ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল বা আইএমএফ- এর সাথে চলমান ঋণ কর্মসূচিতে স্থবিরতার মধ্যেই সংস্থাটি থেকে নতুন করে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার ঋণ চাইছে বাংলাদেশ- এমন খবর বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও এক বিলিয়ন ডলার ঋণ চাওয়া হয়েছে বলে এসব খবরে বলা হচ্ছে।
মূলত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর সাথে বৈঠকের সময়ে এমন প্রস্তাব দিয়ে কিছুটা ইতিবাচক সাড়াও পেয়েছেন বলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আভাস দিচ্ছেন।
যদিও কর্মকর্তারা বলছেন, পর্দার অন্তরালে চলা আলোচনা নিয়ে দুই পক্ষ চূড়ান্ত সমঝোতায় উপনীত হলেই কেবল এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা ঘোষণা আসবে।
কিন্তু এই আলোচনার খবর এমন সময় সামনে এলো যখন ২০২৩ সালে সংস্থাটির সাথে শুরু হওয়া ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তির টাকাই আটকে গেছে।
এমনকি বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী ওয়াশিংটনে গিয়ে বৈঠকের পরেও ঋণ পাওয়া নিয়ে জটিলতা কাটেনি। সে কারণে জুনের মধ্যে আইএমএফ’র কাছ থেকে এক দশমিক তিন বিলিয়ন বা ১৩০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার কথা থাকলেও সেটি পাচ্ছে না বাংলাদেশ।
এখন কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, এসব নিয়ে আলোচনার জন্য জুনে বাংলাদেশের সংসদে জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর আইএমএফের প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, “বাজেটে ঋণ কর্মসূচিতে থাকা সংস্কার প্রস্তাবগুলোর কতটা প্রতিফলন থাকে হয়তো সেটা দেখেই আইএমএফ ঢাকায় আসতে পারে”।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, “জুনে আইএমএফ প্রতিনিধিরা ঢাকায় আসার পর চলমান ঋণ কর্মসূচির আটকে থাকা কিস্তিগুলো ছাড়ের সিদ্ধান্ত হলে বাংলাদেশ তখন নতুন ঋণের প্রস্তাব দিতে পারে”।
ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images
নতুন ঋণ চাপ বাড়াবে না কমাবে
ঢাকায় অর্থ মন্ত্রণালয় ও ইআরডির কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, মূলত ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি ব্যয় ব্যাপক বেড়ে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া সামলানোর জন্য অর্থাৎ জনজীবনে তৈরি হওয়া চাপ সহজ করার জন্য নতুন ঋণ চাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
আবার কেউ কেউ বলছেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতা ও বাংলাদেশের নতুন পরিস্থিতিকে সামনে রেখে আইএমএফ নিজেও এ ধরনের প্রস্তাব দিয়ে থাকতে পারে।
যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন করে ঋণ নিতে গেলেও আইএমএফ চলমান ঋণ কর্মসূচির জন্য আগে যেসব শর্ত দিয়েছিল সেগুলোতেই নতুন করে জোর দেওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
অর্থাৎ সরকারের ভর্তুকি কমানো, রাজস্ব খাতে সংস্কার, ব্যাংক খাতে সংস্কার, করছাড় বাতিল করা কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোই গুরুত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
“আইএমএফের মূল শর্তই তো এগুলো। এখন নতুন করে ঋণ দিতে হলেও তারা নিশ্চয়ই আগে জানতে চাইবে এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিকল্পনা এখন কী হবে। আর ভর্তুকি কমালে, ট্যাক্স বাড়লে মানুষের ওপরেই তো এর চাপ পড়বে। আবার ঋণ না নিলে রিজার্ভের অর্থ ব্যয় করতে হবে সেটিও জনজীবনে চাপ তৈরি করবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন জাহিদ হোসেন।
যদিও আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াও নিয়ে কাজ করছে একটি কমিটি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি ঋণ কর্মসূচি চলমান থাকা অবস্থায় নতুন করে ঋণ প্রস্তাবের আলোচনা উঠছে কেন?
ছবির উৎস, Getty Images
জানা গেছে, সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বৈঠকের সময় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন ঋণের বিষয়টি তাদের মৌখিকভাবে অবহিত করেছেন।
ঢাকার কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে অবশ্য এমন ধারণাও পাওয়া যাচ্ছে যে, সরকার আইএমএফের সাথে চলমান ঋণ কর্মসূচির ৬ ও ৭ম কিস্তি পাওয়ার চেয়ে নতুন করে ঋণ পেতেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
যদিও এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তখনকার অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন যে, “ঋণ কর্মসূচির আওতায় বড় শর্তগুলো পূরণ হয়ে গেছে। কিছু অধ্যাদেশ হয়েছে। নির্বাচিত সরকার এসব অধ্যাদেশ সংশোধন করে হলেও আইনে পরিণত করলে আইএমএফ আপত্তি করবে না বলেই আশা করি”।
কিন্তু বাস্তবতা হলো বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে ব্যাংক খাত নিয়ে করা ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ এমনভাবে সংশোধন করে সংসদে পাশ করেছে যে তা ব্যাংক সংস্কারকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলেই মনে করেন। ওই সংশোধনীর ফলে দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারীদের আবারও ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
জাহিদ হোসেন বলছেন, “ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ একটা কমফোর্ট দিয়েছিল। কিন্তু পাশ হওয়া আইনে সেই স্পিরিট থাকলো না। আবার আইএমএফ এর শর্ত অনুযায়ী প্রতি মাসের শুরুতে তেলের দাম নির্ধারণ শুরু হয়েছিল কিন্তু গত দু মাসে তা হয়নি। এনবিআর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেপারেশন হলো কিন্তু অধ্যাদেশটি পাশ হলো না। আমার মনে হয় আইএমএফ এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুলবে”।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতো কিছুর পরেও সরকার যদি শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফ-এর কাছে নতুন করে ঋণ চায় এবং সংস্থাটি যদি সেটি অনুমোদন করে তাহলে সেটি কী মানুষের ওপর আরও চাপ তৈরি করবে কি -না।
অর্থনীতিবিদ ডঃ মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, প্রথমত বাংলাদেশকে আইএমএফ এর সাথে চলমান থাকা ঋণ কর্মসূচির ৬ষ্ঠ ও ৭ম কিস্তির ১৩০ কোটি ডলার পেতে হবে এবং তারপর নতুন ঋণ চাইতে পারে।
“কিন্তু আগের শর্ত তো বাংলাদেশ পালন করতে পারেনি। শর্ত অনুযায়ী শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি বাড়েনি। এ বছর টার্গেট থেকে আরও অনেক পিছনে। পাশাপাশি ভর্তুকি প্রত্যাহার কিংবা কর ছাড় বাতিল করা আইএমএফ যেভাবে চাইবে সেটা করা সরকারের জন্য কঠিন হতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
অবশ্য নতুন করে ঋণ প্রস্তাব চাওয়ার চিন্তা ভাবনার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি আলোচনায় আসছে তা হলো- ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির জন্য সরকার অতিরিক্ত প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে কিন্তু অর্থনীতিতে চাপ পড়বে বলে সরকার এটি রিজার্ভ থেকে খরচ করতে চাইছে না।
“আমার ধারণা এ কারণেই সরকার বিশ্বব্যাংক, আইডিবি আর আইএমএফ এর মতো সংস্থাগুলোর কাছে আরও ঋণ নেওয়ার চিন্তা করছে। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে হাত দিলে আমদানি সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা কমে যাবে এবং মুদ্রার বিনিময় হারে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। তখন মানুষের ওপর ট্যাক্স বাড়াতে হবে,” বলছিলেন মি. রহমান।
ছবির উৎস, Getty Images
জাহিদ হোসেন অবশ্য বলছেন, এটি সত্যি যে যুদ্ধের কারণে নগদ অর্থের প্রয়োজন বেড়েছে কিন্তু নতুন করে ঋণ চাইলেও সরকারকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে যে –”যেই সংকট মোকাবেলার জন্য নতুন ঋণ চাইছেন সেই সংকট মোকাবেলায় বা ব্যবস্থাপনায় সরকারের কর্মপরিকল্পনা কী। অর্থাৎ টাকাটা কোথায় ব্যয় হবে”।
“নাহলে চলমান ঋণ কর্মসূচি আছে। এখন সেটা বাদ দিয়ে নতুন আরেকটা কর্মসূচির মাধ্যমে ঋণ নেওয়া জাস্টিফাইড হবে কিভাবে,” বলছিলেন মি. হোসেন।
প্রসঙ্গত, আইএমএফ’র সাথে ২০২৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চার দশমিক সাত বিলিয়ন বা ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সই করেছিল বাংলাদেশ।
পরে ২০২৪ সালের অগাস্টে আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ওই সময় ঋণের পরিমাণ আরও ৮০০ মিলিয়ন ডলার বাড়ানো হয়।
এই অর্থের মধ্যে এখন পর্যন্ত আইএমএফ বাংলাদেশকে ঋণ ছাড় করেছে তিন দশমিক ৬৪ বিলিয়ন বা ৩৬৪ কোটি ডলার।
গত ডিসেম্বরে ঋণের ৬ষ্ঠ কিস্তি অর্থ পাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু তখন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঋণের অর্থ ছাড় করেনি আইএমএফ। এখন ৬ষ্ঠ ও ৭ম কিস্তির টাকা একসাথে পাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
চলতি বছরের মার্চে ঢাকায় এসেছিলেন আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথেও বৈঠক করেছিলেন। ওই বৈঠকের পরেই সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী ওয়াশিংটনে এপ্রিলের বৈঠকে আইএমএফের কাছে বাড়তি সহায়তা চাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
সেই বৈঠক থেকে দেশে ফিরে গত ১৯শে এপ্রিল অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আবার আলোচনা হবে। “আইএমএফের কোনো শর্ত যদি জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণে বাধা হয়, সে সিদ্ধান্ত বিএনপি সরকার নেবে না,” বলেছিলেন তিনি।
যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণ চুক্তিতে যেসব শর্ত ছিল সেগুলো থেকে আইএমএফ সরে আসবে-এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তাদের মতে, বরং বাংলাদেশ সরকারকেই নতুন করে বলতে হবে যে সংস্কারের শর্তগুলো তারা কিভাবে বাস্তবায়ন করবেন।
