ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টি হয়েই চলেছে। একই সাথে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি চলমান থাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয় কি-না তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, এ মুহূর্তে দেশের ছয়টি জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত চারটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী আরও কয়েকদিন সারাদেশেই মাঝারি থেকে ভারী বা অতি ভারী টানা বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইতোমধ্যেই যে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার আরও অবনতি হবে কি-না তা নিয়ে অনেকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলছেন, কিছু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির ক্রমশ উন্নতির আশা করলেও সিলেট, সুনামগঞ্জ ও রংপুর অঞ্চলে বন্যার অবস্থার অবনতি হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ইতোমধ্যেই জানানো হয়েছে যে, সারাদেশে ভারী বর্ষণ ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত কয়েকদিন ধরেই বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় টানা কিংবা থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। নদনদীর পানি বেড়ে অনেক জায়গায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে, ঘটেছে পাহাড়ধসের ঘটনাও।
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
বন্যার এখন কী অবস্থা
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানে এখন বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং ভারী বর্ষণের কারণে ফেনী অঞ্চলেও বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।
সাঙ্গু নদী বান্দরবান ও চট্টগ্রামে দোহাজারীতে, হবিগঞ্জে খোয়াই নদী, মৌলভীবাজারে মনু নদী এবং সুনামগঞ্জ ও সিলেটে কুশিয়ারা নদী বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
আবার আগামী এক থেকে দুই দিনে সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে এবং এসব অঞ্চল সংলগ্ন উজানে ভারতের মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে।
এছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও এসময়ে সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
তবে এ সময়ে বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার কিছু এলাকায় আবার বন্যা পরিস্থিতির ধীর গতিতে উন্নতি হতে পারে।
এছাড়া সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে।
সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে এবং সুরমা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিতে পারে বলে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র বলছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শাহ মোঃ সজিব হোসাইন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সিলেট অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে এবং আগামী দুই-তিন পরিস্থিতি একই রকম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
একই সাথে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলাতেও বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।
ছবির উৎস, http://old.ffwc.gov.bd/
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
পাহাড়ি ঢলের শঙ্কা
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ভারতীয় রাজ্যগুলোতে অতিভারী বৃষ্টিপাত হলে পাহাড়ি ঢলের পানির কারণে বাংলাদেশের সিলেট, ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলের নদনদীতে পানি বেড়ে যেতে পারে এবং এর ফলে নিচু এলাকায় নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে কিছু স্থানে সাময়িক প্লাবিত হতে পারে।
“বৃষ্টি চট্টগ্রামের দিকে কিছুটা কমেছে। তবে ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত হয়তো আরও হবে। বর্ষাকাল চলছে এবং একই সাথে মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকায় বৃষ্টি কিছুটা হবে। তবে এতে খারাপ কিছুর আশঙ্কা নেই,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ।
আবহাওয়া অফিস আজ রোববার বৃষ্টিপাতের যে সতর্কতা জারি করেছে সেখানে বলা হয়েছে, “সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আজ দুপুর থেকে পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে”।
আগামী পাঁচ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বাংলাদেশের আটটি বিভাগের অধিকাংশ জায়গাতেই মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। তবে সপ্তাহের শেষ দিকে বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা কমে আসতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত, ১৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
ওদিকে, নদনদীগুলোর সবশেষ অবস্থা জানাতে গিয়ে বন্যা সতর্কীরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি কমে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় গঙ্গা নদীর পানি বেড়েছে ও পদ্মার পানি এখনো স্থিতিশীল আছে। তবে গঙ্গা-পদ্মার পানি আগামী দুইদিন স্থিতিশীল থাকলেও এরপর বেড়ে যেতে পারে।
উত্তরাঞ্চলে তিস্তা, ধরলা করতোয়া, আত্রাই ও দুধকুমার নদীর পানি বেড়েছে। তিস্তা নদী কয়েকটি পয়েন্টে সতর্কসীমার মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব নদীর পানিও বাড়তে পারে বলে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র বলছে।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা সদর ও এর চারপাশের নদী অববাহিকায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী ও টঙ্গীখাল নদীর পানি বেড়েছে, যা আগামী তিন দিন বাড়বে। যদিও পানি বাড়লেও এসব নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়েই প্রবাহিত হতে পারে।
ছবির উৎস, RATAN
এদিকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে শুক্রবার রাতে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের একটি সেতু ধসে পড়ায় দুই জেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রসঙ্গত, গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশে অধিকাংশ জায়গায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কয়েকটি জেলার নিচু এলাকায় আকস্মিক বন্যা হয়েছে।
অতিবৃষ্টির জের ধরে পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য তিন জেলায় অন্তত ৩০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই মারা গেছে অন্তত ৮ জন।
পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতেই অন্তত ৩৭টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটজন এবং চট্টগ্রামে তিনজনের মৃত্যুর পর, বৃহস্পতিবারও বান্দরবানের লামা উপজেলায় পৃথক দুটি পাহাড় ধসের ঘটনায় শিশুসহ পাঁচজন এবং কক্সবাজারের চকোরিয়ায় দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলায় ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতিতে উদ্ধার কাজে সাহায্যের জন্য সরকার ইতোমধ্যেই সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে।
