নয়ডার শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনায় দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক আকৃতি চৌধুরীকে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (NSA)-এ আটক করার ঘটনায় গৌতম বুদ্ধ নগরের জেলাশাসক মেধা রূপমের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলল এলাহাবাদ হাই কোর্ট। গত ২ সেপ্টেম্বর আকৃতির বিরুদ্ধে NSA-র অধীনে জারি করা আটকাদেশ খারিজ করেছিল আদালত। সোমবার প্রকাশ্যে আসা বিস্তারিত রায়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে একাধিক কড়া পর্যবেক্ষণ করেছে বিচারপতি অতুল শ্রীধরন ও বিচারপতি অচল সচদেবের ডিভিশন বেঞ্চ।
মেধা রূপম দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কন্যা এবং বর্তমানে গৌতম বুদ্ধ নগরের জেলাশাসক। ২০১৪ ব্যাচের এই IAS আধিকারিক ২০২৫ সালে নয়ডার প্রথম মহিলা জেলাশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন।
– বিজ্ঞাপন –
‘দৃষ্টান্ত স্থাপন’ করতে NSA প্রয়োগ?
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আকৃতির বিরুদ্ধে NSA প্রয়োগের সিদ্ধান্তের পিছনে তাঁকে ‘দৃষ্টান্ত’ হিসেবে তুলে ধরার মানসিকতা কাজ করেছিল। আদালত এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে জানায়, আটকাদেশের পক্ষে প্রয়োজনীয় উপাদান ও যুক্তি যথেষ্ট ছিল না। বিচারপতিদের মতে, এই ধরনের পদক্ষেপ আকৃতির মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে।
আদালত আরও বলেছে, প্রশাসনের এমন পদক্ষেপ মত প্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করে। নাগরিকদের অধিকার রক্ষার জন্যই আমলা ও পুলিশকে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে—সেই ক্ষমতার যথেচ্ছ প্রয়োগ গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছে বেঞ্চ।
৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ, দিতে হবে আধিকারিকদের বেতন থেকে
আকৃতি চৌধুরীর জন্য ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সেই অর্থ গৌতম বুদ্ধ নগরের জেলাশাসক মেধা রূপম এবং মামলার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য দায়ী আধিকারিকদের বেতন থেকে আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্ট তৈরির সঙ্গে যুক্ত পুলিশ আধিকারিকদের ক্ষেত্রেও দায় নির্ধারণের কথা জানিয়েছে আদালত।
শুধু তাই নয়, জেলাশাসক এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়ে আদালতের ‘অসন্তোষ’-এর কথাও তাঁদের সার্ভিস রেকর্ডে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
‘রাজনৈতিক প্রশাসনের নয়, সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ’
রায়ে আমলা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়েও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছে ডিভিশন বেঞ্চ। বিচারপতিদের বক্তব্য, IAS ও IPS আধিকারিকদের মনে রাখতে হবে যে তাঁদের আনুগত্য সংবিধানের প্রতি, রাজনৈতিক প্রশাসনের প্রতি নয়।
আদালত সতর্ক করেছে, প্রশাসনের এমন আচরণ করা উচিত নয় যাতে তাঁদের ব্রিটিশ আমলের দমন-পীড়নের বাহকের মতো মনে হয়। নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষা করাই প্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব বলেও মনে করিয়ে দিয়েছে বেঞ্চ।
‘১৯৮৪’-এর প্রসঙ্গ টেনে বিস্ফোরক সতর্কবার্তা
আদালতের রায়ে জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘১৯৮৪’-এর প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। বিচারপতিদের আশঙ্কা, আমলাতন্ত্র ও পুলিশের ক্ষমতার এমন অপব্যবহার চলতে থাকলে উত্তরপ্রদেশ অচিরেই একটি ‘Orwellian Dystopia’-য় পরিণত হতে পারে।
অরওয়েলের ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত ‘১৯৮৪’ উপন্যাসে এমন একটি সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রব্যবস্থার ছবি তুলে ধরা হয়েছিল, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, চিন্তা এবং মতপ্রকাশ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে। সেই প্রসঙ্গ টেনেই প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে সতর্ক করেছে আদালত।
পাঁচ মাসের আটক, খারিজ NSA
নয়ডায় শ্রমিকদের বেতন ও কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত বিক্ষোভের পর আকৃতি চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে তাঁর বিরুদ্ধে NSA প্রয়োগ করা হয় এবং প্রায় পাঁচ মাস তিনি হেফাজতে ছিলেন। আদালত NSA-র আটকাদেশ খারিজ করে দেয়। তবে বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় জামিন না পাওয়ায় তাঁর হেফাজত সংক্রান্ত আইনি পরিস্থিতি আলাদাভাবে চলতে পারে বলে আদালতের নথি থেকে জানা যাচ্ছে।
এখন এলাহাবাদ হাই কোর্টের এই বিস্ফোরক পর্যবেক্ষণের পর নয়ডা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নেও রায়টি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
