ছবির উৎস, AFP via Getty Images
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
থাইল্যান্ডের একটি স্কুলে বন্দুক নিয়ে হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন কিশোর হামলাকারীসহ অন্তত আটজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে পাঁচজনই স্কুলটির শিক্ষক।
রাজধানী ব্যাংককের একেবারে পাশেই অবস্থিত ননতাবুরি প্রদেশের ব্যাং ক্রুয়াই জেলার একটি স্কুলে আজ গুলির ঘটনা ঘটে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ হামলাকারীকে স্কুলটিরই একজন শিক্ষার্থী হিসেবে শনাক্ত করেছে।
স্থানীয় সময় সকাল ১০টার কিছু পরে ডেবসিরিন ননতাবুরি স্কুলে গুলির ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষ বলছে, সন্দেহভাজন হামলাকারী ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর যে স্কুলে যাওয়ার আগে নিজের বাড়িতে তার দাদা-দাদিকে হত্যা করে।
পুলিশ জানিয়েছে, সে যে ৯ মিলিমিটার পিস্তল ব্যবহার করেছে সেটি তার দাদার ছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার কাছে আরও অন্তত ৩৪ রাউন্ড গুলি পাওয়া গেছে।
সন্দেহভাজন হামলাকারীর মৃত্যু হয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। সে নিজের গুলিতেই মারা গেছে বলে জানানো হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, তার উদ্দেশ্য কী ছিল তা তারা এখনো জানে না।
এই ঘটনায় ৩০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নয়জনের অবস্থা ‘গুরুতর’ বলে জানিয়েছেন থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল।
এ ঘটনার পর থাইল্যান্ডের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার আহ্বান নতুন করে জোরালো হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডে অস্ত্রের মালিকানার হার অন্যতম উচ্চ।
ছবির উৎস, Getty Images
একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে আশ্রয় নেওয়ার দৃশ্যের একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে গুলির শব্দের মতো শোনায় এমন বিস্ফোরণধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা ডেস্ক ও চেয়ারের নিচে ঝুঁকে আশ্রয় নিচ্ছে এবং একে অপরের দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বন্দুক হামলার ঘটনার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ ‘জরুরি পরিস্থিতি’ ঘোষণা করে আজ ও আগামীকালের সব কার্যক্রম বাতিল ঘোষণা করেছে।
ফেসবুকে একটি পোস্টে, স্কুলটি রক্তদানের জন্য একটি আহ্বানও জানিয়েছে।
স্কুলটি শতবর্ষী একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংককের খ্যাতনামা ডেবসিরিন স্কুলের একটি স্থানীয় শাখা। মূল ডেবসিরিন স্কুলও একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ‘এই ক্ষতির জন্য গভীর সমবেদনা’ প্রকাশ করেছে।
এদিকে, সন্দেহভাজন হামলাকারী কিশোরের ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, ছেলেটি ‘পড়াশোনার চাপে’ ভুগছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে স্কুলের একজন শিক্ষক বলেছেন যে ছেলেটি “ভালো ছাত্র ছিল এবং তার পড়াশোনার রেকর্ডও ভালো ছিল” এবং তাকে আক্রমণাত্মক হিসেবে জানা যায়নি।
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মি. আনুতিন বলেন, হামলাটি ‘সুপরিকল্পিত’ ছিল এবং এর ‘সুস্পষ্ট পদক্ষেপ ও সুস্পষ্ট লক্ষ্য’ ছিল।
ব্যবহৃত বন্দুকটি হামলাকারীর দাদার নামে নিবন্ধিত ছিল এবং বন্দুকধারী এপ্রিল মাসে ইনস্টাগ্রামে এটি প্রদর্শন করেছিল।
হামলার পর কর্তৃপক্ষ হামলাকারীর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে দুটি মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার পরেই পুলিশ তার দাদা-দাদিকে হত্যার বিষয়টি জানতে পারে। ছেলেটি তাদের সঙ্গেই থাকতো।
থাইল্যান্ডের উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পোলাপি সুওয়ানচাওয়ি জানান, পুলিশ ওই কিশোরের বাড়ি থেকে যে প্রমাণ সংগ্রহ করেছে, তাতে জানা গেছে যে সে একজন আসক্ত গেমার ছিল।
রয়্যাল থাই পুলিশ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা গুলির ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন এবং বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি তদন্ত পরিচালনা করছে।
ছবির উৎস, Reuters
ছবির উৎস, Reuters
‘আমার শিক্ষক গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় আমি সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম’
স্কুল ইউনিফর্ম পরা সপ্তম শ্রেণির একজন ছাত্রী বিবিসি নিউজ ব্যাংককের প্রোডিউসার থানইয়ারাত ডকসোনের সঙ্গে কথা বলে। ঘটনা পর সে তার মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল এবং স্কুলের বিপরীত পাশে থাকা একটি খাবারের দোকানের সামনে থেকে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল।
সে বলে, “শিক্ষককে গুলি করার সময় আমি তার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখনই (বন্দুকধারী) সেখানে এসে তাকে গুলি করে।”
“ধুলার মেঘ ছাড়া আমি আর কিছুই দেখতে পাইনি। সে এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে যাচ্ছিল। আমার ডেস্ক শিক্ষকের খুব কাছেই ছিল। অন্য বন্ধুদের সঙ্গে পালিয়ে বাঁচতে আমাকে স্কুলের বেড়া টপকে যেতে হয়েছে।”
মেয়েটিকে তখনও স্পষ্টতই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মনে হচ্ছিল। তার মা বলেন, তার মেয়ে তাকে বলেছিল, “আমি ভেবেছিলাম, আর কখনও তোমাকে দেখতে পাব না।”
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে গুলির ঘটনা চলার পর হামলাকারী ওই শিক্ষার্থী নিজের ওপরই গুলি চালায় বলে মনে হচ্ছে।
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
ব্যাংকক থেকে বিবিসির সাংবাদিক জোনাথন হিড জানান, স্কুলটি ব্যাংককের উত্তরে একটি বড় শহরের আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত। এখান থেকে অনেক মানুষ রাজধানীতে যাতায়াত করেন এবং এলাকায় এটি একটি অত্যন্ত পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে এ ঘটনা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
এ বছর থাইল্যান্ডে এটি দ্বিতীয় স্কুলে গুলির ঘটনা। ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ থাইল্যান্ডে একটি স্কুল অবরোধের সময় ১৮ বছর বয়সী একজন বন্দুকধারীর গুলিতে এক স্কুলপ্রধান ও এক ছাত্রী নিহত হন।
২০২২ সালের অক্টোবরে পূর্বাঞ্চলীয় নং বুয়া লামফু প্রদেশের ৩৪ বছর বয়সী এক বাসিন্দা ৩৭ জনকে হত্যা করেন, যাদের অধিকাংশই ছিল প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিশু।
এখানে মূল প্রশ্ন হচ্ছে, থাইল্যান্ডে অস্ত্রের মালিকানার ওপর কিছু বিধিনিষেধ থাকলেও মানুষ এখনো তুলনামূলকভাবে সহজেই আইনসম্মত বা অবৈধ উপায়ে অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডে অস্ত্রের মালিকানার হার অন্যতম বেশি।
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এর আগেও প্রশ্ন উঠেছে, তবে অস্ত্র-সংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনে দেশটির কর্তৃপক্ষ কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
