খবর অনলাইন ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ, সংগঠিত অপরাধ এবং জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা রুখতে সোমবার থেকে কার্যকর হল রাজ্য সরকারের নতুন ‘গুন্ডাদমন আইন’। এই আইনের আনুষ্ঠানিক নাম ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ অ্যাক্ট, ২০২৬’। রাজ্য সরকারের দাবি, আইনশৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী করা এবং সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতেই এই আইন কার্যকর করা হয়েছে।
শুক্রবার বারুইপুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নতুন আইন কার্যকর হওয়ার কথা ঘোষণা করেন। নবান্নের বক্তব্য, অপরাধীদের মনে ভীতি তৈরি করা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই আইনের মূল উদ্দেশ্য।
– বিজ্ঞাপন –
কী কী থাকছে নতুন আইনে?
১. বিনা বিচারে এক বছর পর্যন্ত আটক
আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন’ বা নিবর্তনমূলক আটক। প্রশাসনের কাছে যদি মনে হয়, কোনও ব্যক্তি ভবিষ্যতে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারেন বা বড় ধরনের অপরাধের পরিকল্পনা করছেন, তবে তাঁকে বিনা বিচারে সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত আটক রাখা যাবে।
২. এলাকাছাড়া করার ক্ষমতা
জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার বা ডিআইজি পদমর্যাদার আধিকারিকেরা প্রয়োজনে কোনও দাগী অপরাধীকে এক বছরের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা বা গোটা জেলা থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ দিতে পারবেন, যদি তাঁর উপস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৩. জামিন পাওয়া হবে কঠিন
নতুন আইনের আওতায় থাকা সমস্ত অপরাধকে জামিন-অযোগ্য করা হয়েছে। ফলে পুলিশ পরোয়ানা ছাড়াই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারবে এবং সহজে জামিন পাওয়া কঠিন হবে।
৪. সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
সংগঠিত অপরাধ, সিন্ডিকেট, তোলাবাজি বা অন্য সমাজবিরোধী কার্যকলাপের মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি ও অর্থ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে প্রশাসনকে।
বিজ্ঞাপন
কোন কোন অপরাধ এই আইনের আওতায়?
আইনে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের সংজ্ঞা অনেকটাই বিস্তৃত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- সিন্ডিকেটরাজ ও তোলাবাজি
- জোর করে জমি বা বাড়ি দখল
- অবৈধ বালি তোলা ও বেআইনি খনি ব্যবসা
- সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি
- সাইবার অপরাধ
- বড় আর্থিক জালিয়াতি
- সংগঠিত অপরাধমূলক কার্যকলাপ
সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরে কড়া ব্যবস্থা
নতুন আইনের পাশাপাশি কার্যকর হচ্ছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। এর আওতায় একটি ক্লেম কমিশন গঠন করা হবে। কোনও বিক্ষোভ, দাঙ্গা বা হিংসার ঘটনায় সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হলে সেই ক্ষতিপূরণ অভিযুক্তদের থেকেই আদায় করা হবে।
কেন আনা হল এই আইন?
বিল পাশের সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ২০১৯ সালের সিএএ বিরোধী আন্দোলনের সময় মুর্শিদাবাদে থানায় হামলা, ট্রেনে আগুন, রেল স্টেশনে ভাঙচুর এবং সরকারি বাস পোড়ানোর মতো ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় পর্যাপ্ত আইনি ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষতিপূরণ আদায় বা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রুখতে এবং সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হলে দায়ীদের কাছ থেকেই ক্ষতিপূরণ আদায় নিশ্চিত করতে এই আইন আনা হয়েছে।
তবে আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক ও আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁদের মতে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই আইনের প্রয়োগ যাতে স্বচ্ছ ও আইনের সীমার মধ্যেই থাকে, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।
