আর্জেন্টিনা: ৩ (লিওনেল মেসি হ্যাটট্রিক) আলজেরিয়া: ০
খবর অনলাইন ডেস্ক: ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের জন্ম দিলেন লিওনেল মেসি। জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের ২০০তম ম্যাচে মাঠে নেমে ৩৮ বছর বয়সি এই মহাতারকা শুধু আর্জেন্টিনাকে গুরুত্বপূর্ণ জয়ই এনে দিলেন না, বরং বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬ গোলের রেকর্ডও স্পর্শ করেছেন।
– বিজ্ঞাপন –
গ্রুপ ‘জে’-এর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা। ম্যাচের তিনটি গোলই করেন অধিনায়ক মেসি, পূরণ করেন দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক।
অফসাইডের জন্য আলজেরিয়ার গোল বাতিল
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয়। কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচের শিষ্যরা প্রথম থেকেই আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ম্যাচের নবম মিনিটে ফারেস চাইবি বল জালে জড়ালে আলজেরিয়া উল্লাসে মেতে ওঠে। কিন্তু ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তির সহায়তায় গোলটি বাতিল করা হয়, কারণ আক্রমণের সময় অফসাইডের ঘটনা ধরা পড়ে।
এই সতর্কবার্তার পরই ধীরে ধীরে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পায় আর্জেন্টিনা। কোচ লিওনেল স্কালোনির ৪-৩-৩ কৌশলে মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। তাদের দারুণ সমন্বয়ে খেলার গতি নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসে দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিনিধিরা।
মেসির প্রথম জাদু
ম্যাচের ১৭তম মিনিটে দেখা যায় মেসির প্রথম জাদু। প্রতিপক্ষের বক্সের বাইরে বল পেয়ে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত এক শটে আলজেরিয়ার গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন তিনি। চোখধাঁধানো সেই গোল আর্জেন্টিনাকে এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত লিড।
বিজ্ঞাপন
প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়লেও আলজেরিয়া লড়াই চালিয়ে যায়। বিশেষ করে মোহাম্মদ আমোরার নেতৃত্বে কয়েকটি আক্রমণ আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রাখে। তবে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজের দৃঢ়তায় বড় কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি আফ্রিকান দলটি।
হ্যাটট্রিক করলেন মেসি
বিরতির পর আর্জেন্টিনা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। খেলার গতি বাড়াতে কোচ স্কালোনি মাঠে নামান হুলিয়ান আলভারেজ ও নাহুয়েল মোলিনাকে। পরিবর্তনের সুফলও মেলে দ্রুত।
৬০তম মিনিটে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের দীর্ঘ পাস থেকে শুরু হওয়া আক্রমণে আলজেরিয়ার বক্সে তৈরি হয় জটলা। কয়েকজন খেলোয়াড়ের পায়ে ঘুরে বল চলে আসে মেসির সামনে। সুযোগ বুঝে কাছ থেকে বল জালে পাঠিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা পৌঁছে যায় ১৫-তে, যা ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদোর রেকর্ডের সমান।
তবে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত আসে ৭৬তম মিনিটে। দারুণ এক আক্রমণ থেকে বল পেয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন মেসি। সেই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬-তে। ফলে জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডে নাম লেখান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
মার্তিনেজের প্রত্যাবর্তন
মেসির ব্যক্তিগত কীর্তির পাশাপাশি আলোচনায় ছিল এমিলিয়ানো মার্তিনেজের প্রত্যাবর্তনও। আঙুলের চোট কাটিয়ে মাঠে ফিরে তিনি রক্ষণভাগে বাড়তি আত্মবিশ্বাস এনে দেন। যদিও তাঁকে খুব বেশি কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়নি, তবুও প্রয়োজনের মুহূর্তে তাঁর উপস্থিতি দলকে স্থিরতা দিয়েছে।
পুরো ম্যাচ জুড়ে আর্জেন্টিনা দলগত ফুটবলের উজ্জ্বল উদাহরণ উপস্থাপন করে। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণভাগের দৃঢ়তা এবং আক্রমণভাগের ধার—সব মিলিয়ে তারা নিজেদের শিরোপাপ্রত্যাশী দলের মর্যাদা আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
মেসিকে সম্মান জানাল গোটা স্টেডিয়াম
৩-০ গোলের এই জয় শুধু গ্রুপ ‘জে’-তে আর্জেন্টিনার অবস্থান আরও শক্তিশালী করেনি, বরং আবার প্রমাণ করেছে যে বয়স কেবল একটি সংখ্যা। ৩৮ বছর বয়সেও লিওনেল মেসি দলের সবচেয়ে বড় ভরসা, সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী নেতা এবং ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেওয়ার মতো খেলোয়াড়।
ম্যাচের ৭৯তম মিনিটে যখন তাঁকে বদলি করা হয়, তখন পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে তাঁকে সম্মান জানায়। সেই মুহূর্ত যেন ছিল বিশ্ব ফুটবলের এক জীবন্ত কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য—যিনি ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসেও নতুন নতুন ইতিহাস রচনা করে চলেছেন।
