হাতিকে পৃথিবীর অন্যতম বুদ্ধিমান প্রাণী বলা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতির স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। একবার কোনও ঘটনা বা মানুষকে মনে রাখলে তা সহজে ভোলে না। নেপালের চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক সংলগ্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া এক হৃদয়বিদারক ঘটনা যেন সেই ধারণাকেই আরও একবার সামনে এনে দিয়েছে। ‘ধুরবে’ নামে কুখ্যাত এক বুনো দাঁতাল ১৪ বছরের ব্যবধানে একই পরিবারের চার জনকে হত্যা করেছে।
চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক এলাকায় মানুষ মারার জন্য বহু বছর ধরেই কুখ্যাত এই রগচটা দাঁতাল। বন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত অন্তত ২৫ জন মানুষের প্রাণ নিয়েছে ধুরবে। এমনকি চোরাশিকারীদের হাত থেকে বন্যপ্রাণী রক্ষার দায়িত্বে থাকা দু’জন সেনা জওয়ানও তার হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।
– বিজ্ঞাপন –
২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্কের কাছে মাদি এলাকার বড়ুয়া বাজারে ধুরবের হামলায় প্রাণ হারান বুধিরাম বোতে ও তাঁর স্ত্রী ঝারালিদেবী। তাঁদের ছেলে শনিচারা বোতে সেই ভয়াবহ ঘটনার পর বাবা-মাকে হারিয়ে রেউ নদীর তীরের বসতি ছেড়ে অনেক দূরে রাপ্তি নদীর তীরে জগতপুরে নতুন করে সংসার গড়ে তোলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, জঙ্গল থেকে দূরে থাকলে হয়তো পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! ১৪ বছর পর সেই একই দাঁতাল ধুরবে শনিচারা বোতের নতুন বাড়িতেই হামলা চালায়।
হামলার সময় বুনো হাতিটি বাড়ির দেওয়াল ভেঙে ভিতরে ঢুকে তাণ্ডব চালায়। শনিচারার ২৫ বছরের পুত্রবধূ আশিকা বোতে এবং চার বছরের নাতি ভরত বোতে-কে শুঁড়ে পেঁচিয়ে আছড়ে মাটিতে ফেলে পিষে হত্যা করে। এক পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুতে গোটা এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
শোকে ভেঙে পড়া শনিচারা বোতে বলেন,
“আমরা প্রথমে মাদি এলাকার দ্রোপতিনগরে থাকতাম। বাবা-মা হাতির হামলায় মারা যাওয়ার পর অনেক দূরে জগতপুরে চলে আসি। ভেবেছিলাম এখানে নিরাপদ থাকব। কিন্তু ১৪ বছর পর সেই একই দাঁতাল আমাদের খুঁজে বের করে আবার আমার পরিবারের দু’জনকে মেরে ফেলল। আমাদের আর কোথাও পালানোর জায়গা নেই।”
বিজ্ঞাপন
২০১২ সালের সেই ঘটনার পর ধুরবেকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল নেপাল প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর সেনাবাহিনী টানা দুই সপ্তাহ ধরে চিতওয়ানের ঘন জঙ্গলে দাঁতালটির খোঁজ চালায়। দু’বার গুলিও করা হয় তাকে। আহত অবস্থায় সে জঙ্গলের গভীরে পালিয়ে যায়। তখন মনে করা হয়েছিল, হয়তো তার মৃত্যু হয়েছে।
কিন্তু ২০১৬ সালের শীতকালে আবার চিতওয়ানের পশ্চিমাংশে ধুরবেকে দেখা যায়। এরপর ধীরে ধীরে সে জঙ্গলের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা শুরু করে। তার গতিবিধির উপর নজর রাখতে ২০২০ সালে প্রথম রেডিও কলার এবং ২০২৩ সালে নতুন রেডিও কলার পরানো হয়।
বনকর্মীদের মতে, ফসল পাকার মরসুমে ধুরবে প্রায়ই লোকালয়ে ঢুকে পড়ে এবং অত্যন্ত আক্রমণাত্মক আচরণ করে। শনিচারা বোতের মাটির বাড়িতে একসঙ্গে নয়জনের পরিবার বসবাস করত। সেই বাড়িতেই এবার ভয়াবহ হামলা চালায় এই কুখ্যাত দাঁতাল।
ধুরবের সাম্প্রতিক হামলার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে—চিতওয়ান অঞ্চলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত রুখতে বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? একই সঙ্গে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে জঙ্গল সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে, কারণ বহু বছর পরও ধুরবের তাণ্ডব থামানোর কোনও স্থায়ী সমাধান এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
