ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানোর পরও, সপ্তাহান্তে ইরানের সাথে ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও সরাসরি সংঘাতের মুখে ঠেলে দেওয়ার শঙ্কা তৈরি করেছে।
এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এর আগে ইরান ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে।
তেহরানের দাবি, বৈরুতের ওপর ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই তারা এই হামলা চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর তিন মাসেরও বেশি সময় পরও মধ্যপ্রাচ্য যে কতটা অস্থিতিশীল রয়ে গেছে, ভঙ্গুর জোট এবং অকার্যকর যুদ্ধবিরতির বর্তমান জটিল পরিস্থিতি তা স্পষ্ট করে।
সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা যুদ্ধের বর্তমান গতিপথ সম্পর্কে তিনটি বিষয় তুলে ধরে—
ট্রাম্প প্রকাশ্যে যতটা দাবি করেন, বাস্তবে তিনি হয়তো ইসরায়েলকে ততটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না বা করতে চান না।
এই বিষয়টি তেহরানেরও অজানা নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যেকোনো মতপার্থক্যকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে ইরান।
ইরান এমনকি নিজের ভূখণ্ডে পাল্টা হামলার ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত, যাতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের সঙ্গে ইসরায়েল-হেজবুল্লাহ সংঘাতকে এক সুতোয় গাঁথা যায়।
পারমাণবিক ইস্যুতে ট্রাম্প যে চুক্তি করতে আগ্রহী, তা এখনই হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ, ইরানের ধারণা ট্রাম্পের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ বর্তমানে কম।
ছবির উৎস, Reuters
তাই আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আরও বেশি ছাড় আদায়ের চেষ্টা করছে তেহরান।
রোববার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ট্রাম্প কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের একজনকে তিনি বলেন, “আমি এখনই (নেতানিয়াহুকে) ফোন করে বলব, তিনি যেনো পাল্টা হামলা না চালান।”
এই বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইসরায়েলের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা তেহরানের সঙ্গে ট্রাম্পের অত্যন্ত নাজুক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে।
কয়েক ঘণ্টা পরই ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালায়। সোমবার বিকেলে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি যখন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন ইসরায়েলের যুদ্ধবিমানগুলো পথেই ছিল।
বিবিসির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত ফোনালাপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অস্বীকার করেন যে, নেতানিয়াহু তাঁর নির্দেশ অমান্য করেছেন। তিনি বলেন, “আমি যদি তাকে কিছু করতে বলি, সে তা-ই করবে।”
বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে থামাতে ব্যর্থ হয়েছেন। দুই নেতার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ের টানাপোড়েনের ধারাবাহিকতায় এটিকে আরও একটি উত্তেজনাপূর্ণ পর্ব হিসেবে দেখা যেতে পারে।
গত সপ্তাহে, ট্রাম্প নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অকথ্য ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বৈরুত আক্রমণ করতে চাওয়ার জন্য এই ইসরায়েলি নেতাকে ‘পাগল’ বলে আখ্যা দেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর বক্তব্য ছিল, উত্তর ইসরায়েলের প্রতি হেজবুল্লাহর হুমকির কারণে বৈরুতে হামলা চালানো প্রয়োজন ছিল।
ছবির উৎস, Getty Images
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আশঙ্কা ছিল, নেতানিয়াহুর এমন আচরণ তেহরানের সঙ্গে তাঁর সমঝোতার প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সেই আলোচনার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিশ্চয়তা আদায় করা।
গত সপ্তাহে নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “নেতানিয়াহু লেবাননের সঙ্গে সবসময় লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ছেন”। এবং এই বিষয়টি তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছে।
তাহলে কি ইরানে সর্বশেষ হামলা চালিয়ে নেতানিয়াহু ট্রাম্পের নির্দেশ অমান্য করেছেন? এটি এখন বহুল আলোচিত একটি ব্যাখ্যা হলেও, বাস্তবতা সম্ভবত তা নয়।
ইসরায়েলের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দেয় যে ওয়াশিংটন অন্তত সীমিত মাত্রায় সম্মতি দিয়েছিল, তবে প্রেসিডেন্টের দৃষ্টিতে তা ছিল সতর্কভাবে এগোনো এবং সম্ভবত এক দফা পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার সোমবার সকালে বিবিসিকে বলেন, “ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘ঝলমলে হলুদ সংকেত’ দিয়েছিলেন। বাস্তব দিক থেকে দেখলে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত নীরব সম্মতি ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে ইরানে হামলা চালানো সম্ভব ছিল না”।
ইরাক আক্রমণের পর এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে তার সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ঘটিয়েছে।
ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত সামরিক কর্মী মোতায়েন আছে, যারা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সঙ্গে সমন্বয় করছে।
এই পরিস্থিতিতে, আকাশপথ ব্যবহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর সঙ্গে ইসরায়েলের অবশ্যই সমন্বয় প্রয়োজন ছিল।
হামলার পর আইডিএফ ইসরায়েলি সাংবাদিকদের জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে সম্পূর্ণ সমন্বয় করা হয়েছিল আগেই।
ছবির উৎস, Kevin Dietsch via Getty Images
তারা আরও জানায়, ইসরায়েলের দিকে ইরানের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও সহায়তা করেছে।
সোমবার বিকেলের দিকে ওয়াশিংটনের সময় অনুযায়ী দেখা যায়, ইসরায়েল ও ইরান দুই পক্ষই ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে তাদের মধ্যে চলমান এই দফার সংঘর্ষ শেষ হয়েছে। ট্রাম্পের জন্যও এটিই ছিল কাঙ্ক্ষিত অবস্থান।
রোববার রাতে নেতানিয়াহুকে থামানোর যে বার্তা তিনি দিয়েছিলেন, তা হয়তো ইরানের উদ্দেশে একটি রাজনৈতিক বার্তা ছিল—যাতে বোঝানো যায় ওয়াশিংটন ইসরায়েলের হামলা থেকে নিজেদের দূরে রাখছে।
অথবা তিনি সত্যিই নেতানিয়াহুকে থামাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরে তাকে রাজি করানো হয়েছে বা তিনি ভিন্ন অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
এই ব্যাখ্যাগুলোর যেকোনো একটি সত্য হতে পারে। যেখানে ইসরায়েল মনে করেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব না দিয়ে থাকা সম্ভব নয়। সেখানে ইরানের হামলা চালানোর পেছনের হিসাবটা ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ।
লেবাননের ওপর ইসরায়েলি হামলার জবাবে এই প্রথমবার ইরান ইসরায়েলের দিকে গুলি চালিয়েছিল (ইরানের ওপর ইসরায়েলি হামলার সরাসরি প্রতিশোধ হিসেবে নয়)।
ইরান আসলে চেষ্টা করছিল দুটি আলাদা যুদ্ধবিরতিকে একসূত্রে বাঁধতে। একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের নিজেদের যুদ্ধবিরতি এবং অন্যটি ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নামেমাত্র বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি।
একই সঙ্গে তারা ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়াও যাচাই করছিল। যুক্তরাষ্ট্র কি ইসরায়েলের পাল্টা হামলাকে কতটা সমর্থন করবে?
বা তারা কি নিজেরাই সেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে?
ছবির উৎস, Getty Images
ইরানের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের দিকনির্দেশনা নিয়ে যত বেশি মতভেদ তৈরি করা যায়, ততই তা তাদের জন্য সুবিধাজনক।
শেষ পর্যন্ত, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে নিজেকে দূরে রাখার অবস্থানই নিয়েছেন—এবং তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
উত্তেজনা বৃদ্ধির কয়েক ঘণ্টা আগে, রোববার এনবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার এই মত পুনর্ব্যক্ত করেন যে, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির খুবই কাছাকাছি তারা।
ইরানের নেতারা এই সংঘর্ষের ফলাফলে আরও আত্মবিশ্বাসী বলে মনে হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
তিনি কূটনীতি ও প্রতিরক্ষাকে জাতীয় শক্তির দুইটি ডানা হিসেবে আখ্যা দেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি পোস্টে তিনি লেখেন, “আমরা মাঠও ছাড়িনি, আলোচনার টেবিলও নয়।”
অন্যদিকে ইরানের অর্থনীতি তীব্র চাপে রয়েছে, যা দেশটির বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে আরও খারাপ হয়েছে।
এর নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনা থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তত দুটি বিষয় চায়। এর মধ্যে একটি হলো অর্থের যোগান, যা নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং তেল রাজস্ব থেকে কয়েক হাজার কোটি ডলারের অবমুক্তকরণের মাধ্যমে পাওয়া যাবে।
ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images
দ্বিতীয়টি হলো লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের উত্তেজনা সীমিত করা। কারণ তেহরান মনে করে, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ হামলা ঠেকানোর একটি প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে কাজ করে।
অন্যদিকে, ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে তেলের দাম বাড়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে চাপে পড়েছে। এবং মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে ট্রাম্পের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে বলে তেহরান ধারণা করছে।
যদিও প্রতিটি নতুন উত্তেজনা তার ধৈর্যকে আরও সীমিত করে তুলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইরান সম্ভবত আলোচনার এজেন্ডায় নিজেদের দুইটি মূল দাবি আগেভাগেই অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করবে, অর্থাৎ চুক্তির শুরুতেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও সম্পদ অবমুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাইবে।
কারণ তাদের ধারণা, ট্রাম্প সংঘাতে ফেরার চেয়ে চুক্তি করতেই বেশি আগ্রহী।
রোববার সাক্ষাৎকারে মি. ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কোনো চুক্তির অংশ হিসেবে তিনি কি শুরুতেই ইরানের কিছু সম্পদ অবমুক্ত করবেন বা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবেন কী-না। তিনি জবাব দেন: “না।”
তার এই অবস্থানই হয়তো এখনো কোনো চুক্তি না হওয়ার একটি কারণ।
কিন্তু এ অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতার প্রবল সম্ভাবনা রয়ে গেছে, যা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবারও সরাসরি লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দেবে।
