তপন মল্লিক চৌধুরী
অনেকেই মনে করছেন সম্প্রতি দেশের তরুণদের দ্বারা গড়ে ওঠা সিজেপি বা ককরোচ জনতা পার্টি আন্দোলন এবং পাঁচ দশক আগে ১৯৭৪ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জেপি আন্দোলন বা ক্রান্তি আন্দোলনের মধ্যে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও ভাবগত মিল রয়েছে।
১৯৭৪ সালে বিহার ও গুজরাটে চরম অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য এবং সরকারি দুর্নীতির বিরুদ্ধে মূলত শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ আন্দোলন শুরু করেছিল। প্রবীণ সমাজতান্ত্রিক নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ অবসর ভেঙে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং একে অহিংস পন্থায় এগিয়ে নিয়ে যান। লক্ষ্য ছিল ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’ বা ‘Total Revolution’। এটি রাজ্য সরকারের পদত্যাগ থেকে শুরু করে পরবর্তীতে ইন্দিরা গান্ধীর কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে এক বিস্তৃত জাতীয় রূপ ধারণ করে। এই গণআন্দোলনের জের ধরেই ১৯৭৫ সালে দেশে জরুরি অবস্থা (Emergency) জারি হয় এবং পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেকার যুবকদের ‘আরশোলা’ বা cockroaches বলা নিয়ে বিতর্কের জেরে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। এরপর অভিজিৎ দিপকে-সহ একদল তরুণ ও রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ মিলে প্রতীকীভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)’ গঠন করেন। প্রসঙ্গত, এটি কোনো নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়; বরং এটি একটি জেন-জি (Gen-Z) ঘরানার ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক ও প্রতিবাদী যুব আন্দোলন। এই আন্দোলন মূলত বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতি এবং NEET-এর মতো প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে যন্তর-মন্তর ও সংসদ অভিযানের ডাক দেয়। এর ফলে ২০২৬ সালের ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
লক্ষ্যনীয়, দুটি আন্দোলনেরই মূল চালিকাশক্তি ছিল দেশের ক্ষুব্ধ ও হতাশ তরুণ ও ছাত্রসমাজ। ১৯৭৪ সালে জেপি আন্দোলন যেমন তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি ২০২৬ সালের সিজেপি আন্দোলনও বর্তমান শাসনব্যবস্থার ত্রুটি ও বেকারত্বকে সামনে এনেছে। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন যেমন জেপি আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, তেমনি সিজেপি আন্দোলনে ‘আরশোলা’ শব্দের মতো অবমাননাকর সম্বোধনকে তরুণরা প্রতীক হিসেবে লুফে নিয়ে প্রতিবাদে পরিণত করেছে।
পাঁচ দশক আগে দেশের গণতন্ত্রকে বাঁচাতে রাজপথে নেমেছিলেন তখনকার তরুণরা। দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে যা জেপি আন্দোলন হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৪ সালে ভারতে সরকারি দুর্নীতি, চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিল। প্রসঙ্গত, ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার খরচ, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরপর কয়েক বছর অনাবৃষ্টির কারণে দেশের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয়। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ খাদ্যের মূল্য এতটাই বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। সব মিলিয়ে তরুণরা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ শুরু করে। তারা ১৯৭৪ সালের মার্চে ‘বিহার ছাত্র সংঘর্ষ সমিতি’ গঠন করে আন্দোলনে নামে। জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে এই আন্দোলন অহিংস উপায়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় তরুণরা স্বেচ্ছায় পুলিশের হাতে আটক হতে ‘জেল ভরো’ কর্মসূচি পালন করে। আটকের সংখ্যা এত বেশি হয়েছিল যে এক পর্যায়ে বিহারের জেলে তিল ধারণের জায়গা ছিল না।
জেপি আন্দোলনের অন্যতম অভিযোগ ছিল, ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দল ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ ছিল, সরকার ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপি করে লাখ লাখ ভুয়া ভোটার যুক্ত করেছিল। অন্যদিকে বিরোধী মনোভাবাপন্ন এলাকার প্রকৃত ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ছিল। ভোটার তালিকা প্রণয়নকারী সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তালিকায় কারসাজির অভিযোগ ছিল। প্রায় এরকমই অভিযোগ দেশের বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে। সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে অভিযোগ করেন, দু’বছরে ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ‘ভোট চুরি’ করেছে। যে নির্বাচনে ভোটার তালিকায় ৪০ লাখ ভোটার যুক্ত করা হয়েছিল।’
১৯৭৪ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণের ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’ আন্দোলনের সময় নাগরিক সংগঠন ‘সিটিজেনস ফর ডেমোক্রেসি’ নির্বাচনী সংস্কারের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। তৎকালীন বোম্বে হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি ভি. এম. তারকুন্ডের সভাপতিত্বে এই কমিটি গঠিত হওয়ায় এটি ‘তারকুন্ডে কমিটি’ নামে পরিচিত। কমিটি ১৯৭৫ সালে ‘রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে’ শিরোনামে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে প্রস্তাব করা হয়েছিল- ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করা এবং এতে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ভোটারদের বয়স ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৮ বছর করা। কমিটির প্রধান সুপারিশ ছিল—নির্বাচন কমিশনকে একক নির্বাচন কমিশনারের বদলে একটি বহু-সদস্যের প্যানেলে রূপান্তর করা। কমিশনারদের নিয়োগের ক্ষমতা কেবল ক্ষমতাসীন সরকারের হাতে না রেখে একটি নিরপেক্ষ ত্রিপক্ষীয় কমিটির (প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতি) হাতে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের ২ মার্চ ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের নির্দেশনায় তারাকুন্ডে কমিটির প্রস্তাবেরই প্রতিফলন দেখা যায়।
তবে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেনি। ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের বিষয়ে আইন তৈরি করার চূড়ান্ত ক্ষমতা সংসদের। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বিজেপি সরকার ‘দ্য চিফ ইলেকশন কমিশনার এন্ড আদার কমিশনার্স অ্যাক্ট-২০২৩’ নামে নতুন বিল পাস করে। যেখানে তারা প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে কমিটিতে যুক্ত করে। নির্বাচন কমিশনার বিতর্কে ককরোচ জনতা পার্টি ২০২৩ সালের বিতর্কিত এই আইনটিই বাতিলের দাবি জানাচ্ছে। তাদের যুক্তি, যে কমিটির ৩ জনের দুজনই সরকার পক্ষের সেখানে আসলে গণতান্ত্রিকভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগই থাকে না। অর্থাৎ ১৯৭৪ সালের জেপি আন্দোলন এবং ২০২৬ সালের সিজেপি আন্দোলনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মেলবন্ধনই হলো ভোটিং ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন সত্তার দাবি।
