কেউ অবসর-প্রাপ্ত রেলকর্মী। কেউ আবার মহাদেবের টানে ছুটে গিয়েছেন কৈলাস। কিন্তু এমন মহাপ্রলয় যে অপেক্ষা করছিল,তা কেই বা জানত। বুধবার নেপাল-চিন সীমান্তের রসুয়া জেলায় ধেয়ে এল জলরোষ। এক মুহুর্তে যেন বদলে গেল মানচিত্র। শয়ে শয়ে মৃত্যুমিছিল। বহু মানুষের কোনও খোঁজ নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েই চলেছে নিখোঁজের তালিকা। তাঁদের মধ্যেই রয়েছেন কলকাতার ৬ জন। বিপর্যয়ের ছবি দেখে আঁতকে উঠছে পরিবার। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দলা পাকিয়ে আসছে গলার কাছে।

এই বিষয়ে আরও খবর

ছোট থেকে শিব ভক্ত রঞ্জিত হাওলাদার। ভোলানাথের টানে নেপালে গিয়ে নিখোঁজ বেহালা পর্ণশ্রীর বাসিন্দা। উৎকন্ঠায় দিন কাটছে পরিবারের। নেপালে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া দলের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে বিপর্যয়ের পর থেকে নিখোঁজ বেহালা পর্ণশ্রীর ২২জি মে রোডের বাসিন্দা রঞ্জিত। ঘটনার পর থেকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ হয়নি। বাবাকে দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফেরানোর জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন রঞ্জিতের মেয়ে। জানা গিয়েছে, রঞ্জিত রেলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। বাড়িতে স্ত্রী ও মেয়ে রয়েছে। মেয়ে সুনন্দা বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। স্বামী নিখোঁজের খবর শোনার পর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন স্ত্রী। মেয়ে সুনন্দা বলেন, বিপর্যয়ের আগের দিন রাতে শেষবার বাবার সঙ্গে বাবার কথা হয়েছিল। এরপর থেকেই আর কোনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার পর পর্যটক দলের অফিসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় এবং তাঁদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত নেপাল সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি পরিবার। সরকার দ্রুত বাবাকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে আনুক, এটাই চাই।”

নেপালে নিখোঁজ বেহালার বাসিন্দা রঞ্জিত হাওলাদারের স্ত্রী গায়ত্রী। ছবি: অরিজিৎ সাহা।

নেপালে হড়পা বানে কলকাতার আরও পাঁচজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে খবর। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সার্ভে পার্ক থানার দম্পতি মানস কুমার ঘোষ ও দীপালি সরকার। বিপর্যয়ের পর থেকে দুজনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। মানসবাবু অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। ইস্টার্ন পার্কের ফ্ল‌্যাটে স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন তিনি। দম্পতির এক মেয়ে অদ্রিজা ঘোষ দিল্লি এইমসে পড়াশোনা করছেন। এদিন তাঁদের ফ্ল‌্যাট তালাবন্ধ ছিল। প্রতিবেশীরা জানান, স্বামী-স্ত্রী দুজনে ভ্রমণ পিপাসু মানুষ। মাঝে মাঝে ঘুরতে বেড়িয়ে যেতেন। বাবা-মা নিখোঁজের পর দিল্লি থেকে মেয়ে অদ্রিজা ফোনে যোগাযোগ রাখছেন। অদ্রিজা জানান, ‘২১ আগস্ট নেপাল যায় বাবা মা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তখন সব ঠিক ছিল। হঠাৎ কি যে ঘটে গেলো!’

গত কয়েক বছর ধরে মানস সরবর যাওয়ার পরিকল্পনা চলছিল রীনা বন্দ্যোপাধ‌্যায়ের। প্রতিবারই কিছু কিছু বিঘ্ন এসে পড়ায় যাওয়া হয়ে ওঠেনি। অবশেষে এবার তাঁর ইচ্ছে পূরণ হয়। ২১ আগস্ট মানস সরবর দর্শনে বের হন। নেপালে বিপর্যয়ের পর বছর চুয়ান্নোর রীনারও খোঁজ মিলছে না। নেতাজি নগর থানা এলাকার খানপুর রোডের বাসিন্দা। প্রাইভেট টিউশন পড়ান তিনি। বাড়িতে তাঁর আত্মীয়রা রয়েছেন। এক আত্মীয় বলেন, ‘রবিবার সন্ধ‌্যায় কথা হয়েছিল। তখন বলেছিল আশপাশে কোথাও একটা ধস নেমেছে। তবে ভয়ের কিছু নেই বলে জানিয়েছিল। খবরে নেপালের পরিস্থিতি দেখার পরই ফোনে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তাঁর ফোন পাওয়া যায়নি। যে ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে গিয়েছিল তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু তারাও কোনও দিশা দেখাতে পারছে না।’

এদিকে স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে অমরনাথ পালের স্ত্রী প্রথমা পাল একেবারে ভেঙে পড়েছেন। দু’চোখের পাতা এক করতে পারছে না তিনি। সারাক্ষণ শিবের কাছে প্রার্থনা করে চলছেন। ভ্রমণ ছিল অমরনাথের নেশা। অবসর জীবনে সেই নেশাকেই সঙ্গী করে কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনের উদ্দেশ্যে নেপালে গিয়েছিলেন পাটুলির ৬২ বছরের অমরনাথ । কিন্তু নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর থেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। অমরনাথের স্ত্রী বলেন, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো ছিল তাঁর নেশা। এবার কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনের ইচ্ছা নিয়ে একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ‌্যমে ২১ আগস্ট একাই রওনা দিয়েছিলেন তিনি। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁর বাড়ি ফেরার কথা ছিল। বাড়িতে আত্ময়ী, প্রতিবেশী কেউ এলেই তিনি কান্না ভেজা গলায় তাঁদের জিজ্ঞাসা করছেন, “আমার স্বামীর কোনও খোঁজ পাওয়া গিয়েছে? উনি এখন কেমন আছেন?”

নেপালে নিঁখোজ পাটুলির বাসিন্দা অমরনাথ পাল।

মানস সরবর ভ্রমণের একটি মাত্র আসন বাকি ছিল। সেই আসন পাওয়া সুস্মিতা ভট্টাচার্যের কাছে ছিল লটারি পাওয়ার মত। নেপালে হড়পা বানের পর কসবার হালতুর বাসিন্দা সুস্মিতাও নিখোঁজ। সুস্মীতার ছেলে সুনীত বলেন, রবিবার রাতে কথা হয়েছে। পশুপতিনাথ মন্দির দর্শন করে মানস সরবরের দিকে ভ্রমণ সংস্থার বাকি পর্যটকদের সঙ্গে যাচ্ছিল। মা খুব খুশি ছিল। বিপর্যয়ের পর থেকে মায়ের ফোন সুইচ অফ বলছে। মেসেজও যাচ্ছে না। ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারাও কোনও আশা দিতে পারছে না। উদ্বিগ্ন সুনীত বলেন, মানস সরবর ট্যুরের বুকিং অনেক দেরিতে করেছিল মা। যখন বুকিং করে তখন ওই ট্যুর সংস্থার একটি মাত্র আসন খালি ছিল। মা ভেবেছিলেন হয়তো এবার আর যাওয়া হবে না। তবে ওই আসনটা পাওয়া যেন মায়ের কাছে লটারি পাওয়া ছিল।

এই বিষয়ে আরও খবর

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *