যাব্ররিকেটেড শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা হয়। যার কারণে সংঘাতপীড়িতি এলাকার ১৬০০ এর বেশি শিশু স্কুলে যেতে পেরেছিল। লিও মেসি ফাউন্ডেশন বর্তমানে আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্সের গারাহান হাসপাতাল এবং বার্সেলোনার সান্ত হুয়ান দে দেউ হাসপাতালের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে। এছাড়া ‘লিও মেসি ফাউন্ডেশন’র সহায়তায় বার্সালোনাতে এসজেডি প্যাডিয়াট্রিক ক্যান্সার সেন্টার নির্মাণে ২৬ লক্ষ ইউরো অনুদান দিয়েছে। কোভিড মহামারির সময়ে মেসি ১০ লাখ ইউরো অনুদান দেন। এর অর্ধেক যায় বার্সেলোনার একটি হাসপাতালে এবং বাকি অর্ধেক আর্জেন্টিনার একটি হাসপাতালে।
মেসির দাতব্য কর্মকাণ্ড ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বাইরেও বিস্তৃত। কেনিয়ায় শিশুদের অপুষ্টি মোকাবিলায় পানির পাম্প ও পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের জন্য তিনি ২ লাখ ইউরো অনুদান দিয়েছেন। এছাড়া আর্জেন্টিনার অনুন্নত এলাকাগুলোতে খেলাধুলার সুবিধা ও খেলার মাঠ নির্মাণেও তার বিনিয়োগ রয়েছে। ২০১১ সালে জাপানের তোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামির পর মেসির ফাউন্ডেশন তার বাঁ-পায়ের ২৫ কেজি ওজনের খাঁটি সোনার প্রতিরূপ বিক্রির অর্থের একটি অংশ পায়। সোনার ওই ভাস্কর্যটির মূল্য ছিল প্রায় ৫২ লাখ ডলার। মেসি নিজেও ক্যাম্প ন্যুতে ওই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০ জন জাপানি শিশুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
মেসি বিভিন্ন সময় দাতব্য কাজের জন্য নিজের ব্যবহৃত ফুটবল স্মারক নিলামে তুলেছেন। ২০২২ বিশ্বকাপ জেতার পর তিনি টুর্নামেন্টে পরা ছয়টি জার্সি নিলামে তোলেন। এই নিলাম থেকে প্রায় ১ কোটি ডলার সংগ্রহ হওয়ার অনুমান করা হয়েছিল। এই অর্থ বার্সেলোনার একটি হাসপাতালে বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুদের সহায়তায় ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ফ্রেন্ডস অব মেসি নামে আয়োজিত দাতব্য ফুটবল ম্যাচের মাধ্যমেও তিনি তার ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, তার ফাউন্ডেশনকে শুধু প্রচারের জন্য তৈরি কোন প্রতিষ্ঠান বলা যায় না; এটি বাস্তব গবেষণা, হাসপাতাল এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কাজ করে। মেসির মানবিক কর্মকাণ্ড শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, স্বাস্থ্যসংকট ও সামাজিক সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। কখনও আর্থিক সহায়তা, কখনও সচেতনতা তৈরি, কখনও কোন মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের পরিচিতিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করেছেন।
মেসি একবার বলেছিলেন, ‘এখন কিছুটা বিখ্যাত হওয়ায় আমি এমন মানুষদের সাহায্য করার সুযোগ পাচ্ছি, যাদের সত্যিই সাহায্যের প্রয়োজন।’ একজন বিশ্বতারকার জন্য মানবিক কাজে যুক্ত হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মেসির একটি আহ্বানও কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে দ্রুত। তিনি সেই প্রভাবকে তাই কেবল বিজ্ঞাপন বা ব্যক্তিগত প্রচারের জন্য নয়, মানুষের জন্যও ব্যবহার করেছেন। মেসির সঙ্গে শিশুদের সম্পর্কের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি হল অসুস্থ শিশুদের সঙ্গে তার যোগাযোগ। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা কোন শিশু যখন মেসির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পায়, তখন সেটি তার কাছে নিছক কয়েক মিনিটের সাক্ষাৎ নয়। সেটি হয়ে উঠতে পারে বেঁচে থাকার এক নতুন সাহস। কেননা কোন মহাতারকার কাছ থেকে কখনও একটি ভিডিও বার্তা, কখনও একটি সাক্ষাৎ, কখনও একটি অটোগ্রাফ একজন শিশুর কাছে এসবের মূল্য পরিমাপ করা যায় না।
একটু মনে করিয়ে দেই, ছোটবেলায় মেসির শারীরিক বৃদ্ধির সমস্যার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল। সেই চিকিৎসার ব্যয় পরিবারের জন্য সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত বার্সেলোনার সঙ্গে তার নতুন জীবনের শুরু হয়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে রোজারিও থেকে বার্সেলোনায় চলে যাওয়া কোন শিশুর জন্যই সহজ নয়। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন পরিবেশ, পরিবার থেকে দূরত্ব সবকিছু সামলে তাকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। এসব কথা তিনি বহুবার উচ্চারণ করেছেন।
মেসির মানবিকতা ও ব্যক্তিত্ব বোঝার ক্ষেত্রে পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ। স্ত্রী আন্তোনেল্লা রোকুজ্জো, সন্তানদের সঙ্গে তার সম্পর্ক, মা-বাবার সাথে তার মধুর সম্পর্ক, তাকে অন্য এক মেসি হিসেবে তুলে ধরে। বিশ্বখ্যাত ফুটবলার হিসেবে তার জীবন যতই ব্যস্ত হোক, আমরা দেখেছি পরিবার তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থেকেছে। পিতার মৃত্যুর আগে পিতার অসুস্থতা নিয়ে তার আকুতি আমরা দেখতে পেয়েছিলাম। প্রিয় সন্তানদের সঙ্গে তার ছবি, পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটানোর মুহূর্ত, ছেলেদের ফুটবল খেলা দেখানো— এসব দৃশ্য ভক্তদের কাছে তাকে আরও কাছের মানুষ করে তুলেছে। আমরা দেখেছি কোটি কোটি মানুষের প্রিয় তারকার আড়ালেও তিনি একজন বাবা, একজন স্বামী, একজন ছেলে এবং একজন সাধারণ মানুষ।
মেসির নীরব মানবিকতাও সবার মন কেড়েছে। তিনি কখনও কোথাও অহেতুক উচ্চকিত নন। বরং বরাবরই নীরব এক তারকা। আর তাই নিজেকে নয়, নিজের প্রতিটি ভালো কাজকে বড় করে প্রচার করতে চান। তার অনেক মানবিক উদ্যোগ সংগঠন, ফাউন্ডেশন কিংবা বিভিন্ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
