দেবারুন রায়

হেলালুদ্দীন শেখ। বেলডাঙা কলেজের ফিজিক্যাল এডুকেশনের শিক্ষক। বছর ৩৫ এর যুবক। আতিকুরের বুলেটেই চেপে একটা রাস্তার তে মাথায় এসে নেমে দেখি সে দাঁড়িয়ে। তাকে দেখছি, চেনার চেষ্টা করছি। হেলালুদ্দীনের নাম ও পরিচয় আতিকুর বলেছে আমি ২২ এপ্রিল ওদের কাজিসাহার বাড়িতে আসার পরই। গ্রামের আরও কিছু লোকের সঙ্গে দেখা করব। এই ধর্ম সংকটের ভোটে ওরা এতটাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে যে প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গেও মনের গোপনে নিভৃত ভুবনে জেগে ওঠা প্রশ্নগুলো শেয়ার করা যাচ্ছে না। নিজের ঘরের কাউকে বলবে, তাও তো হওয়ার নয়। বাড়ির সবাই তো ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে। কাকে ভোট দেব ? বিজেপিকে রোখার ব্যাপারটা নতুন করে বলার কিছু নেই। এই গাঁয়ের সবাই জানে। কিন্তু সংকট আরও গভীর। তৃণমূল না কংগ্রেস, হুমায়ুন না নোটা ? হুমায়ুন গাঁয়ের সব মুরুব্বি মাতব্বরদের কবুল করিয়ে নিয়েছে। তবে না, সেবার ৯ সালের লোকসভা ভোটে বসিরহাটের হাজি যেমন মসজিদে মিটিং করে কসম খাইয়ে নিয়েছিল, ততটাও নয়। সব বাড়ির বুজুর্গ কর্তারা আলেম মোল্লা মুরুব্বি হুজুরদের কথায় ঘাড় নেড়ে এসেছেন। আব্বুর দেওয়া কথা কি বেটা বিটিরা উড়িয়ে দিতে পারে ?

আসলে জানার কথা তো একটাই। ওই একটা চাল টিপে দেখলেই গোটা হাঁড়ির ভাত সেদ্ধ হল কিনা বোঝা যায়। সংখ্যালঘুদের ভোট দেওয়ার ধরনটাই মোটের ওপর এক। দলবদ্ধ সম্প্রদায়বদ্ধ ভোট দেওয়ার ধরনটাই নিরাপত্তাহীনতার ভাষা। সেটা যে গড্ডালিকার চলমান মিছিলে হাঁটার সমষ্টিগত প্রবণতা তাতে কোনও ভুল নেই। কৌম বলি বা কমিউনিটি, একটা কমিউন মূলক দায়বদ্ধতা, দায়িত্ব বললে আরেকটু স্পষ্ট হয়। সেই “জিন্দেগি হ্যায় কৌম কি, তু কৌম পে লুটায়ে যা।” কিন্তু ধর্ম সংকটের চৌরঙ্গিতে দাঁড়িয়ে এই কৌম টলে যায়। সেই আপ্তবাক্য কতদূর সত্য তা জানতে গিয়ে ১০০ ভাগ মুসলমান আবাদীর এই বিশাল গাঁ “কাজিসাহা”র ভূপৃষ্ঠের পেটের ভিতরে প্লেটগুলো বেশিরভাগই নড়ে গেছে। এই রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার সবাই মুসলমান সম্প্রদায়ের। এই ভোটে বিরাট থাবা বসিয়েছেন বাবরপুত্র বাঁশিওলা। হয় ” বাঁশি, নয় জোড়াফুল লিড নেবে এই গাঁয়ে।” কথাটি যে বলল সে বছর তেত্রিশ চৌঁত্রিশের যুবক। পেশা রাজমিস্ত্রি। ওই বাড়ির বড় ছেলে। আলাদা থাকে। বোঝা গেল সে তৃণমূলকেভোট দিয়ে এসেছে। আর বাদবাকি অন্তত জনা ছয়/ সাতের মধ্যে বুড়ো বাপ থেকে ভাই ভাইয়ের বউ ইত্যাদি সবাই হুইসল মানে বাঁশিতে ফুঁ দিয়েছে।

হেলালুদ্দীন বলছিলেন, হুমায়ূন কবীর রেজিনগর আর নওদা এই দুই কেন্দ্রে লড়ছেন। হুমায়ুন হয়তো জিতবেন। দুটো কেন্দ্রেই তৃণমূলের মুসলমান ভোট পকেটে বড় ছ্যাঁদা হল পনেরো বছরে এই প্রথম। আগে হয়েছে টুকটাক। যেমন সাগরদীঘিতে। সব সেকুলার বিরোধীদের ভোট এক হয়ে বায়রন বিশ্বাসকে জিতিয়েছিল। প্রমাণ হয়েছিল, তৃণমূলের মুসলমান ভোট ভাঙলেও বিজেপি জেতেনা। কিন্তু ইতিহাস যেমনটি হবার তেমনটিই হয়েছিল। অপারেশন সাগরদীঘি রাতারাতি অধীরের চ্যালা বায়রনকে তৃণমূলের লর্ড বায়রন বানিয়েছিল। বিরোধী সেকুলারদের মেরুদণ্ড দুমরে মুচড়ে ইতিহাসে পাতিহাঁস গজিয়েছিল। আর তার পরের মওকাতেই মেরুদণ্ড ভাঙা বিরোধীদের ভোট দাঙ্গার মেরুকরণে বাইনারির গলায় মাল্যদান করে অধীরের হিন্দু মুসলমান ভোট হুড়হুড় করে বেনোজলের মতো ঢুকেছিল যথাক্রমে তৃণমূল ও বিজেপির ঘরে। কংগ্রেসের লাশ ভেসে গিয়েছিল হুমায়ুন আর কার্তিক মহারাজের সত্তর/ তিরিশ বিভাজনের কৌশলে। গুজরাতের মোদীভক্ত ইউসুফ পাঠানকে তুরুপের তাস করে তৃণমূল মুর্শিদাবাদকে কংগ্রেসমুক্ত করেছিল। কংগ্রেসমুক্ত ভারতের মোদী কথিত অ্যাজেন্ডার বলি মুর্শিদাবাদের অধীর, এই ঘটনার দিন থেকে ইতিহাসের কালচক্র উল্টোমুখো ঘুরতে শুরু করে। সেই ঘূর্ণিপাকে পড়েন খোদ হুমায়ুন কবীর। দূরন্ত ঘূর্ণির ওই লেগেছে পাক। দুনিয়া ঘোরে বনবন বনবন ছন্দে ছন্দে কত রঙ বদলায়…। তারই ফলশ্রুতি আজকের হুমায়ুনি হুমকি। বাবরি মসজিদ একটা নির্মোক মাত্র। জগন্নাথ থেকে মহাকাল মন্দিরের নীল নকশার অব্যবহিত প্রতিক্রিয়া।

বেলডাঙা চিনিকল। প্রতিবেদকের সঙ্গে আতিকুর ও হেলালউদ্দিন

বৃদ্ধ মুস্তাফার বুকে ব্যাথা। যখন হয় তখন জিভের নীচে সরবিট্রেট বাড়িটা গুঁজে শুয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পরে উঠে বলেন, আমি ঠিক হয়ে গেছি। আল্লাহ আরাম করে দিল। আর কোনও ব্যারাম নেই। এবার ভোটটা দিয়ে আসি।জানো ভাই, কেন হুমায়ুনকে ভোট দিচ্ছি আমরা ? দলের বিরুদ্ধে কাজ করলে দল শাস্তি দিক। তাইবলে ভরা জলসার মধ্যে ওইরকম অপমান ! সব সহ্য করে নিয়েছিলাম। ওবিসি সংরক্ষণ থেকে ওয়াকফ, বেলডাঙার দাঙ্গা থেকে শিক্ষায় জালিয়াতি, সব। বিজেপির হাওয়া দিয়ে আর কত চুলো জ্বলে ? গ্যাস গেল, গ্যাস দিয়ে আর জুমলা দিয়ে কতদিন চলে ? এদিকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার তো এখন মোদীর গরনটি ! আমার একটা ছেলেরও চাকরি হল ? শিক্ষার বারোটা বাজিয়েছে। আমার উচ্চশিক্ষিত ছেলেটা ডিগ্রি নিয়ে বসে আছে। চাকরি নেই। রিসার্চ করছে। আর আমরা যেনাকে ভোট দিচ্ছি তিনি বলছেন ঘুগনি বেচতে। রিসার্চ করা ছেলে স্কুল কলেজে পড়াবে না ? ঘুগনি বিক্কিরি করবে ? তোমার ছেলের ভাল হোক, হিংসে নাই। তোমার ছেলেকে রাজা করো, দুঃখু নাই, তাইবলে আমার ছেলে ভেসে যাবে ? তাই আল্লাহর ঘর করার কথা বলেছে যে, তার কাজে আমরা লেগেছি। তুমি মন্দির করছ করো। আমাদের তো আপত্তি নাই। তবে তুমি মসজিদ করলে অপমান করে তাড়িয়ে দেবে ? মুস্তাফার বড় ছেলে আলাদা বাড়িতে থাকে। রাজমিস্ত্রি। সে এইসব কথা শুনে যাচ্ছে। কিন্তু তার মুড তৃণমূলেই থিতু বোঝা যায়। বাপের কথার রেশ ঘুরিয়ে সে বলে, তোমার বুকে ব্যাথা করছে, কথা বলা বারণ। এখানে তৃণমূলের ক্যান্ডিডেট বদ‌ল হয়েছে এবার । রবিউল পাশের টায় হয়েছে। এখানে আতাউর। ওর ছোট ভাই পরচুলোর কারখানায় কাজ করে। আব্বুর হাত ধরে ভোট দিতে নিয়ে যেতে যেতে বলে, সালিশি করতে আতাউরের কাছে গেলে কথার শুরুতেই পঞ্চাশ হাজার লাগে। ওই নজরানা জোটায় কে ? কাজকামের জন্যে সরকার তো কিছুই করেনি। এই কারখানা গুলোতেও পার্টির লোক কিছু করেনি। যে যার মতো নিজের খ্যামতায় করে খাচ্ছে। বাজার জোটাতে হয় আমাদের। বিদেশেই বাজার ধরতে হয়। এই ব্যবসার জন্যেই এলাকায় বহু লোক করে খাচ্ছে। তো কে সরকারে এল তার দিয়ে আমাদের কী। দাঙ্গা লাগাল যারা তারা সরকারের কেউ না। তবু কেউ তো অ্যারেস্ট হল না। কোনও বিচার পায়নি সেই সব লোকে, যারা ধর্মের নামে আকথা কুকথা মুছে দিতে বলেছিল বলে তাদের কুপিয়ে দিয়ে গেল যারা তারা কেউ ধরা পরেনি।

হুমায়ুনের সঙ্গে কার্তিক মহারাজের বন্ধুর সম্পর্কের কথা সবাই জানে। তবু হুমায়ুনকে কেন ভোট দিতে যাচ্ছ ? উত্তর পেলাম, দাঙ্গার সময় ওকে ওপর থেকে কেউ কিচ্ছু বলেনি। কিন্তু মসজিদ করার কথা বলতে গিয়েছিল বলে ওকে বেইজ্জত করে তাড়াল। হুমায়ুনের ওপর এটা না-ইন্সাফি। কৌমের গায়ে লেগেছে। বিস্ময়ে বিমূঢ় হই, যখন শুনি গাঁ শুদ্ধু ছেলে বুড়োর আর জানতে বাকি নেই বিজেপির কাছে হাজার কোটি নেওয়া, মুসলমানদের বোকা বানানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বৃত্তান্ত। ওই ভিডিও যে সিসিটিভির ফুটেজ তাও জানে তারা। বলে, ও তো নিজেই স্বীকার করেছে। তা, বিজেপির টাকা নিয়ে এখানে মুসলমানদের বোকা বানানোর ফৈজত কি এই পেত্থম হল ভাইজান ? নাহলে অধীর চৌধুরীকে হারানো কি সম্ভব হয় ? হুমায়ুন তখন তো ওই গল্পের হিরো। ও আগে বিজেপির হয়ে দাঁড়িয়ে ফের তৃণমূলে আসেনি ?
এইখানে রাজনীতির দই জমল।

প্রতিবাদী ক্লাব একদা আরএসপি-র অফিস ছিল। ছবি লেখক

হেলালুদ্দীনের ক’টা কথা শুনুন। তাহলেই একটা আদ্যন্ত ছবি দেখতে পাবেন। পাখির চোখের গল্প। কিন্তু আকাশ থেকে উড়ানে ভাসা পাখির চোখের দৃষ্টি নয়। সিনেমার মতো। প্যানোরমিক ভিউ থেকে একেবারে আঁধার প্রদীপ শিখার মুখে আছড়ে পড়ছে ক্যামেরা। অন্ধকার চিরে বেরিয়ে যাচ্ছে পাশের বাড়ি পেরিয়ে অলি গলিতে। পুকুর পাড় থেকে দেখা যাচ্ছে সেই এক চিলতে আলোর সঙ্গে লেপ্টে থাকা ভাঙা ভাঙা কালো গহ্বর। এরকম একটা চিত্র নাট্য ভাবছি। নাটকীয়তা এমনিতেই যে আছে আমার ওই ঠিকানার সর্ব অঙ্গে জড়িয়ে, তা তো জানি না।

হেলালুদ্দীন বলছিলেন, আমরা গেরিলা বাহিনী নই। কিন্তু ওই ব্যকরণ মেনেই আছি। শেষ পর্যন্ত মাটি কামড়ে থাকব তো। অনেক কিছুর মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। অনেক কথা শুনছি শুনব শুনে যাব। কিন্তু ঘর ছাড়ব না। মনে হল,ও বলছে, “আরও আরও আঘাত সইবে।” বেশ। কিন্তু এই ছেলেটা তো রাম বামের মতো কিছু বলেনি। যাদের কাছে নিয়ে গেছে তারা রাম থেকে লক্ষ্য যোজন দূরে। বামের কামেও লাগেনি তারা। সব গরিব, নিম্ন বিত্ত বা মধ্যবিত্তের বৃত্তে। একটা তরতাজা ছাত্রদল আছে হেলালুদ্দীনের সঙ্গে।
প্রশ্ন করছি দুটো একটা। যুবক বলছেন, সন্দিগ্ধ মন, অনেক কিছু ভাবছি। যুবক বলছেন, বাইনারি ভাঙছে। ভুল দিকে যাচ্ছে কিনা দেখছি। হুমায়ুন কবীর নিমিত্ত মাত্র। আমাদের ধর্মীয় স্লোগান শুনলেন আমাদের মুখে ? এসব আমাদের ডোবানো ভাসানোর পালা নয়। ভূপৃষ্ঠের স্তরে লেগে থাকার উদ্যম। মানুষকে না ছাড়ার দম। এখানে কী আমরা বিকাশ ভট্টাচার্যকে পাব ? উনি শুধু সিপিএমের বলে বলছি না। ভাবুন এই পনের বছরের লড়াইয়ের ঠিকানা উনি। উনি জিতেছেন উনি হেরেছেন। উনি দেখেছেন উনি দেখিয়েছেন । পার্টির কথা বললে তো হায়ারার্কি ভাবতাম। বিকাশ বাবু এখানে দাঁড়ালে নিশ্চিত জিৎ। প্রমাণ করে দিতে পারি। কাউকে পাইনি বামপন্থীদের। কিন্তু এই জমিটা ছিল, এখনও আছে। বেহাত হয়নি। যারা এসেছে থেকেছে, আসছে থাকছে সব ভাড়াটে। বাড়ির আসল মালিক নয়। এটা কংগ্রেস আর বামফ্রন্টের নিবিড় কর্ষিত জমি। জোটের মাটি। জ্যোতি বসুকে দেখিনি, কিন্তু সিনিয়রদের কাছে শুনেছি। তিমির ভাদুড়ীকেও দেখিনি । কিন্তু পাশেই বেলডাঙার মানুষ ওঁকে স্মরণ করে। বেলডাঙা চিনিকল আর উনি সমোচ্চারিত। এখন স্তব্ধ হয়ে আছে কলের বাঁশি, চিমনি আর তেমনি জনপদ। বামফ্রন্টের সময় কিছু হয়নি শেষ পর্যন্ত চিনিকলের। ঠিকই। কিন্তু পরিবর্তন যে এলো ! তাতে কী হল ? স্বচক্ষে দেখুন! বেলডাঙা স্টেশনের পর লেভেল ক্রসিং পেরিয়েই দেখি প্রতিবাদ সভা। ছিল আরএসপি অফিস। কেন এ ছদ্মবেশ ? কেন এ মলিন বেশ ! ভেতরে আলো জ্বেলে ভালোই লোকজন বসে। আরেকটু পা বাড়িয়ে দেখুন। ঝলমলে আলোর ফোকাস। একটি বিবর্ণ লাল ধুলোর পতাকা মনে হয়। পাশে আবক্ষ ভ্লাদিমির। পুতিন না। পুতিনের প্রপিতামহ। এত কম লাল ! লালে এত কম পড়িয়াছে যখন, কমরেড নাই লিখি ! এত তো কম কম। তাতে আর কত দম ! তিনি লেনিন। মনে ছিল না, সেদিন ছিল বাইশে এপ্রিল। আলোটা নিয়মে জ্বলে। আর সব ধুলো। আতিকুর অত রাজনীতি জানে না। এই বয়সে সবাই তাই। কিন্তু হেলালুদ্দীন জানেন।

ক্লাবের পাশেই লেনিনের মূর্তি। ছবি লেখক

আচ্ছা, দেবারুণবাবু, একটা মজার কথা বলা হয়নি। আপনি কাজিসাহা গ্রামে তো এসে উঠেছেন ! জানেন ওই ওয়ার্ডের নাম ? আমি আতিকুরের দিকে তাকাই। হেলালুদ্দীন আতিকুরকে থামিয়ে বলে, এই ওয়ার্ডের নাম “ভিয়েতনাম।” আমার তখন জন্ম হয়নি, সায়গন যেদিন মুক্ত হল। ১৯৭৩ সাল।সেই দিন থেকেই মুখে মুখে এই নাম শুরু। তোমার নাম আমার নাম , স্লোগান ছিল, আমি বললাম, আমরা সে দিন দেখেছি।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *