IIT-এ পড়ার স্বপ্ন দেখেন দেশের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া। কঠিন প্রবেশিকা, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ, পড়াশোনার চাপ পেরিয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে জায়গা পাওয়া অনেকের কাছেই বড় সাফল্য। IIT-এর প্রাক্তনীরা দেশ-বিদেশে প্রযুক্তি, ব্যবসা, প্রশাসন-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের নজিরও তৈরি করেছেন। কিন্তু সেই সাফল্যের ছবির আড়ালেই গত দুই দশকের ছাত্রমৃত্যুর পরিসংখ্যান নতুন করে প্রশ্ন তুলছে ক্যাম্পাসের পরিবেশ, পড়ুয়ার চাপ এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে।
IIT বম্বের দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া সাহিল ওয়াকোড়ের ১৮ সেপ্টেম্বরের মৃত্যু ঘিরে ইতিমধ্যেই উত্তাল পওয়াই ক্যাম্পাস। প্রাথমিক ভাবে পুলিশ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখছে। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ ছাত্র, কর্মী-সহ অন্তত ২০ জনের বয়ান রেকর্ড করেছে এবং সাহিলের ফোনের কল লগ ও মেসেজ খতিয়ে দেখার চেষ্টা চলছে।
– বিজ্ঞাপন –
২০ বছরে ১৭১টি মৃত্যু
সাহিলের মৃত্যুর পরই সামনে এসেছে IIT পড়ুয়াদের মৃত্যুর একটি বিস্তৃত পরিসংখ্যান। IIT কানপুরের প্রাক্তনী ধীরজ সিংহের সংকলন অনুযায়ী, ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন IIT ক্যাম্পাসে মোট ১৭১টি আত্মহত্যা ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
এই তথ্য সরাসরি কোনও একক সরকারি ডেটাসেট নয়। RTI-র মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন মিলিয়ে এই সংকলন তৈরি করা হয়েছে। ফলে ঘটনাগুলির শ্রেণিবিন্যাস ও সম্পূর্ণতার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, ২০০৬ থেকে ২০১৫—এই ১০ বছরে ৫১টি ঘটনা, আর ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১০ বছরে সেই সংখ্যা বেড়ে ১২০ হয়েছে। অর্থাৎ, সংকলনে নথিভুক্ত মোট ঘটনার বড় অংশই সাম্প্রতিক পর্বে।
শেষ কয়েক বছরে সংখ্যাটা আরও বেড়েছে
বছরভিত্তিক হিসাবেও উদ্বেগের ছবি উঠে এসেছে। সংকলন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ১৩টি, ২০১৮ সালে ১১টি এবং ২০১৯ সালে ১২টি ছাত্রমৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪—তিন বছরেই ১৪টি করে ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৬-তে। আর ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্তই ১৩টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
তবে এই পরিসংখ্যান কোনও একটি কারণকে এসব মৃত্যুর জন্য দায়ী করে না। ব্যক্তিভেদে পড়াশোনার চাপ, ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, সামাজিক বা আর্থিক সমস্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মতো একাধিক কারণ থাকতে পারে। সংকলনটি মূলত মৃত্যুর সংখ্যা ও সময়ের প্রবণতাটিই সামনে আনে।
কোন IIT-তে কত মৃত্যু?
২০ বছরের সংকলনে সবচেয়ে বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে IIT খড়্গপুরে—২৯টি। এরপর IIT মাদ্রাজে ২৬টি এবং IIT কানপুরে ২১টি। IIT দিল্লিতে ১৭টি, IIT বম্বে ও IIT গুয়াহাটিতে ১৪টি করে, IIT হায়দরাবাদে ৯টি, IIT রুরকিতে ৮টি এবং IIT পটনায় ৭টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
তবে এগুলি কোনও প্রতিষ্ঠানের ছাত্রসংখ্যার অনুপাতে ঝুঁকির হার নয়। এগুলি কেবল ওই সংকলনে নথিভুক্ত মোট ঘটনার সংখ্যা।
সাহিলের মৃত্যু ঘিরে জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ
সাহিলের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের তরফে IIT বম্বের এক অধ্যাপকের বিরুদ্ধে জাতিগত বৈষম্য ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, পরীক্ষার হল-সহ বিভিন্ন সময়ে সাহিলকে জাতিগত মন্তব্য ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল। এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশের তদন্ত চলছে।
তবে এই অভিযোগের সঙ্গে সাহিলের মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক এখনও তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। বরং তাঁর কয়েক জন সহপাঠী জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগের সঙ্গে একমত নন বলেও সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও একটি কারণকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
আগেও উঠেছে বৈষম্যের প্রশ্ন
শুধু IIT বম্বে নয়, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে সামাজিক ও জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ নিয়ে আগেও আলোচনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ২০২১ সালে লোকসভায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে IIT, IIM, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় অর্থপুষ্ট উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১২২টি ছাত্র আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২৪ জন SC, ৩ জন ST এবং ৪১ জন OBC শ্রেণির ছিলেন।
তবে এই ১২২টি ঘটনা গোটা IIT ব্যবস্থার পরিসংখ্যান নয়; এটি বিভিন্ন কেন্দ্রীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত সরকারি তথ্য। ফলে ১৭১-এর IIT-সংক্রান্ত সংকলনের সঙ্গে এই সংখ্যাকে সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না।
সাহিল ওয়াকোড়ের মৃত্যু তাই একটি নির্দিষ্ট পরিবারের শোকের গণ্ডি ছাড়িয়ে IIT ক্যাম্পাসে পড়ুয়াদের মানসিক চাপ, নিরাপত্তা, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্নগুলিকেও ফের সামনে এনেছে। আর গত দুই দশকের নথিভুক্ত মৃত্যুর পরিসংখ্যান সেই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
