জটায়ু বেঁচে থাকলে হয়তো বলতেন- অবিশ্বাস্য! অকল্পনীয়।
কারণ, চেনা আরামদায়ক আবহাওয়া উধাও! বরং তীব্র গরমে পুড়ছে প্রায় গোটা ইউরোপ। ফ্রান্সে তাপমাত্রা ছুঁয়েছে ৪৬ ডিগ্রি। আতঙ্কে দেশের পারমাণবিক কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। বন্ধ স্কুল-কলেজ। বিদ্যুতের চাহিদা আকাশছোঁয়া। দফায় দফায় লোডশেডিং লন্ডনে। হাঁসফাঁস করছে পোল্যান্ড, স্পেন, জার্মানি। পর্যটনের মরশুমে খাঁ খাঁ করছে ট্যুরিস্ট স্পট। আর শুধুই কি তাপপ্রবাহ? পাল্লা দিয়ে ঝড়, দাবানল, হড়পা বান। লেক দেখলেই স্নান করতে নেমে পড়বেন না, সতর্ক করছে সরকার। কিন্তু এই গরমে কে শোনে কার কথা? ইউরোপ জুড়ে এক মাসে মৃতের সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়েছে।

ইউরোপ জুড়ে এমন তাপপ্রবাহ শেষ ১০০ বছরেও দেখা যায়নি। আফ্রিকান অ্যান্টি-সাইক্লোন নিম্নচাপের প্রভাবে পুড়ছে প্রায় গোটা ইউরোপ। কোনও কোনও জায়গায় তো তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে। গরমের হাত থেকে বাঁচতে শুধু ফ্রান্সেই স্নান করতে নেমে তলিয়ে মৃত ৪০। যার মধ্যে ১৩ বছরের এক কিশোরীও রয়েছে। প্রশাসনের পরামর্শ, লেক বা নদীতে নজরদারি ছাড়া স্নান করতে নামবেন না। একই অবস্থা জার্মানিতেও। এক উইকেন্ডেই ৫ জন জলে ডুবে মারা গেছেন। প্রশাসন অনুরোধ করছে, লেক বা নদী দেখলেই স্নান করতে নেমে যাবেন না। কিন্তু এই গরমে কে শোনে কার কথা। স্থানীয় লেকের ধারে ট্র্যাফিক জ্যাম হচ্ছে। আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা ইউরোপের প্রায় সব দেশের সরকারকেই হাঁটু মুড়ে বসতে বাধ্য করেছে। সতর্ক করেছে রাষ্ট্রসংঘও। আসলে ভৌগোলিক কাঠামো ও নিম্নচাপের জন্য ইউরোপের উপরে গরম হাওয়া কৌটোর মতো বন্দি। মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপ এখন যেন হিট ডোম। প্রায় প্রতিদিন নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে তাপমাত্রা। স্পেন, জার্মানি, ফ্রান্সের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়।
আবার ব্রিটেনে বৃষ্টি হলেই ঘন ঘন বাজ পড়ছে। এ আরেক বিপদ। ২ ঘন্টা বৃষ্টি হলে বাজ পড়ছে অন্তত ৩০০০ বার। সঙ্গে রয়েছে আচমকা ঝোড়ো হাওয়া। স্থানীয় নদীতে হড়পা বান। ব্রিটিশ নাগরিকের জীবনের অঙ্গ এখন বন্যা, তীব্র গরম, ঘনঘন লোডশেডিং ও ঝড়। একথা শিরোনামে ছেপেছে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড। ফ্রান্সের কার্পেন্ট্রাসে গাড়ি চালাতে চালাতে এক মহিলা অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অতিরিক্ত গরমে গাড়ির ভিতরেই তাঁর মৃত্যু হয়। দুই সন্তানকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা গেছে। সেদিন তাপমাত্রা ৪০ ড্রিগ্রি ছুঁইছুঁই। তড়িঘড়ি প্যারিসের সব হাসপাতালের নার্সদের স্থানীয় বয়স্কদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সতর্ক করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান। সে দেশের ইতিহাসে ১৯৪৭-এর পর এত গরম পড়েছে এবছরই। টুলুজের কাছে নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ, ওই পারমাণবিক কেন্দ্রকে যে নদীর জল দিয়ে ঠাণ্ডা রাখা হত সেই নদীর জলও এখন গরম হয়ে উঠেছে। স্পেন,জার্মানি, ফ্রান্স সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি। রাতেও ঠাণ্ডা আবহাওয়ার লেশমাত্র নেই। পরিস্থিতি এমনই যে বেলজিয়ামে রেল ও পাওয়ার লাইন বন্ধ ব্যস্ততম সময়ে। একই দশা ফ্রান্সেরও। রেল ট্র্যাক অক্ষত রাখতে বন্ধ ফ্রান্সের জাতীয় রেল পরিষেবাও। কারণ নইলে গরমে লাইন বেঁকে গিয়ে বড় বিপদ ঘটতে পারে। স্পেনে স্কুলে ছুটি, বন্ধ আউটডোর স্পোর্টস। প্রচণ্ড গরমে পর্তুগালে দাবানলের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। দিনে-দুপুরে ঘন জঙ্গলে শুকনো পাতা জ্বলে উঠে মাইলের পর মাইল আগুন ধরে যাচ্ছে।

তাপপ্রবাহের জেরে লন্ডনেও রাস্তাঘাট ফাঁকা। রাষ্ট্রসংঘের প্রধান অ্যান্টোনিও গুতেরাস লন্ডনের পরিস্থিতিকে গ্যাসে বসানো পাত্র-র সঙ্গে তুলনা টেনেছেন। বাস্তবেই, লন্ডনে এবছর অতিরিক্ত গরমে লোডশেডিং ও গাড়ির ব্রেকডাউন বেড়ে গেছে প্রায় ১০%। অত্যাধিক গরমে গাড়ির ব্যাটারি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে রাস্তাতেই। সরকারের পরামর্শ, প্রত্যেকে গাড়িতে এমারজেন্সি কিট রাখুন। সঙ্গে জল, সানস্ক্রিন ও ছাতা অবশ্যই রাখবেন। গরমে মোবাইলের ব্যাটারি পর্যন্ত গলে যাচ্ছে। সরকার গাড়িতে এক্সট্রা মোবাইল ব্যাটারিও রাখার পরমার্শ দিচ্ছে। ইউরোপ জুড়ে নাগরিকদের চাহিদার সঙ্গে যোগানের ভারসাম্য রাখতে বিদ্যুতের দাম প্রতি মেগা-ওয়াট ঘণ্টায় ৫৪৬ পাউন্ডে গিয়ে ঠেকেছে।

হিট-ওয়েভের ধাক্কা লেগেছে পোল্যান্ডেও। ১৯২১-সালের পর এবছর ৪১ ডিগ্রি তাপমাত্রা ওয়ার-শ-তে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এর আগে কখনও গরমকালে এরকম দমবন্ধ করা কষ্ট অনুভূত হয়নি। তাপপ্রবাহের জেরে ইতালিতেও কমপক্ষে ১৫ জায়গায় লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আর রোমে? সেখানকার জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট পিয়াজ্জা ভেনেজিয়া-র ফাউন্টেনে স্নান করতে নেমে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানদার-রাই। ইলেকট্রিক বাস একটানা এসি চালানোয় ব্যাটারি ফুরিয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে। চালক পালিয়েছেন বাড়িতে। এক রিপোর্টে দাবি, শুধু এক মাসে দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে তাপপ্রবাহের জেরে। এই পরিস্থিতি থেকে কবে মুক্তি, বলছে পারছেন না আবহাওয়া বিশারদরাও।
