২০২৬ সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডীয় সাহিতি্যক অ্যান কারসন। তঁার কাজ
আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন কবি একই সঙ্গে গবেষক হতে পারেন। একজন ক্লাসিক্সবিদ আধুনিক প্রেমের কবিতা লিখতে পারেন। একটি প্রাচীন গ্রিক মিথ, সমকালীন যৌনতা-একাকিত্ব-শরীর ও পরিচয়ের প্রশ্ন বহন করতে পারে।
কোনও কবির হাতে যদি একটি পুরনো গ্রিক শব্দ থাকে, তিনি তা দিয়ে কী করতে পারেন? অভিধানে তার অর্থ খুঁজে নিতে পারেন, ব্যাকরণে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারেন, কিংবা কবিতায় তাকে আবার জীবিত করে তুলতে পারেন। অ্যান কারসন তৃতীয় কাজটিই করেছেন। তবে তঁার কাছে প্রাচীন গ্রিস কোনও জাদুঘর নয়; সেটি আধুনিক মানুষের ঘর, বিছানা, প্রেম, বিচ্ছেদ, শরীর, একাকিত্ব ও স্মৃতির মধ্যে হঠাৎ ফিরে আসা একটি জীবন্ত অতীত। ২০২৬-এর ৮ অক্টোবর ‘সুইডিশ অ্যাকাডেমি’ কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ক্লাসিসিস্ট অ্যান কারসনকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দিয়েছে। পুরস্কারের সরকারি ব্যাখ্যায় তাঁর সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্ম এবং ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর সৃজনশীল সংলাপের কথা বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন:
কারসনকে বুঝতে গেলে তাই তঁার কবিতার পাশাপাশি তঁার ক্লাসিক্স-চর্চাকেও বুঝতে হয়। কারসনের শিক্ষাজীবনও এই দ্বৈত পরিচয়ের ভিত তৈরি করেছিল। টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার শেষে তিনি ক্লাসিক্সে পিএইচডি করেন। গবেষণার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল গ্রিক কবিতা, প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার ধারণা। পরে সেই গবেষণার ভিত থেকেই জন্ম নেয় ‘ইরস অ্যান্ড বিটারসুইট’ (Eros the Bittersweet)। প্রেম তঁার কাছে কখনও নিছক রোম্যান্টিক অনুভূতি নয়; আকর্ষণ ও দূরত্ব, পাওয়া ও না-পাওয়া, আনন্দ ও যন্ত্রণার একসঙ্গে কাজ করা একটি মানসিক অবস্থা। এই জায়গাতেই কারসনের সাহিত্যিক পদ্ধতির বিশেষত্ব। তিনি পুরাণের পুনরাবৃত্তি করেন না। পুরাণকে তিনি বর্তমানের ভিতর বসিয়ে দেন। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’ (Autobiography of Red)।
প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের খণ্ডিত মহাকাব্য ‘গেরিওনেসিস’ (Geryoneis)-এ গেরিয়ন ছিলেন এক ভয়ংকর দানব। হেরাক্লেসের হাতে তঁার মৃত্যু হয়। কারসন সেই গেরিয়নকে নিয়ে ১৯৯৮ সালে লিখলেন এমন এক বই, যাকে একসঙ্গে কবিতা, উপন্যাস ও পুরাণের পুনর্লিখন বলা যায়। তঁার গেরিওন পুরাণের দানব নয়, সে আধুনিক পৃথিবীর এক তরুণ, যে প্রেমে পড়ে, প্রত্যাখ্যাত হয়, নিজের শরীর ও পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকে এবং নিজের অস্তিত্বকে বুঝতে চায়। বইটির শুরুতেই কারসন লিখছেন– ‘Geryon was a monster everything about him was red.’
এই ‘লাল’ শব্দটিই ধীরে ধীরে বইটির অস্তিত্বের কেন্দ্রে চলে আসে। গেরিওনের শরীর লাল, কিন্তু তার জীবনও যেন লালের নানা অর্থে রঞ্জিত আকাঙ্ক্ষা, লজ্জা, ক্রোধ, যৌনতা, বিপদ, ভালবাসা এবং ক্ষত। কারসন এখানে পুরাণের দৈত্যকে মানুষের অন্তর্জগতের প্রতীকে পরিণত করেছেন। আরও গভীরে গেলে প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়ে ওঠে: একজন মানুষকে অন্য একজন মানুষ কতটা সত্যিই দেখতে পারে? কারসনের একটি পঙ্ক্তি এই প্রশ্নটিকে অসাধারণ সরলতায় ধরে: ‘I will never know how you see red and you will never know how I see it.’– তুমি যে ‘লাল’ দেখছ, আমি সেই ‘লাল’ দেখতে পারব না। আমার অভিজ্ঞতা, আমার স্মৃতি, আমার শরীর, আমার ভালবাসা– কোনওটিই তোমার অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুরোপুরি এক হবে না। প্রেমের মধ্যেও এই দূরত্ব আছে। বন্ধুত্বের মধ্যেও। এমনকী ভাষার মধ্যেও। এখানেই ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’ একটি পুরাণের আধুনিক সংস্করণকে অতিক্রম করে অস্তিত্বের প্রশ্নে পৌঁছে যায়। গেরিওনকে সমাজ ‘দানব’ বলে চিহ্নিত করেছিল। কারসন সেই ‘দানব’-এর নিজের কণ্ঠ তৈরি করেন। ফলে পুরাণের ক্ষমতার কাঠামোটিই বদলে যায়। যে চরিত্রকে এতদিন অন্য কেউ সংজ্ঞায়িত করেছে, এবার সে নিজেই নিজের জীবনের লেখক। এই কারণেই বইটির না ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’। ‘লালের আত্মজীবনী’ নিজেই একটি সাহিত্যিক ধাঁধা।
একটি রং কীভাবে আত্মজীবনী হয়ে উঠবে? কারসনের সাহিত্য সেই অসম্ভব প্রশ্নের মধ্যেই সম্ভব হয়ে ওঠে। অ্যালিস মুনরো বইটি সম্পর্কে বলেছিলেন, “I haven’t discovered any writing in years so marvellously disturbing.” এই ‘disturbing’ শব্দটির মধ্যে কারসনের সাহিত্যকে বোঝার একটি চাবিকাঠি আছে। তঁার লেখা পাঠককে সহজ উত্তর দেয় না। বরং পরিচিত ধারণাগুলোকে অস্বস্তিতে ফেলে। গেরিওন কি সত্যিই দানব? না কি সমাজের চোখে ভিন্ন মানুষকে ‘দানব’ বানানোর প্রক্রিয়াটিই আসল দানবীয়তা? এই প্রশ্নটি ১৯৯৮ সালের গ্রিক পুরাণ থেকে বেরিয়ে বর্তমান পৃথিবীতেও পৌঁছে যায়। কারসনের সাহিত্য তাই কোনও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে থাকে না।
তাঁর আর একটি বড় কৃতিত্ব– সাহিত্যের প্রচলিত ঘরানা নিয়ে তঁার অনীহা। ‘দ্য বিউটি
অফ দ্য হাজব্যান্ড’ (The Beauty of the Husband)-এর উপ-শিরোনামই ‘a fictional essay in 29 tangos’। বিবাহ, বিশ্বাসঘাতকতা ও বিচ্ছেদের কাহিনি সেখানে কবিতা, গদ্য, স্মৃতি ও নৃত্যের ছন্দে তৈরি হয়েছে। বইটি টি. এস. এলিয়ট পুরস্কার পায় এবং কারসন হন এই পুরস্কারের প্রথম নারী বিজয়ী।
‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’ (Men in the Off Hours), ‘ডিক্রিয়েশন’ (Decreation), ‘নক্স’ (Nox), ‘রেড ডক’ (Red Doc) কিংবা ‘ফ্লোট’ (Float)—পরবর্তী কাজগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। কারসনের কাছে কবিতা আলাদা ঘর নয়, প্রবন্ধ আলাদা ঘর নয়, অনুবাদ আলাদা ঘর নয়। গবেষণা, পুরাণ, ব্যক্তিগত স্মৃতি, দর্শন, ছবি, নাটক ও কবিতা তঁার লেখায় একে-অপরের মধ্যে প্রবেশ করে।
আমরা সাহিত্যে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক ও অনুবাদের মধ্যে বেশ স্পষ্ট দেওয়াল তৈরি করে রেখেছি। কারসন দেখান, মানুষের অভিজ্ঞতা যখন এতটা বিভাজিত নয়, তখন সাহিত্য কেন এত কঠোরভাবে বিভক্ত থাকবে? তঁার কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন কবি একই সঙ্গে গবেষক হতে পারেন। একজন ক্লাসিক্সবিদ আধুনিক প্রেমের কবিতা লিখতে পারেন। একটি প্রাচীন গ্রিক মিথ, সমকালীন যৌনতা-একাকিত্ব-শরীর ও পরিচয়ের প্রশ্ন বহন করতে পারে। কারসনের সাহিত্যিক শক্তি এখানেই। তিনি অতীতকে বর্তমানের পোশাক পরাননি; তিনি দেখিয়েছেন, অতীতের ভিতরেই বর্তমানের কিছু প্রশ্ন বহুদিন ধরে ঘুমিয়ে আছে। ‘Autobiography of Red’-এর গেরিওন সেই ঘুমন্ত প্রশ্নের একটি জীবন্ত রূপ।
বইটির শেষে যে আগুনের চিত্রকল্প ফিরে আসে, ‘We are amazing beings… We are neighbors of fire.’– তা যেন কারসনের সমগ্র সাহিত্যবোধের দিকে ইঙ্গিত করে। মানুষ আগুনের কাছাকাছি থাকে। ভালবাসা তাকে উষ্ণ করে, আবার পুড়িয়েও দিতে পারে। আকাঙ্ক্ষা তাকে জীবন্ত করে, আবার আহতও। মানুষ নিজের পরিচয় তৈরি করতে চায়, অথচ অন্যের দৃষ্টির বাইরে পুরোপুরি বেরতে পারে না। এই দ্বন্দ্বই কারসনের সাহিত্যের প্রাণ।
তাই ২০২৬-এর নোবেলকে শুধু একজন কবির পুরস্কার হিসাবে পড়লে কারসনের গুরুত্ব পুরোপুরি ধরা পড়ে না। এটি এমন একজন লেখকের স্বীকৃতি, যিনি কবিতা ও গবেষণা, পুরাণ ও আধুনিকতা, ব্যক্তিগত স্মৃতি ও প্রাচীন সাহিত্য– এসবের মধ্যে প্রচলিত দেওয়াল সরিয়ে দিয়েছেন।
সুইডিশ অ্যাকাডেমি যে ‘সাহসী’ ও ‘উদ্ভাবনী’ সাহিত্যকর্মের কথা বলেছে, তার বাস্তব উদাহরণ ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’। কারণ কারসন সেখানে একটি মৃতপ্রায় গ্রিক মিথকে শুধু অনুবাদই করেননি; নতুন জীবন, নতুন শরীর দিয়েছেন, নতুন যৌনতা দিয়েছেন, নতুন কণ্ঠ দিয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ‘দানব’-এর আত্মজীবনী লিখেছেন। সাহিত্যের ইতিহাসে অনেক নায়ক কথা বলেছে। কারসন এবার এমন একজনের মুখ খুলেছেন, যাকে ইতিহাস একসময় কথা বলার যোগ্য বলেই মনে করেনি। এই জায়গাতেই অ্যান কারসন আমাদের সময়ের লেখক হয়ে ওঠেন।
প্রাচীন গ্রিস থেকে আধুনিক পৃথিবী পর্যন্ত তাঁর যাত্রার শেষ প্রশ্নটি তাই খুব সরল: আমরা অন্য মানুষকে সত্যিই কতটা দেখতে পাই? সম্ভবত সাহিত্যের কাজ সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নয়। বরং এমন একটি জায়গা তৈরি করা, যেখানে আমরা প্রথমবার বুঝতে পারি– অন্যের দেখা ‘লাল’ কখনও পুরোপুরি আমাদের দেখা ‘লাল’ হবে না। আর সেই অসম্ভব দূরত্বের মধ্যেই হয়তো কবিতার জন্ম।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
