নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধস থেকে তৈরি ভয়াবহ হড়পা বানে বিপর্যস্ত বিস্তীর্ণ এলাকা। বুধবারের আকস্মিক বন্যা ও ধসের পর একের পর এক দেহ উদ্ধার হচ্ছে নদীর নিম্ন অববাহিকা থেকে। শনিবার পর্যন্ত নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬২৬। তিব্বতে আরও সাত জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩৩। পাশাপাশি নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে এখনও প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাবে, সে দেশে এখনও ২,৪২৬ জনের কোনও সন্ধান নেই। উদ্ধারকাজে নেমেছে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী ও উদ্ধারকারী। ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, কাদায় আটকে থাকা রাস্তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজে একাধিক বাধা তৈরি হয়েছে।
– বিজ্ঞাপন –
কী ভাবে বিপর্যয়?
চিন সীমান্তের কাছাকাছি নেপালের রাসুয়া এলাকায় বুধবার সকালে আচমকা বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও জল নেমে আসে। প্রথমে হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ার ঘটনা ঘটে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। সেই ধস লেন্দে নদীর জলপ্রবাহে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়। পরে তার প্রভাব পড়ে ভোতে কোশী এবং ত্রিশূলি নদীতেও। মুহূর্তের মধ্যে নদীর জল ফুলেফেঁপে উঠে ভাসিয়ে নিয়ে যায় বাড়িঘর, সেতু, রাস্তা এবং বিভিন্ন পরিকাঠামো।
বিপর্যয়ের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়েছে রাসুয়া এবং আশপাশের জেলাগুলিতে। নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া বহু মানুষের দেহ অনেক দূরে নীচের দিকে গিয়ে উদ্ধার হচ্ছে। ফলে উদ্ধারকাজ এখন শুধু বিপর্যয়স্থলে সীমাবদ্ধ নেই। চিতওয়ান, নাওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, তানাহুন এবং নাওয়ালপরাসি-সহ একাধিক এলাকায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
এখনও আতঙ্ক কাটছে না
প্রাথমিক বিপর্যয়ের পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও নতুন করে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ধসের জেরে তৈরি হওয়া জলাধারগুলির জলস্তর নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কোথাও বাঁধের মতো তৈরি হওয়া বরফ-পাথরের স্তূপ ভেঙে গেলে ফের আচমকা জলের স্রোত নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্তৃপক্ষ।
এই পরিস্থিতিতে ভোতে কোশী ও ত্রিশূলি নদীর অববাহিকার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। উদ্ধারকারীদেরও অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিদেশিরাও নিখোঁজ
বিপর্যয়ের জেরে বহু বিদেশি নাগরিকেরও খোঁজ মিলছে না। নেপালের সরকারি হিসাবে নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। সীমান্তের ওপারে তিব্বতেও বহু বিদেশি নিখোঁজ বলে চিনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। অন্য দিকে, নেপাল পর্যটন পর্ষদের তালিকায় থাকা বেশ কিছু বিদেশি পর্যটককে ইতিমধ্যেই উদ্ধার করা হয়েছে।
এই বিপর্যয়ের কারণে নেপালের পর্যটন এবং চিনের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্যও বড় ধাক্কা খেয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পরিকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গম এলাকাগুলিতে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সাহায্যেও বদল অবস্থান
বিপর্যয়ের শুরুতে নেপাল নিজস্ব উদ্ধারকারী বাহিনীর উপরেই নির্ভর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে পরে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। উদ্ধারকাজে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি কাদায় আটকে থাকা এলাকা এবং বিভিন্ন পরিকাঠামোর ভিতরে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। রাস্তা, সেতু, বসতি এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নেপালের অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী দেশটির পুনর্গঠনে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে। তবে সম্পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনও তৈরি হয়নি।
সব মিলিয়ে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই বিপর্যয় এখন শুধু একটি হড়পা বানের ঘটনা নয়, বরং বিস্তীর্ণ হিমালয় অঞ্চলের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি যত এগোবে, বিপর্যয়ের প্রকৃত ছবিও তত স্পষ্ট হবে।
