হিমালয়ের রুদ্ররোষে বিপর্যস্ত নেপাল। পাহাড়ি নদীর ভয়াবহ হড়পা বানে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে একাধিক এলাকা। ভেসে গিয়েছে বাড়িঘর, রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্প। বেড়েছে মৃতের সংখ্যা, এখনও নিখোঁজ বহু মানুষ। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই এবার ভারতকে সতর্ক করলেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল। তাঁর স্পষ্ট বার্তা—হিমালয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হলে নেপালের মতো বিপর্যয় ভারতেও আছড়ে পড়তে পারে।

নেপালের বিদেশমন্ত্রীর মতে, ভারত ও নেপালের সম্পর্ককে এতদিন ‘রুটি-বেটি’ বা ‘সীতা-রাম’-এর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বন্ধন দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্ককে নতুন করে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা জরুরি। তাঁর বক্তব্য, হিমালয়ের বরফ গলন এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রভাব কোনও একটি দেশের সীমানায় আটকে থাকবে না।

– বিজ্ঞাপন –

শিশির খানাল বলেছেন, ভারত, নেপাল, চিন ও ভুটান—চার দেশই একই বৃহত্তর হিমালয়ান বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি দেশের পরিবেশগত বিপর্যয় অন্য দেশগুলির জন্যও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা সীমান্তের বিভাজন ভুলে এই অঞ্চলের দেশগুলিকে হিমালয় রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করার বার্তাই দিয়েছেন তিনি।

কীভাবে বিপর্যয়?

২৬ অগস্ট নেপাল-চিন সীমান্তের কাছে ভয়াবহ হড়পা বান আছড়ে পড়ে। কাদা, পাথর, বরফ ও জলের প্রবল স্রোত পাহাড়ি নদী দিয়ে নীচে নেমে এসে বিস্তীর্ণ এলাকা তছনছ করে দেয়। নেপালের রাসুয়া জেলার একাধিক এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সীমান্তের ওপারে চিনের তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ভূবিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা, এই বিপর্যয়ের পিছনে হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়া গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিশেষজ্ঞেরা উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, হিমবাহের নীচের অংশ ভেঙে উপত্যকায় নেমে আসার পর বরফ, পাথর ও পলির বিশাল স্রোত নদীপথে আছড়ে পড়ে। এর ফলে তৈরি হয় অত্যন্ত দ্রুতগতির হড়পা বান।

প্রাথমিক পর্যায়ে ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মনে করা হলেও পরবর্তী বিশ্লেষণে বিষয়টি আরও জটিল বলে উঠে এসেছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, যে কম্পনটি রেকর্ড হয়েছিল, সেটি হিমবাহ ও পাথরের ধস থেকে তৈরি ভূকম্পীয় শক্তির ফলও হতে পারে। তাই বিপর্যয়ের নির্দিষ্ট ট্রিগার নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে।

বিজ্ঞাপন

মৃত শত শত, নিখোঁজ বহু

বুধবারের বিপর্যয়ের পর উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। ২৭ অগস্টের সর্বশেষ রয়টার্স আপডেট অনুযায়ী, নেপালে মৃতের সংখ্যা ৩৫৯-এ পৌঁছেছে। চিনের তিব্বতে আরও অন্তত ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ। ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপালের পাশাপাশি তিব্বতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। চিনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে সেখানে ৫৫৮ জন নিখোঁজ, যাঁদের মধ্যে বহু বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তিব্বতের নিখোঁজদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি বলে জানিয়েছে চিনের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি।

নেপালের দুর্গত এলাকায় নিখোঁজদের মধ্যে পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা, নিরাপত্তাকর্মী এবং বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত মানুষ রয়েছেন। নেপাল-তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলটি কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বহু বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী সেখানে আটকে পড়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।

নিখোঁজ ভারতীয়দের সংখ্যা নিয়েও উদ্বেগ

এই বিপর্যয়ে ভারতীয়দের নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভারতীয় সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের সর্বশেষ প্রতিবেদনে নেপালে প্রায় ৩০০ ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ থাকার কথা উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে পর্যটক ও মানসসরোবর যাত্রীর পাশাপাশি নেপালে কর্মরত ভারতীয়রাও রয়েছেন।

নেপাল সরকারের তরফে ইতিমধ্যেই উদ্ধার ও ত্রাণকাজ জোরদার করা হয়েছে। দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টার ও ড্রোনের সাহায্যে নিখোঁজদের খোঁজ চলছে। তবে বহু রাস্তা, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারী দলগুলিকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

ভারতের জন্যও কি অশনি সংকেত?

নেপালের বিদেশমন্ত্রীর সতর্কবার্তার মূল জায়গা এখানেই। হিমালয়ের বরফ গলন, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা, পাহাড়ধস এবং আকস্মিক বন্যার ঘটনা বাড়লে তার প্রভাব শুধু নেপালে সীমাবদ্ধ থাকবে না। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলির বিস্তৃত অববাহিকা ভারত ও বাংলাদেশের সমতল অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে।

ফলে নেপালের মতো বিপর্যয় ভবিষ্যতে ভারতের পাহাড়ি এলাকা এবং নদী অববাহিকাগুলিতেও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ, পারমাফ্রস্ট এবং পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতা বদলাচ্ছে। এর ফলে হিমবাহধস, হড়পা বান এবং পরপর একাধিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে।

নেপালের এই বিপর্যয় তাই শুধু একটি দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়—হিমালয় ঘিরে থাকা গোটা অঞ্চলের জন্যই বড় সতর্কবার্তা। শিশির খানালের বক্তব্যের মূল বার্তা, হিমালয়কে বাঁচাতে হলে ভারত, নেপাল, চিন ও ভুটানকে পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

নেপালে বারবার বিপর্যয়

নেপাল দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকম্প, ভূমিধস, বন্যা ও হিমবাহজনিত বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে থাকা দেশ। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। ১১ বছর পর ফের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত হিমালয়ের এই দেশ।

তবে এবারের ঘটনা আরও একটি বিষয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—হিমালয়ের পরিবেশগত সংকট কোনও সীমান্ত মানে না। তাই নেপালের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে আগাম সতর্কতা, হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, নদীপথে নজরদারি এবং দ্রুত সতর্কবার্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাই এখন ভারত-সহ গোটা হিমালয় অঞ্চলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *