সীমাহীন দুর্ভোগ আর অব্যবস্থাপনায় নির্মিত হচ্ছে ঢাকা বিআরটি। বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত বেশিরভাগ অবকাঠামোর নির্মাণ শেষ হলেও দুর্ভোগ শেষ হচ্ছে না। মেয়াদ ও ব্যয় না বাড়িয়ে দুর্নীতির অনুসন্ধানসহ দুটি কমিটি করেছে সরকার। ফলে বিআরটির বাকি কাজ শেষ করা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কবে প্রকল্প শেষ হবে বা প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কী, বলতে পারছে না কেউ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি হলে তা অবশ্যই খতিয়ে দেখতে হবে। কাজ চালু রেখে কীভাবে সেটা অনুসন্ধান করা যায় সরকারকে সেই পথ বের করা উচিত। কিন্তু কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখায় জনগণের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
নির্মাণাধীন এলাকায় বিশেষ করে গাজীপুর চৌরাস্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মানুষের দুর্ভোগ সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাছাড়া সড়কে নির্মাণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় অবকাঠামো ভেঙে যাচ্ছে। বিআরটি লেনে ও বাইরের সড়কে উল্টাপাল্টা যান চলাচলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিমানবন্দর-গাজীপুর অংশে শেখ হাসিনা সরকারের নেওয়া মেগা উন্নয়ন প্রকল্পটি দুর্ভোগের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। বিগত সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের অনিয়ম-দুর্নীতি ও কমিশন-বাণিজ্যের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
এ সময়ে প্রতিদিন রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ এবং ঢাকা বিভাগের অন্তত ২৩ জেলার কয়েক লাখ মানুষ এ সড়কে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে বসে থাকা, যানবাহনের ক্ষতি, অসুস্থ রোগী নিয়ে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারার মতো ভোগান্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের মৃত্যুও। অন্তত ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট গার্ডার চাপায় একই পরিবারের পাঁচজন মারা যান। গত ২৭ জুলাই টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকায় এক নারী ড্রেনের ওপর সøাব না থাকায় ভেতরে পড়ে যান। ৩৬ ঘণ্টা পর তার লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। সøাব না থাকায় সড়কের উভয় পাশে দুর্ঘটনায় পড়ছে সাধারণ মানুষ।
গাজীপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্দিষ্ট লেনে বাসভিত্তিক দ্রুত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকল্পটি হাতে নেয় সরকার। ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়কে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নামের প্রকল্পটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ৪ বছর ১ মাস। অন্তত পাঁচ দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ২০২৪
সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল। দ্বিগুণ ব্যয় এবং তিনগুণ সময় নিয়েও কাজ শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। অর্থায়ন করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) ও গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ) এবং বাংলাদেশ সরকার।
গত বছর ১৬ ডিসেম্বর গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ১০টি বাসের চলাচলের উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেছিলেন, বিআরটি একটি রুগ্ণ প্রকল্প। তারপরও মানুষের যাতায়াতের সুবিধার কথা চিন্তা করে বিআরটিসি বাস চালু করা হয়েছে। শুরুতে ১০টি বাস থাকলেও দিন দিন কমে এখন দুই-তিনটি বাস চলাচল করছে।
প্রকল্পসূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৭৮ শতাংশ। বাকি কাজ শেষ করতে মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়িয়ে প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর কাজ শেষ হওয়ার কথা। একই সঙ্গে ব্যয় বেড়ে ৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সংশোধনী প্রস্তাবটি একনেকে অনুমোদন পায়নি। পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেছিলেন, ‘বিআরটি প্রকল্পটি লইয়া এখন আমরা কী করিব?’
জানা গেছে, এরই মধ্যে ২০ কিলোমিটার সড়কে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। চার বছরের প্রকল্পে ১৭ বছর লাগিয়ে মানুষকে কষ্ট দিয়ে আরও ২ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ করে সুফল মিলবে কি না, সংশয়ে পড়েছে সরকার। সে কারণেই দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি প্রকল্পের কারিগরি বিষয়ে। অন্যটি দুর্নীতি-অনিয়ম অনুসন্ধানের বিষয়ে। কমিটি দুটির রিপোর্টের ওপর নির্ভর করবে প্রকল্পটির মেয়াদ ষষ্ঠ দফায় বাড়বে কি না।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ১৩৭টি বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একটি প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজও পায়। কিন্তু দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগে সেই প্রক্রিয়া বাতিল হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন প্রক্রিয়া শুরু হলেও বাস পেতে এক থেকে দেড় বছর লেগে যেতে পারে। এরপর বাস পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়োগ দেওয়া হবে কোম্পানি। মোটকথা, বিআরটি লেন দিয়ে বাস চালু করতে দুই বছরের মতো সময় লাগতে পারে।
বুয়েটের নগরাঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দীন হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি দেশের প্রথম বিআরটি প্রকল্প। প্রকল্পটি ব্যর্থ হলেও দেশে বিআরটি হওয়া উচিত। অনুষঙ্গিক কাজ শেষে ১৩৭টি বাস কেনা না হলেও অন্তত ৫০টি বাস দিয়ে পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু করা যেতে পারে। এতে আমরা বিআরটি কতটা কার্যকর হয়, তা দেখতে পারব।’
অযত্নে নষ্ট হচ্ছে বিআরটি : বিআরটি প্রকল্পের সড়কের গাজীপুর অংশে সড়ক বিভাজকের মাঝখানে বড় হয়ে উঠছে ঘাসসহ নানা আগাছা। সড়ক নির্মাণ করা হলেও আগাছা পরিষ্কার করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করার কেউ নেই। অনেক স্থানে মালপত্র চুরি হয়ে গেছে, নষ্ট হচ্ছে। বিআরটি স্টেশনগুলো মাদকসেবী, ভবঘুরে, ভিক্ষুক আর ছিনতাইকারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
অপরাধীদের নিরাপদ আস্তানা : উত্তরা থেকে টঙ্গীর চেরাগ আলী পর্যন্ত উড়াল সড়কের ওপরের ও নিচের অংশ অপরাধীদের নিরাপদ আস্তানা। প্রতিনিয়ত ঘটছে ছিনতাই ও ডাকাতি। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এ উড়াল সড়ক অনিরাপদ। স্থানীয়রা জানায়, উড়াল সড়কের নিচে সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ চলাচল করলে ছিনতাইকারীর কবলে পড়তে হয়। ওপরে চলন্ত মোটরসাইকেল ও যাত্রীবাহী যানবাহন থেকে ছিনতাই হয় অহরহ। গাজীপুর চৌরাস্তার নিচের অংশের কাজ শেষ হয়নি। খানাখন্দে ভরা জায়গাটি ছিনতাইকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
অনিরাপদ শ্রমিক-পথচারী : ২০১৯ সালে করা বিআরটি প্রকল্পে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, টঙ্গী কলেজগেট থেকে ভোগরা বাইপাস পর্যন্ত অংশে দিনে গড়ে ২৪ হাজার ৭৫৪টি যানবাহন চলাচল করে। চলতি বছরের শুরুতে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক সমীক্ষায় জানা গেছে, আবদুল্লাহপুর হয়ে দৈনিক প্রায় ৪০ হাজার যানবাহন চলাচল করে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর গাজীপুর শাখা কার্যালয়ের তথ্যমতে, গাজীপুর মহানগরে নিবন্ধিত পোশাক কারখানা ৪৯২টি। ছোট-বড় আরও কয়েকশ কারখানা আছে। কারখানাগুলোর অধিকাংশই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক-সংলগ্ন। বিআরটি প্রকল্পের বিশেষ লেনের দুই পাশে বিভাজক না রাখায় শ্রমিকদের চলাচলের সুযোগ নেই। যানজট, ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সড়কে বিশৃঙ্খলা : ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ঢাকা বিমানবন্দর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে দুই লেন আর মাঝখানে দুটি বিআরটি লেন দিয়ে চলাচল করে যানবাহন। বিআরটিসি বাস উদ্বোধনের সময় বলা হয়েছিল বিআরটি লেনে শুধু বিআরটিসির বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করবে। কয়েক দিন পরেই এ লেন দুটি দিয়ে অটোরিকশা, ভারী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ সব ধরনের যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহন উল্টাপাল্টা চলাচল করতে থাকে। ফলে বিভিন্ন স্থানে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বিআরটি লেনের সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ।
সড়কে পানির কারণে যানজট : বিআরটি প্রকল্পের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। সড়কের দুই পাশে এলজিইডির নির্মিত গভীর দুটি ড্রেনও আবর্জনা আর বালুতে ভরে গেছে। ড্রেন দিয়ে স্থানীয় কলকারখানা এবং বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হয়। ড্রেনগুলো বিভিন্ন স্থানে বন্ধ থাকায় পানি নামতে পারে না; সামান্য বৃষ্টিতেই ড্রেনের পানি উপচে রাস্তা তলিয়ে যায়। ফলে মহাসড়কে যান চলাচলে বিঘœ ঘটে এবং যানজটের সৃষ্টি হয়।
সরকারের সাবেক সচিব এমএম নিয়াজ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকল্পটি সময়মতো বাস্তবায়িত হলে ভালো হতো। সময়মতো বাস্তবায়িত না হওয়ায় সুফল মিলছে না। ফলে প্রকল্পঋণ এখন গলার কাঁটা। এমন প্রকল্প হাতে নেওয়ার জন্য যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
গাজীপুরের ঐতিহ্য ও উন্নয়নের সভাপতি প্রকৌশলী সামসুল হক বলেন, ‘১২ বছরে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় গাজীপুর এবং উত্তরাঞ্চলের লোকজন চরম বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রকল্পটি বাতিল বা দীর্ঘায়িত হলে গাজীপুরবাসী ও উত্তরাঞ্চলের জনসাধারণের দুর্ভোগ আরও প্রলম্বিত হবে। সরকারের উচিত প্রকল্পটি কীভাবে চালু করা যায়, মানুষের দুর্ভোগ কীভাবে কমানো যায় সে বিষয়ে ব্যবস্থ নেওয়া।’
ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মু. নুরুল আমিন খানকে একাধিকবার কল দিয়েও বক্তব্য জানা যায়নি। কোম্পানিটির উপমহাব্যবস্থাপক (রক্ষণাবেক্ষণ) মো. কামরুজ্জামান জানান, একনেকে চতুর্থ সংশোধিত প্রস্তাব গৃহীত না হওয়ায় প্রকল্পের কাজ আপাতত বন্ধ। তিনি বলেন, ‘প্রকল্প চালু করার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা তা বাস্তবায়ন করব।’
