ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল নিয়ে সম্প্রতি নানা আলোচনা সামনে আসছে। কেউ বলছেন এর চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করার কথা, আবার কারও কারও মত নিয়মের মধ্যে এনে চালু রাখার পক্ষে।
“যেখানে খুশি সেখানে চলছে- জাস্ট একটা রিকশা ন্যাও আর নেমে পড়ো, এগুলো বন্ধ করা উচিৎ,” বিবিসি বাংলাকে এভাবেই বলছিলেন ঢাকার রামপুরা এলাকার বাসিন্দা আলী হায়দার।
মি. হায়দারের মতো অনেকেরই দাবি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সম্পূর্ণ বন্ধ করার। তারা বলছেন, বেপরোয়া এই যানবাহনের কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা, বিদ্যুতের অপব্যবহারও বাড়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকার আজিমপুর এলাকার বাসিন্দা সূজন মণ্ডল বলছেন, “বন্ধ করা সমাধান নয়, নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। চালকদের রাস্তায় না আটকে, অবৈধ কারখানা আগে বন্ধ করুন। কাজ পেলে তো কেউ রিকশা চালাতে আসতো না।”
ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ শহরেই অটোরিকশার দাপট বেড়েছে। লাখ লাখ অটোরিকশা একরকম নিয়ন্ত্রণহীনভাবেই চলাচল করছে বিভিন্ন সড়কে।
সম্প্রতি ঢাকায় অটোরিক্সা চলাচল করতে না দেওয়ার ব্যাপারে সরকার শক্ত অবস্থান নেওয়ার পর সড়ক আটকে আন্দোলন করতে দেখা গেছে এর চালক ও মালিকদের অনেককে।
তাদের অনেকে বলছেন ‘রাস্তা যেখানে অটোরিক্সা সেখানে’ আবার কেউ বলছেন, ‘নিয়ম করে হলেও এই যানবাহন চলতে দেওয়া হোক।
সব মিলিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরের জন্য বেশ জটিল সমস্যা হয়ে উঠেছে বলেই মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরাও।
সরকারের পক্ষ থেকে অটোরিক্সা নিয়ে নীতিমালা তৈরির কথা বলা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে এই যানবাহন চলাচলে জোন ভিত্তিক রঙ ব্যবহার করাসহ নানা পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
এমনকি ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে বিশেষ বৈঠকও করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে, যে পরিকল্পনাই করা হোক না কেন তার সফলতা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতের অনেক পরিকল্পনাই মাঠপর্যায়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
অটোরিকশা নিয়ে নতুন পরিকল্পনা
অতীতেও বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।
বরং দিন দিন এর সংখ্যা বেড়েছে, চলাচলও হয়েছে বেপরোয়া। আর এই বেপরোয়া চলাচলে সড়কে মৃত্যু, যানজট ও বিশৃঙ্খলা এখন নিত্যদিনের চিত্র।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও অটোরিকশা নিয়ে নীতিমালা তৈরির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ খুব একটা এগোয়নি।
বরং ২০২৪ সালের মে মাসে অটোরিকশা ও ইজিবাইক চালকদের আন্দোলনের মুখে ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল তৎকালীন সরকার।
সে সময় বিশ্ব পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্যের কারণে স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে শুধু ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
কিন্তু সেই থেকে ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক, এমনকি ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন জেলা শহরে- ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপট লক্ষ্য করা গেছে।
সম্প্রতি অটোরিকশা নিয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে যেতেই ঢাকায় আবারও সড়ক আটকে বিক্ষোভ হয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার প্রতিবাদে গত সোমবার বিক্ষোভ করেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক ও মালিকদের একটি অংশ।
এর পরদিনই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, এই যানবাহনের কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও এগুলো লাগামহীন ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে দেওয়া হবে না।
এরই ধারাবাহিকতায় এবার রাজধানীতে ইলেকট্রিক রিকশা ও ই-বাইক চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে জোন ভিত্তিক পরিকল্পনা এবং নীতিমালা তৈরির কথা জানালেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বা ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান।

বৃহস্পতিবার ঢাকার মিরপুরে একটি কর্মসূচি শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, অটোরিকশা বা ই-রিকশা এবং ই-বাইকের জন্য সরকার একটি নীতিমালা তৈরি করছে।
“ই-রিকশা সরকারের পক্ষ থেকে অনুমোদন হয়েছে। আমরা একটা বিধি এবং নীতিমালা তৈরি করছি,” গণমাধ্যমকে জানান তিনি।
ডিএনসিসি প্রশাসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে অটোরিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে সরকারের পরিকল্পনাটি হলো জোন-ভিত্তিক।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন চারটি করে মোট আটটি জোনে অটোরিকশা ও ই-বাইকের জন্য আলাদা রং নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি জোনে এসব যানবাহনের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে।
মি. খান বলছেন, “প্রতিটি জোনের অটোরিকশার জন্য আলাদা রং নির্ধারণ করা হবে। একটি জোনে সবুজ রঙের রিকশা থাকবে, অন্য জোনে থাকবে কমলা রঙের। এভাবে চারটি জোনে ভিন্ন ভিন্ন রং ব্যবহার করা হবে। এতে এক জোনের রিকশা অন্য জোনে গিয়ে চলাচল করতে পারবে না।”
এছাড়া নির্ধারিত সংখ্যার বাইরে নতুন করে কোনো রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ থাকবে না বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, “যে কেউ ইচ্ছামতো অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নামছে। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে, অপরাধ প্রবণতাও বাড়ছে। গ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে কেউ রাজধানীতে যানজট সৃষ্টি করে মানুষের চলাচলে বাধা তৈরি করতে না পারেন, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঢাকায় অটোরিকশা চালকদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। ডিএনসিসি প্রশাসক দাবি করেন, অটোরিকশা চালকদের আন্দোলন কেউ সমর্থন করেনি।
এই আন্দোলনে রাজনৈতিক দলের চিহ্নিত অনেক নেতাকর্মী যুক্ত হয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তার প্রশ্ন, “এটা কি অটোরিকশার আন্দোলন? নাকি সরকারকে বিব্রত করার জন্য, সরকারকে চাপে ফেলার জন্য এই আন্দোলন?”

সংকট কী কাটবে?
ঢাকায় বর্তমানে কত অটোরিকশা চলছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। বিআরটিএ বা সিটি কর্পোরেশনের হিসাবে ৮০ হাজার থেকে এক লাখের কথা বলা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি।
জোন ভিত্তিক রঙ, নির্দিষ্ট সংখ্যা এবং নীতিমালা – এই তিনটি পদক্ষেপ দিয়ে কি ঢাকার অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাগজে পরিকল্পনা ভালো, কিন্তু বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ। এর আগে সিটি কর্পোরেশন প্যাডেল রিকশার জন্যও জোন ভাগ করেছিল, শুরুতে কিছুটা তৎপরতা থাকলেও শেষমেষ তা মানা হয়নি।
যতক্ষণ পর্যন্ত বিআরটিএ, সিটি কর্পোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ এবং বিদ্যুৎ বিভাগ একসাথে সমন্বিতভাবে কাজ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই বাহন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলেই মত তাদের।
রাজধানীতে এই ধরনের যানবাহন বৈধ করার আলোচনা চললেও সেটি যৌক্তিক হবে না বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।
তাদের মতে, নিবন্ধন দেওয়ার আগে নিয়ন্ত্রণের উপায় নির্ধারণ করা জরুরি।
বুয়েটের শিক্ষক, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলছেন, অতীতে জোন ভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।
“অনেকে বলেন যে, এখন অবৈধ আছে তাদেরকে রেজিস্ট্রেশন দেই। কেউ কেউ বলেন জোন ভিত্তিক তারা চালাবে, এগুলো ভেরি লুকরেটিভ (খুবই আকর্ষণীয়) কথা। কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সেই সক্ষমতা নাই,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের গাফিলতির প্রসঙ্গও সামনে আনছেন এই বিশেষজ্ঞ।
তার ভাষ্য মতে, “সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির অদূরদর্শিতা, সময়মতো কাজ না করা, কী হতে পারে সে সম্পর্কে তাদের পেশাদারী ধারণা না থাকা। কখনও কখনও অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেরাই এই সিস্টেমের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে ফেলে।”
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
গণপরিবহন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
রাজধানীবাসির কাছে নিয়মিত ভোগান্তির নাম যানজট। সব সরকারই ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে নানা পরিকল্পনার কথা বললেও সময়ের সাথে সাথে এই দুর্ভোগ বাড়ছে।
এমনকি একের পর এক ফ্লাইওভার তৈরি কিংবা মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করেও সুফল মেলেনি খুব একটা।
বরং মূল সড়কে ধীর গতির যানবাহন, যেখানে সেখানে যানবাহনের পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামার প্রতিযোগিতা ঢাকার সড়ককে আরও অনিরাপদ করে তুলেছে।
অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে ঢাকা মহানগরের গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর উপায় খুঁজে বের করতে এবার বিশেষ বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীসহ মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এই বৈঠকে ঢাকার গণপরিবহন চলাচলে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির বরাত দিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বা বাসস বলছে, ঢাকায় গণপরিবহনের বিশৃঙ্খল অবস্থা এবং যানজট সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই সভা।
“বৈঠকে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রাজধানীর গণপরিবহনের বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা কীভাবে দূর করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে,” বলেন তিনি।
