১৭ সেপ্টেম্বর ১৮৭৯ সাল তামিলনাড়ুর ইরোডে জন্মেছিলেন ইরোড ভেঙ্কটাপ্পা রামাসামি—পরবর্তী সময়ে যিনি ‘পেরিয়ার’ নামে পরিচিত হন। ২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তাঁর ১৪৭তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর ৯৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে। ১৯২৪ সালের বৈকম সত্যাগ্রহে তিনি অংশ নেন এবং কারাবন্দিও হন। এই আন্দোলনের মূল বিষয় ছিল জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মন্দিরের আশপাশের রাস্তায় তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষের চলাচলের অধিকার। পেরিয়ারের বৈকম-অংশগ্রহণ তাঁর পরবর্তী সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
– বিজ্ঞাপন –
১৯২৫ সালে কংগ্রেস ছাড়ার পর পেরিয়ার আত্মমর্যাদা আন্দোলন বা Self-Respect Movement গড়ে তোলেন। জাতপাতের শ্রেণিবিন্যাস, সামাজিক বৈষম্য, অন্ধবিশ্বাস ও বর্ণভিত্তিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে যুক্তি ও আত্মমর্যাদাকে সামনে আনা ছিল এই আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে নারীর স্বাধীনতা, সামাজিক সমতা এবং প্রচলিত বিবাহব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্নও আন্দোলনের আলোচনায় আসে।
এই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত উদ্যোগ ছিল Self-Respect Marriage বা আত্মমর্যাদা বিবাহ। পুরোহিত ও প্রচলিত ধর্মীয় আচারনির্ভর বিবাহের পরিবর্তে সমতা, পারস্পরিক সম্মতি ও যুক্তিবাদকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা ছিল এর মধ্যে। নারী-পুরুষের সমতা এবং জাতপাতের বাধা ভাঙার প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এরপর পেরিয়ারের ভূমিকা আরও সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়। তিনি জাস্টিস পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৩৯ সালে হিন্দি-বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কারাবন্দি হন। ১৯৪৪ সালের সম্মেলনে জাস্টিস পার্টির নাম বদলে দ্রাবিড়ার কাঝাগম (Dravidar Kazhagam) করা হয়।
পেরিয়ারের রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাব পরবর্তী দ্রাবিড় রাজনীতিতেও দেখা যায়। তবে তাঁর উত্তরাধিকারকে শুধু রাজনৈতিক সংগঠনের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর সামাজিক আন্দোলনের বিস্তৃত পরিসরটি বাদ পড়ে যায়। জাতপাতের প্রশ্ন, নারী-সমতা, আত্মমর্যাদা, যুক্তিবাদ এবং সামাজিক ন্যায়—এই বিষয়গুলিকে ঘিরেই তাঁর দীর্ঘ জনজীবনের বড় অংশ আবর্তিত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তাঁর জন্মদিন ১৭ সেপ্টেম্বরকে ২০২১ সাল থেকে তামিলনাড়ুতে Social Justice Day হিসেবে পালন করা হয়। রাজ্য সরকার ওই দিন সামাজিক ন্যায়, সমতা, আত্মমর্যাদা ও যুক্তিবাদের মূল্যবোধ নিয়ে শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে পেরিয়ারকে ঘিরে প্রচলিত সব দাবিকে ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে নেওয়া যায় না। বিশেষ করে ১৯৭০ সালে UNESCO তাঁকে কোনও পুরস্কার বা ‘Socrates of South Asia’ উপাধি দিয়েছিল—এই দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক রয়েছে। নির্ভরযোগ্য UNESCO নথিতে এমন পুরস্কারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বরং ২০২১ সালে এই দাবিকে ঘিরে তামিলনাড়ুর পাঠ্যবই নিয়েও আইনি প্রশ্ন উঠেছিল। তাই এই দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উল্লেখ না করাই নিরাপদ।
জাতপাতবিরোধী আন্দোলন, আত্মমর্যাদার ধারণা, নারী-সমতার প্রশ্ন এবং দ্রাবিড় রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ প্রভাব—এই সবকিছুর মধ্য দিয়েই আজও পেরিয়ারকে নিয়ে আলোচনা অব্যাহত। তাঁর ১৪৭তম জন্মবার্ষিকীতে তাই ফিরে দেখা যায় বিংশ শতকের দক্ষিণ ভারতের সমাজ সংস্কার ও রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
