আর কত খুন করলে থামবে রায়হান, এমন প্রশ্নে হত্যার শিকার ‘সন্ত্রাসী’ সরোয়ার হোসেন বাবলার বাবা আবদুল কাদেরের। তার ছেলে বাবলাকে হত্যার তিনদিন আগে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার কথা জানিয়ে আবদুল কাদের বলেন, আমার ছেলেকে সে (রায়হান) বলেছিল যা খাওয়ার খেয়ে নেয়,তোর সময় শেষ।

বৃহস্পতিবার (০৬ নভেম্বর) বিকেলে বায়েজিদ বোস্তামি থানার চালিতাতলীতে নিহত বাবলার বাড়িতে গেলে কেঁদে এসব কথা বলেন বাবলার বাবা আবদুল কাদের।

অভিযোগ করে আবদুল কাদের বলেন, আমার ছেলেকে প্রায়ই হুমকি দিত বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী, তার সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ও মো. রায়হান। এ জন্য আমার ছেলে সতর্ক হয়ে চলাফেরা করতেন। গত বুধবার বিকেলে বাড়ি থেকে দুই থেকে তিনশ গজ দূরে রাস্তার পাশে দোকানে গণসংযোগ চালান বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহ। যেহেতু নিজের এলাকা কেউ কিছু করবে না, সেজন্য আমার ছেলের আত্মবিশ্বাস ছিল। সরোয়ার নিজেও এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়েছে। পরে গণসংযোগে অংশ নেয় বাবলা।

তিনি বলেন, আমার ছেলেকে এর আগে একাধিকবার হত্যাচেষ্টা করেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের (বর্তমানে কারাবন্দি) অনুগত বাহিনীর ক্যাডার রায়হান, খোরশেদ। শহর গ্রাম কোথাও বাদ যাচ্ছে না। একের পর এক খুন করেই যাচ্ছে রায়হান। আর কত খুন করলে থামবে সে।

গত ৫ নভেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চালিতাতলীর খন্দকার পাড়ায় নির্বাচনী গণসংযোগে যান চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ। তার সঙ্গে ছিলেন পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘সন্ত্রাসী’ সরোয়ার হোসেন বাবলা। একটি দোকানে লিফলেট বিতরণের সময় পেছন থেকে বাবলাকে লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি করে অজ্ঞাত দুর্বৃত্ত। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহসহ আরও তিনজন।  

চালিতাতলীর খন্দকারপাড়ার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চট্টগ্রাম শহর ও জেলার রাউজানে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হান।

স্থানীয় যুবক মোহাম্মদ ইরফান বলেন, রায়হান মানুষ খুন করতে সিদ্ধহস্ত। অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার হদিস পাচ্ছে না। খুনের পর খুন করেই যাচ্ছের তিনি।  

এদিকে সরোয়ার হোসেন বাবলা হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ আপডেট জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ বলেন, ‘বাবলার ময়নাতদন্ত শেষ হয়েছে। তার পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা প্রক্রিয়াধীন। বাবলা খুনে জড়িতদের ধরতে পুলিশ কাজ করছে।’ শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান প্রসঙ্গে সিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘অনেকের কাছ থেকে রায়হানের নাম শুনেছি। বিষয়টি কমিশনার স্যারকে জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, গত ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া অ্যাকসেস রোড এলাকায় একটি প্রাইভেট কারে ব্রাশফায়ার করে সরোয়ার হোসেন বাবলাকে হত্যার চেষ্টা চালায় রায়হান ও তার সহযোগীরা। ঘটনাস্থলে দুজন মারা গেলেও ভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে যান সরোয়ার। পরে জোড়া খুনের মামলায় গ্রেপ্তার আসামিরা আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জানান, ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের নির্দেশে সরোয়ার হোসেন বাবলাকে গুলি করে ছোট সাজ্জাদ বিদেশে পলাতক শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত সাজ্জাদ আলীর অনুসারী। একসময় সরোয়ার হোসেনও তার অনুসারী ছিলেন। সরোয়ারের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ ১৫টি মামলা আছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মাসখানেক আগে বিয়ে করেন সরোয়ার। তার বিয়েতে বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহসহ বেশ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। গত বছরের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে বিএনপির বিভিন্ন সমাবেশে যোগ দিতে দেখা যায় সরোয়ারকে।

বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিহত হওয়া ‘সন্ত্রাসী’ নিজেদের দলের কেউ নয় বলে দাবি করলেও সরোয়ার যুবদল করতেন বলে জানিয়েছেন তার বাবা আবদুল কাদের।

গত ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে আরেক সন্ত্রাসী আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করা হয়। ২৫ মে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আকবর মারা যান। আকবরকে খুনের পর সরোয়ারকে মোবাইল ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিলেন ‘সন্ত্রাসী’ রায়হান। হুমকির সেই অডিও ফাঁস হয়। এতে রায়হান বলেন, ঢাকাইয়া আকবরের কী পরিণতি হয়েছে, দেখ সরোয়ার। যা খাওয়ার খেয়ে নিস। তোর সময় বেশি নেই।

জেলা পুলিশ বলছে, গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর রাউজানে গত ১৪ মাসের ব্যবধানে  ১৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তে শীর্ষ ‘সন্ত্রাসী’রায়হানের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। দুর্ধর্ষ এই ‘সন্ত্রাসীর’বিরুদ্ধে  চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন থানা ও জেলার রাউজান থানায় ১৫টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ৮টি হত্যা মামলার আসামি রায়হান।

তবে রায়হানকে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল বলেন, সন্ত্রাসী রায়হান খুব চালাক প্রকৃতির। হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য তিনি খুব সময় নেন। খুনের ঘটনা ঘটিয়ে দ্রুত তিনি  রাউজানের পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে চলে যান। ফলে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় কারাগারে গিয়ে চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ ‘সন্ত্রাসী’ ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে পরিচয় হয় ‘সন্ত্রাসী’ মোহাম্মদ রায়হানের। গত বছর ৫ আগস্টের পর দুজন কারাগার থেকে জামিনে বের হন। এরপর ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রায়হান। সাজ্জাদ সম্প্রতি আবারও কারাগারে গেলে তার অস্ত্রভাণ্ডারের  দেখভাল করছেন এই রায়হান। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে রায়হান দ্বিতীয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশে যোগ দিতেন রায়হান। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিএনপির সভায় যোগ দিতে শুরু করেন তিনি। রায়হান রাউজানের কদলপুরের মৃত বদিউল আলমের ছেলে।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *