ছবির উৎস, Asian News International
কিংবদন্তি উর্দু ও ফারসি কবি মির্জা গালিবের সম্মানে নামকরণ করা মধ্য কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিট, যার পুরোনো নাম ফ্রি স্কুল স্ট্রিট।
জনবহুল এই রাস্তার একদিকে কলকাতার বিনোদনের জন্য জনপ্রিয় পার্ক স্ট্রিট এলাকা, অন্য দিকে ধর্মতলা। আর এই একটি রাস্তাতেই রয়েছে গায়ে গায়ে গড়ে ওঠা অজস্র দোকান, রেস্তোরাঁ ও হোটেল।
কয়েকটি জায়গায় বিল্ডিংগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রায় জোড়া। এক ফুট জায়গাও এখানে খালি পড়ে আছে, এমনটা কোথাও দেখা যাবে না।
গভীর রাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের এমনই একটি পুরনো ভবনে হক মঙ্গলবার রাতে ভয়াবহ আগুন লাগে। মারা যান নারী ও শিশু-সহ নয় জন।
তাদের মধ্যে সাত জন বাংলাদেশি পর্যটক ছিলেন, যাদের অনেকেই চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন। এছাড়া বাকি দুজন ছিলেন হোটেল কর্মী, ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা।
দুর্ঘটনা যেখানে, পাঁচতলা সেই ভবনের ভেতরে ঠাসাঠাসি করে রয়েছে অনেকগুলো হোটেল।
প্রতিটি হোটেলের দখলে রয়েছে অতিথিদের জন্য আনুমানিক দুই থেকে পাঁচটি ছোট ঘর। বিল্ডিংয়ের অধিকাংশ জানালা লোহার গ্রিল দিয়ে বন্ধ। চারপাশ জুড়ে বৈদ্যুতিক তারগুলো ঢিলেঢালাভাবে ঝুলে রয়েছে।
সিঁড়ি দিয়ে বিল্ডিংয়ে ঢোকা-বেরোনোর পথও অত্যন্ত সংকীর্ণ।
রাজ্যের নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ওই দুর্ঘটনার পরপরই সাংবাদিকদের সামনে বলেন, “দেখতে হবে, এই ধরনের হোটেল যারা চালাচ্ছেন, তাদের ট্রেড লাইসেন্স এবং ফায়ার লাইসেন্স রয়েছে কি না। একটি মাত্র তিনতলা বিল্ডিংয়ে ১০টি হোটেল চলছে। ঘরগুলোও অত্যন্ত ছোট। এভাবে চলতে পারে না। কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই দুর্ঘটনার পর দমকলের তরফে ওই এলাকার একাধিক গেস্ট হাউস এবং রেস্তোরাঁকে শো-কজ নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশে দাবি করা হয়েছে, আগে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতিগুলো যথাযথভাবে পূরণ করেনি।
তাদের বলা হয়েছে, অগ্নি-নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে কেন ওই ভবন খালি করে দিয়ে সিল করে দেওয়া উচিত নয়, সে বিষয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা জমা দিতে হবে।
রাজ্যের অগ্নিনির্বাপণ দফতর শুক্রবার মারকুইস স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট এবং সংলগ্ন এস এন ব্যানার্জি রোডে অবস্থিত ১৭টি হোটেলের অগ্নি-নিরাপত্তা সংক্রান্ত শুনানি করেছে।
এই এলাকার হোটেলগুলো প্রায়শই বাংলাদেশি পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় থাকে।
এছাড়া, শহরের হোটেল ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসুরক্ষা বিধি এবং অন্যান্য নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়গুলি খতিয়ে দেখতে ও অডিট করতে বোরো-ভিত্তিক কমিটিও গঠন করেছে কলকাতা পৌরসংস্থা।
ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images
‘কলকাতার পুরোনো বহুতলগুলোর চরিত্রই এমন’
রাজ্যের অগ্নিনির্বাপণ দফতরের প্রাক্তন মহানির্দেশক জগৎমোহন ভগৎ বিবিসিকে বলেন, “প্রায় সব পুরোনো বহুতলেই একটি মাত্র সিঁড়ি থাকে। সেটি যদি কোনোভাবে বন্ধ থাকে, তাহলে অনেক সমস্যা তৈরি হয়। তখন মানুষ ছাদেও যেতে পারেন না। কখনও পুরোনো জিনিসপত্র বা আসবাবও সেখানে রাখা থাকে, যা বেরোনোর পথ আটকে দেয়।”
“কলকাতার অনেক বাড়ি ৭০ থেকে ৮০ বছরের পুরোনো। এগুলো এমন সময়ে তৈরি হয়েছিল, যখন ওয়েস্ট বেঙ্গল ফায়ার সার্ভিসেস অ্যাক্ট, ১৯৫০, প্রযোজ্য হয়নি। বড়বাজার বা নিউ মার্কেটের মতো জায়গার পুরোনো ভবনগুলো অগ্নিনিরাপত্তার জন্য উপযুক্তভাবে তৈরি নয়। কলকাতার পুরোনো বহুতলগুলোর চরিত্রই এমন। ওগুলোতে এখন সম্পূর্ণ অগ্নিনিরাপত্তা বিধি মানতে গেলে মানুষেরও সমস্যা তৈরি হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, কলকাতার ঘিঞ্জি এলাকাগুলোতে বহুতলের পাশে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা না থাকায় ফায়ার সার্ভিসের সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করা বা বাড়িতে ঢোকা কঠিন হয়। একটিমাত্র প্রবেশপথ থাকলে, অথবা তা বন্ধ বা অতিসংকীর্ণ হলে, আগুন নেভানোর কাজও কঠিন হয়ে পড়ে।
তার বক্তব্য, বিশেষ করে এ ধরনের ভবনে গড়ে ওঠা হোটেলের ক্ষেত্রে অনেক সময় গভীর রাতে আগুন লাগলে সেখানে থাকা মানুষ অনেক দেরিতে আগুনের খবর পান। ততক্ষণে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকের শরীরেই বিষাক্ত ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করে ফেলে। তখন তাদের পক্ষে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।
“অনেক বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে হয়তো দেখা যাবে, তারা কখনও ফায়ার লাইসেন্সের জন্য আবেদনই করেনি,” বলেন মি. ভগৎ।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, কোনো বাড়ি যদি ফায়ার লাইসেন্স পাওয়ার পরেও নিয়ম মেনে চলা বন্ধ করে দেয়, তখন কী করা হবে?
“আরও একটি বিষয় হলো, ফায়ার ডিপার্টমেন্টও যথেষ্ট কর্মী-সংকটে ভুগছে। যেমন, দুই-তিনটি পাম্প থাকলেও হয়তো তার মধ্যে মাত্র একটি সচল থাকে। অর্থাৎ, সেখানে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।”
ছবির উৎস, Asian News International
‘অবৈধভাবে নো অবজেকশন পেয়েছে অনেকেই’
প্রায় ৩০ বছর ধরে শহরের বিভিন্ন বিল্ডিংয়ে অগ্নিসুরক্ষা সরঞ্জাম বসানোর কাজে যুক্ত এক বিশেষজ্ঞ দাবি করেছেন, পুরোনো ও নতুন, শহরে দুই ধরনের বাড়িতেই খরচ কমানোর জন্য যথাযথ সুরক্ষা বিধি মানা হয় না।
তিনি বলেন, “তৃণমূল কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় ছিল, বাড়ির মালিকরা দমকল বিভাগের নিচু স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে নিত। অগ্নি-সুরক্ষার বিধিনিষেধ না মেনেই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ পেয়ে যেতেন তারা। বেশিরভাগ বাড়িতেই অগ্নিনির্গমন পথ, স্মোক অ্যালার্ম, স্প্রিংকলার ব্যবস্থা নেই। এমনকি কোনো কোনো বাড়িতে একটি ফায়ার এক্সটিংগুইশারও থাকে না।”
তার মতে, এই সমস্যা উত্তর ও মধ্য কলকাতায় আরও গুরুতর আকার নিয়েছে। সেখানে ভাড়াটেরা এত কম খরচে জায়গা ভাড়া নেন যে, মালিকরা বাড়ির পেছনে খরচ কমাতে গিয়ে অনেক সময় অগ্নি-সুরক্ষার ক্ষেত্রে গাফিলতি করেন বলে তার অভিযোগ।
তার আরও অভিযোগ, অগ্নি-নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকলেও পুরনো বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে কালজীর্ণ বৈদ্যুতিক তার, অতিরিক্ত ভারবহনকারী সার্কিট এবং একটি বাড়ির সার্বিক বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণের অভাব নিয়মিত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক মানুষ।
কলকাতার হোটেলটিতে আগুন লাগার কয়েকদিন আগেই পশ্চিমবঙ্গের তারাপীঠের একটি হোটেলে আগুন লেগে অন্তত নয় জন প্রাণ হারান।
চলতি বছরের শুরুর দিকে কলকাতার আনন্দপুর এলাকায় একটি ফাস্ট-ফুড দোকানের গুদামে আগুন লেগে অন্তত ২৭ জন মারা যান। গত বছর বড়বাজারের ঋতুরাজ হোটেলে এরকমই একটি অগ্নিকাণ্ডে দু’টি শিশু ও এক বৃদ্ধ-সহ মারা যান ১৪ জন।
তাদের বেশিরভাগই অন্যান্য রাজ্য থেকে আসা পর্যটক ছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গ ফায়ার অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সার্ভিসেসের ২০২৫ সালের একটি নির্দেশিকা অনুযায়ী, হোটেল ভবনকে অনুমোদিত নকশা ও নির্দিষ্ট অগ্নি-নিরাপত্তা বিধি মেনে তৈরি করতে হবে।
ভবনে আগুন প্রতিরোধী দেয়াল ও সিঁড়ি, পর্যাপ্ত জরুরি বেরোনোর পথ, ফায়ার ইঞ্জিন ঢোকার মতো রাস্তা ও জায়গা, নির্দিষ্ট ক্ষমতার জলাধার ও হাইড্রান্ট ব্যবস্থা, ফায়ার ও স্মোক অ্যালার্ম, জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন জায়গায় ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখতে হবে।
কর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীদের আগুন নেভানোর সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং নিয়মিত মক ড্রিল, সরঞ্জাম পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
হোটেলে এলপিজি বা অন্য দাহ্য পদার্থ রাখলে প্রয়োজনীয় ফায়ার লাইসেন্স নিতে হবে। এছাড়া, ভবনের অগ্নি ও জীবনরক্ষার ব্যবস্থা ঠিকঠাক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে প্রতি বছর শংসাপত্র নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। সব শর্ত পূরণ হওয়ার পরই চূড়ান্ত ‘ফায়ার নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ দেওয়া হবে।
ছবির উৎস, Asian News International
কলকাতার ব্যবসায়ীরা কী বলছেন?
মির্জা গালিব স্ট্রিটের একজন ব্যবসায়ী এবং ওষুধের দোকানের মালিক মি. বিনোদ বলেন, “এখানকার বেশিরভাগ বাড়ি পুরোনো। অগ্নিনিরাপত্তার কোনো নিয়ম মেনে এগুলো তৈরি করা হয়নি। কোথাও কোনো অগ্নিনির্গমন পথ নেই। অধিকাংশ বাড়ির বিভিন্ন তলায় পর্যাপ্ত জায়গা না রেখেই একাধিক হোটেল রুম তৈরি করা হয়েছে।”
“এসি এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। সরকারি কর্তৃপক্ষের তরফে নিয়মিত ও যথাযথ পরিদর্শনেরও অভাব রয়েছে।”
তার মতে, খাস কলকাতায় এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেল বেছে নেওয়ার আগে কলকাতায় আসা পর্যটকদের মনে হয়তো এবার অগ্নি-নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মারকুইস স্ট্রিটের এক হোটেলকর্মী বলেন, “আরও আগেই এই ধরনের পরিদর্শন হওয়া উচিত ছিল। গা ঘেঁষে একের পর এক হোটেল গড়ে উঠেছে, অথচ অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ ফায়ার লাইসেন্স নেই। আগুন লাগার পরই পরিদর্শন শুরু হয়, কড়াকড়ি করা হয়, কিন্তু কিছুদিন পর আবার সব আগের মতো হয়ে যায়।”
ওই এলাকার একজন বস্ত্র ব্যবসায়ী বলেন, “মুনাফার জন্যই এভাবে একের পর এক হোটেল গড়ে উঠেছে। কিন্তু রাতারাতি তো এই হোটেলগুলো তৈরি হয়নি। যখন এগুলো গড়ে উঠছিল, তখন যে সরকার ক্ষমতায় ছিল, তাদের তরফে যথাযথভাবে কোনো নজরদারি হয়নি।”
নিউ মার্কেট এলাকার একজন পর্যটন ব্যবসায়ী এমডি আসিফ রাজা দাবি করেন, তিনি পর্যটকদের পরামর্শ দেন যেন কোনো হোটেলে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা সেখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।
