ছবির উৎস, Cortesía
তাদের ডেটিং ভালোই চলছিল। শুধু ভালো না, বেশ ভালো। কিন্তু লেনা ভয় পাচ্ছিলেন যে তার সঙ্গী যখন তার বয়স জানতে পারবেন, তখন হয়তো সম্পর্কটা শেষ হয়ে যাবে।
ডেটিং অ্যাপে পরিচয়ের পর কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা দেখাসাক্ষাৎ করেছেন। পরিচয়ের সময় লেনা তার প্রোফাইলে ইচ্ছাকৃতভাবেই বয়স উল্লেখ করেননি, কারণ তিনি প্রত্যাখ্যাত হতে চাননি।
কয়েক সপ্তাহ পর সম্পর্কটা যখন সিরিয়াস হতে শুরু করে, তার দুশ্চিন্তাও বাড়তে থাকে।
৪৫ বছর বয়সী লেনা জানান, তার সঙ্গী কিয়েটিল সম্পর্ক শুরুর আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি কোনো ক্ষণস্থায়ী সম্পর্ক নয়, সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজছেন।
প্রথম ডেটে লেনা তার সঙ্গীকে বলে দিয়েছেন যে তার একটি কিশোরী মেয়ে আছে। কিন্তু তাতেও কিয়েটিল আগ্রহ হারিয়ে ফেলেননি।
৩০ বছর বয়সী কিয়েটিল ভেবেছিলেন, লেনা হয়তো তার চেয়ে অল্প কয়েক বছর বড়।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরে লেনা যখন তার আসল বয়স জানান, তাতেও তিনি বিচলিত হননি।
বরং, তিনি লেনার মেয়ের সঙ্গে দেখা করেন, যে তার চেয়ে ১১ বছরের ছোট।
তিনি তখন লেনার মেয়ের কাছে জানতে চান, তার মায়ের সঙ্গে সম্পর্কটা এগিয়ে নিলে তার কোনো আপত্তি আছে কি না।
কিয়েটিলের পরিবার বা বন্ধুদের থেকে এই ধরনের কোনো অনুমতি নেওয়ার দরকার ছিল না। তবুও, তারা লেনাকে কীভাবে নেবেন, তা নিয়ে লেনা শেষ পর্যন্ত কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন।
“তুমি একজন বয়স্ক নারীর সঙ্গে প্রেম করছ কেন?”
“আমি কিয়েটিলকে বলেছিলাম, দয়া করে যেন তারা আমার বয়স না জানে। কারণ আমি খুবই ভয়ে ছিলাম যে তারা তাকে বলবে, ‘তুমি কেন একজন বয়স্ক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছ’?”
শেষ পর্যন্ত কিয়েটিলের বন্ধুরা বিষয়টি পুরোপুরি বুঝেছে, আর তার বাবা-মা লেনা ও তার মেয়েকে উন্মুক্তভাবে পরিবারে স্বাগত জানিয়েছেন।
“তারা সহজ-সরল মানুষ,” বলছিলেন লেনা।
কিন্তু যদি কেউ তাদের নিয়ে হাসাহাসি করত বা বলত যে বয়সের এই পার্থক্য অনুপযুক্ত?
“আমি প্রতিক্রিয়া জানাতাম,” বলেন কিয়েটিল। যিনি দাবি করেন, তার সঙ্গীকে নিয়ে কেউ উপহাস বা সমালোচনা করলে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের ইতি টানতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন।
আর লেনার মেয়ে? সে তার মাকে বলেছিল, “সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক এবং তুমিও একজন প্রাপ্তবয়স্ক। তাই সে যদি তোমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে, তাহলে সব ঠিক আছে।”
এমনকি সে প্রজন্মগত ব্যবধান কমাতেও সাহায্য করেছে। কিয়েটিল ও তার বন্ধুরা যে চলতি ভাষার শব্দ ব্যবহার করে, সেগুলোর অর্থ সে নিজের মাকে বুঝিয়ে দিয়েছে।
লেনা ও কিয়েটিল এখন দুই বছর ধরে একসঙ্গে আছেন। লেনা বলেন, কিয়েটিলের শান্ত স্বভাব ও স্থির মানসিকতা তার নিজের আবেগপ্রবণতা ও চাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
“কখনও কখনও মনে হয় সে যেন আমার চেয়ে বেশি পরিণত, আর আমি যেন বেশি শিশুসুলভ,” তিনি বলেন, “যদিও আমি বেশ কর্তৃত্বপরায়ণও হতে পারি।”
বিবেচনা করার মতো বিষয়
দম্পতিটি তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছেন এবং সম্প্রতি নরওয়ের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় শহর স্টাভানগারের কাছে একটি বাড়ি কিনেছেন।
তবে বয়সের পার্থক্যের কারণে শুধু সামাজিক কুসংস্কারই নয়, আরও কিছু বিষয় নিয়েও লেনা ও কিয়েটিলকে ভাবতে হয়েছে। যেমন দুজনের মধ্যে সম্ভাব্য ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, সন্তান নেবেন কি না সেই সিদ্ধান্ত এবং বার্ধক্যে তার যত্নের প্রয়োজন অনেক আগে দেখা দিলে তার প্রভাব কী হতে পারে।
নেটফ্লিক্সে ‘এইজ অব অ্যাট্রাকশন’ নামের একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের প্রিমিয়ারের পর সামাজিক মাধ্যমে এসব বিষয় আবারও আলোচনায় আসে।
ওই অনুষ্ঠানে ৪০ জন অবিবাহিত ব্যক্তি একে অপরের প্রেমে পড়েন, পরে তারা আবিষ্কার করেন যে তাদের মধ্যে বয়সের পার্থক্য উল্লেখযোগ্য।
ছবির উৎস, Netflix
লেনা এবং কিয়েটিল যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন, তা হলো আর্থিক পরিকল্পনা।
তারা যখন নতুন বাড়িটি কিনেছেন, তখন তারা একমত হন যে স্বল্পমেয়াদে সম্পত্তিতে লেনা বেশি অবদান রাখবেন, কারণ তিনি কিয়েটিলের আগে অবসর নেবেন।
শুরুর দিকে কিয়েটিল গৃহঋণে কম অবদান রাখবেন, তবে তিনি অবসরে পৌঁছানোর মধ্যে দুজনই সম্পত্তিতে সমান অবদান রাখবেন।
এই ধরনের পরিকল্পনা করা কঠিন হতে পারে। তবে বয়সে পার্থক্য থাকা দম্পতিদের ক্ষেত্রে এটি ঠিকভাবে নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ, বলেন সম্পর্ক বিষয়ক মনোরোগ-চিকিৎসক সারা লুইস রায়ান।
“বয়সের পার্থক্য আছে এমন সম্পর্কের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক আবেগ থাকে,” বলেন রায়ান। “এটি খুব প্রাণবন্ত, উত্তেজনাপূর্ণ… কিন্তু পরে, যখন দুজনই বয়সে এগিয়ে যান এবং জীবনের ধাপগুলোর পার্থক্য আর উপেক্ষা করা যায় না, তখন তা সম্পর্কে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে।”
এই ধরনের দম্পতিদের এমন একটি অবসর পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা অর্থ ও সময়—উভয় দিক থেকেই যুক্তিসঙ্গত, পরামর্শ দেন রায়ান। পাশাপাশি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা কীভাবে একে অপরের যত্ন নেবেন, সেটিও ভাবা উচিত।
এ প্রসঙ্গে লেনা আশা করেন, তিনি সুস্বাস্থ্য উপভোগ করবেন এবং তার বিশ্বাস, কিয়েটিলকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত “আমাকে দেখতে নার্সিং হোমে যেতে হবে না”।
ছবির উৎস, Cortesía
‘আমরা খুব ভালোভাবে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করি’
লেনা ও কিয়েটিলের মতো নয়, ক্সেনিয়া ও তার স্বামী মিখাইলের আলোচনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তেমনভাবে আসেনি। কেবল বয়স বাড়া নিয়ে রসিকতা করছিলেন মিখাইল।
জার্মানিতে নিজের বাসায় বসে ক্সেনিয়া বলেন, “আমরা বর্তমান মুহূর্তের জীবন উপভোগ করছি এবং ২০ বছর পর কী হবে, তা নিয়ে ভাবছি না।”
দুজনের পরিচয় হয়েছিল, একটি ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে, তাদের নিজ দেশ রাশিয়ায়।
বয়সের পার্থক্য নিয়ে শুরুতে দুজনই উদ্বিগ্ন ছিলেন, কিন্তু শিল্প, সংস্কৃতি এবং গোয়েন্দা কাহিনীর ওপর নির্মিত সিনেমার প্রতি তাদের অভিন্ন ভালোবাসার কারণে তারা দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।
ক্সেনিয়া বলেন, নিজের বয়সী মানুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর প্রতি তার আগ্রহ ছিল না, যারা তার মতে সময় কাটাত পার্টি করা, মদ্যপান ও ধূমপানে।
“আমি জাদুঘরে যেতে, রাজনীতি ও সামাজিক বিষয় নিয়ে বিতর্ক করতে, নতুন কিছু শিখতে এবং নতুন শহর ও দেশে ভ্রমণ করতে উপভোগ করতাম।”
মিখাইলকে যত বেশি চিনেছেন ক্সেনিয়া, ততই তিনি উপলব্ধি করেছেন যে তাদের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ও আগ্রহগুলো “একসঙ্গে জাদুঘরে যাওয়া বা একটি চলচ্চিত্র দেখা – এর চেয়ে অনেক গভীর”।
এই দম্পতি ২০২২ সালে বিয়ে করেন এবং পরে জার্মানিতে বসবাস শুরু করেন।
তাদের সম্পর্কে কোনো ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা আছে বলে ক্সেনিয়ার মনে হয় না, তবে তিনি মনে করেন যে মিখাইলের বিশ্ব সম্পর্কে অভিজ্ঞতা বেশি এবং সেখান থেকে তিনি শেখার সুযোগ পান।
ছবির উৎস, Cortesía
কিন্তু যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রজন্মগত একটি পার্থক্য লক্ষ্য করেন ক্সেনিয়া। তিনি নিয়মিত বার্তা পাঠান – কখনও কখনও দিনে ১০০টিরও বেশি। অন্যদিকে মিখাইল ফোনে বা সরাসরি কথা বলতে বেশি পছন্দ করেন।
ক্সেনিয়ার বন্ধু ও পরিবার মিখাইলকে খুব ভালোভাবেই গ্রহণ করেছেন। তবে মিখাইলের পরিবারের সঙ্গে ক্সেনিয়ার খুব বেশি যোগাযোগ হয়নি, কারণ তার নিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এখন খুব কম।
সন্তান নেওয়ার কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই, তবে ভবিষ্যতে তারা সন্তান চান এবং বেশি বয়সে মিখাইলের বাবা হওয়া নিয়ে ক্সেনিয়ার কোনো উদ্বেগ নেই।
তিনি বলেন, “আমি বয়সে ছোট হলেও, আমার মনে হয় তার প্রাণশক্তি বেশি। তিনি খুব সক্রিয় এবং স্থির হয়ে বসে থাকতে পছন্দ করেন না।”
তিনি আরও বলেন, “‘আমরা খুব ভারসাম্যপূর্ণভাবে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করি।”
‘লজ্জা পাওয়া বন্ধ করো’
এই ‘ভারসাম্য’ই এমন একটি বিষয়, যা লেনারও মনে হয় তিনি কিয়েটিলের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন।
কয়েক বছর আগে তিনি যখন ডেটিং অ্যাপে যোগ দেন, তখন নিজের থেকে কম বয়সী সঙ্গী খুঁজে নেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না। তিনি তার বয়সসীমা নির্ধারণ করেছিলেন ২৬ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে।
লেনা বলেন, “তখন আমার বয়স ছিল ৪২। জীবনের এমন একটি পর্যায়ে ছিলাম, যখন আমি এমন একজন পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক করতে পারতাম, যার নাতি-নাতনি আছে, অথবা যার কোনো সন্তানই নেই; দুই বিকল্পই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল।”
কিন্তু কিয়েটিলের সঙ্গে তার অসাধারণ বোঝাপড়াই তাকে অন্য নারীদেরও তাদের বয়সসীমার বাইরে সঙ্গী খোঁজার কথা ভাবতে উৎসাহিত করতে অনুপ্রাণিত করে।
কিছু নেতিবাচক মন্তব্য সত্ত্বেও তিনি তাদের যৌথ জীবন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা শুরু করেন, তবে অধিকাংশ প্রতিক্রিয়াই ছিল ইতিবাচক।
লেনার বিশ্বাস, নারীদের উচিত নিজেদের ব্যক্তিগত পছন্দের জন্য “লজ্জা পাওয়া বন্ধ করা” এবং একে অপরকে বিচার না করা। তিনি বলেন, তিনিও নিজে এমন অনুভূতির মধ্য দিয়ে গিয়েছেন এবং তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন।
আজ তিনি চান, নারীরা জানুক যে তারা এমন পুরুষদের সঙ্গেও অর্থবহ ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক খুঁজে পেতে পারেন, যাদের তারা আগে শুধু কম বয়সী হওয়ার কারণে এড়িয়ে গেছেন।
মনোচিকিৎসা ও শিক্ষাক্ষেত্রে ক্যারিয়ার শুরু করার আগে লেনা একটি নার্সিং হোমে কাজ করতেন এবং তিনি একজন নারীর কথা মনে করেন, যার স্বামী তার চেয়ে ১৭ বছর ছোট ছিলেন।
“তিনি প্রতিদিন ফুল নিয়ে তাকে দেখতে আসতেন। তিনি এখনো তাকে ভালোবাসেন। তাই আমি নিজেকে বলেছিলাম- এটাই সত্যিকারের ভালোবাসা…। আমি বিশ্বাস করি বয়স ভালোবাসাকে কেড়ে নিতে পারে না।”
