কেপ ভার্দের ছোট্ট দ্বীপ বোয়া ভিস্তা। সেখানকার পাণ্ডববর্জিত গ্রাম পোভোয়াকাও ভেলহা। একটা সময় বিশ্বকাপ দেখার জন্য ভাড়া করে আনা হয়েছিল একটি মাত্র টেলিভিশন। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ। টিভির পর্দায় দিয়েগো মারাদোনাকে দেখে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এক কিশোর – পেদ্রো লেইতাও ব্রিটো। যিনি সবার কাছে ‘বুবিস্তা’ নামে পরিচিত। আর আজ সেই বুবিস্তার কোচিংয়েই মাত্র পাঁচ লাখ জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দে ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। যে মানুষটি একসময় টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনিই আজ সেদেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় রূপকথার নির্মাতা।
এই যাত্রা গোলাপের পাপড়ি বেছানো নয়, বরং কণ্টকাকীর্ণ ছিল। একদিনে সাফল্য আসেনি। ‘প্রথম সবকিছুতে’ দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। মা মোজা দিয়ে বানিয়ে দিয়েছিলেন ফুটবল। সেই বল দিয়েই শুরু হয়েছিল পথচলা। তারপর একটা একটা করে ধাপ পেরিয়ে দেশের হয়ে খেলার সুযোগ পেলেন। ১১ বছর দেশের অধিনায়ক ছিলেন। তবে খেলোয়াড় হিসাবে যে স্বপ্ন পূরণ হয়নি, আজ কোচ হিসাবে সেই স্বপ্নই দেখাচ্ছেন গোটা দেশকে।
আরও পড়ুন:
মিন্ডেলেন্সে ও অ্যাকাডেমিকা দো মিন্ডেলোর মতো দেশের প্রথম শ্রেণির ক্লাবগুলোর কোচ হওয়ার পর, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে কেপ ভার্দে জাতীয় দলের কোচ হিসাবে দায়িত্ব নেন। ভোল বদলে যায় দলের। টানা দু’বার আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ‘ব্লু শার্কস’। ২০২৩ সাল। প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে তোলেন দেশকে। সেদিন টাইব্রেকারে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে না গেলে অন্যরকম ভাবে লেখা হতে পারত ইতিহাস।
সেই তিনি বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নিয়েই কেপ ভার্দেকে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন নকআউট পর্বে। ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউটে যাওয়ার নজিরও এখন তাদের সামনে। স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের মতো কঠিন গ্রুপে তিনটি ড্র করেই ইতিহাস গড়েছে দলটি। প্রত্যাশার চাপ ছিল না, ছিল শুধু নিজেদের উপর বিশ্বাস। এই মন্ত্রেই সাফল্য। বুবিস্তার সবচেয়ে বড় শক্তি, তিনি ফুটবলারদের উপর আস্থা রাখতে জানেন।

চোটের কারণে প্রায় এক বছর মাঠের বাইরে থাকা দলের সেন্টার ব্যাক লোগান কোস্তাকে তিনি দলে রেখেছেন। যেমন মিডফিল্ডার জেমিরো মন্টেইরো। বাবা-মা কেপ ভার্দের হলেও তাঁর জন্ম জার্মানিতে। নেদারল্যান্ডসের স্পানগেনের রাস্তায় ফুটবলের পাঠ নেওয়া এই মিডফিল্ডার খেলেছেন ফিলাডেলফিয়াতেও। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তাঁর করা বিশ্বকাপের মূল পর্বের টিকিট পেয়েছে দেশ। উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ফ্রিকিক থেকে গোল করা কেভিন পিনার কথাই ধরা যাক। তাঁকে ম্যাসাচুসেটসের রাস্তায় খেলতে দেখে আবিষ্কার করেছিলেন সেদেশের প্রাক্তন অধিনায়ক কার্লোস মোরাইস। রাশিয়ার ক্লাবে খেলা এই ফুটবলারের উপর গোলের জন্য ভরসা করছে কেপ ভার্দে। অথবা বদলি নেমে ছাপ রেখে যাওয়া হেলেয়ো ভারেলা থেকে স্পেন ম্যাচে ‘সাত সেভের মহানায়ক’ গোলরক্ষক ভোজিনহা – প্রত্যেকের গল্পই আমাদের শেখায়। তাঁদের এক সুতোয় গেঁথেছেন বুবিস্তা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা কেপ ভার্দের বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের খুঁজে বের করে স্বপ্ন সফল করেছেন। দেশের স্থানীয় প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের সঙ্গে পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের রটারডামে বেড়ে ওঠা ফুটবলারদের একত্র করে শক্তিশালী দল গড়ে তোলেন।
শুনলে অবাক হবেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফুটবলারদের খুঁজে আনতে তিনি ব্যবহার করেছিলেন লিঙ্কডিন। কেউ একে ক্ষ্যাপামো ভেবেছিলেন। পাত্তা দেননি। সেই ‘ক্ষ্যাপামো’ই তাঁদের বিশ্বকাপে পৌঁছে দিয়েছে। এবার সামনে আর্জেন্টিনা। যে দেশের কিংবদন্তি মারাদোনাকে দেখে ফুটবলের প্রেমে পড়েছিলেন বুবিস্তা, এবার সেই দেশেরই অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে থামানোর চ্যালেঞ্জ তাঁর সামনে। তবে ভয় নয়, বিশ্বাসই তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। নকআউট পর্বে নামার আগে তিনি বলছেন, “আমাদের কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই। দল যা করেছে, তার জন্য গর্বিত। ম্যাচের ফলাফল যাই হোক না কেন, মেসি এবং আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে খেলতে পারাটা গর্বের বিষয়।” সম্প্রতি তিনি বলেছিলেন, “স্বপ্ন দেখার দেখার অধিকার সকলের আছে। আমরাও স্বপ্ন দেখি। আর ফুটবলে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়।” বলেছিলেন বুবিস্তা। তিনিই যেন কেপ ভার্দের স্বপ্নের সওদাগর।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
