ছবির উৎস, BBC/BSS
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামাল ও লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের অভিযোগ দাখিলের পর এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
মোট আটজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা অভিযোগপত্রে, জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় উসকানি, ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন।
তবে মামলার তদন্ত ও অভিযোগপত্র দাখিলের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের কেউ কেউ বলছেন, ভুল বা উদ্দেশ্যমূলক তদন্ত পুরো বিচার প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
তাদের মতে, ঘটনা ঘটেছে এটা যেমন সত্য, তেমনি যে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার ক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে অনুসন্ধান চালানো উচিত।
প্রসিকিউশন অবশ্য বলছে, বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলনের সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় উসকানি, ষড়যন্ত্র এবং প্ররোচনা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এই আটজনের বিরুদ্ধে।
অভিযুক্তরা কীভাবে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত এবং কেন তাদের ওপর অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, এ নিয়েও বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসেন তামিম।
গত বুধবার এই মামলার অভিযোগপত্র আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।
যেখানে ড. জাফর ইকবাল এবং মাকসুদ কামালসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম জামাল উদ্দিন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, মাজহারুল কবির শয়ন এবং তানভীর হাসান সৈকতকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের মধ্যে অধ্যাপক এ কে এম জামাল উদ্দিন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও ছাত্রলীগ নেতা তানভীর হাসান সৈকত কারাগারে থাকলেও বাকিরা পলাতক।
ছবির উৎস, BBC/MUKIMUL AHSAN
যে-সব অভিযোগ আনা হয়েছে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসেন তামিম বলছেন, ২০২৪ সালের ১৫ই জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সময় আহতদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযোগ আনা হয়েছে আট জনের বিরুদ্ধে।
“এই ঘটনার আগের রাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপাচার্য কথা বলেছেন। জাফর ইকবাল সাহেব ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, তাদের (আন্দোলনরতদের) রাজাকার বলেছেন,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
এছাড়া ১৬ই জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে নিউমার্কেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় দুইজনের মৃত্যুর বিষয়েও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
মি. তামিম বলছেন, “পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের গুলিতে দুইজনের মৃত্যু হয়েছিল। এই দুইটা, সাথে ১৮ এবং ১৯ তারিখে ওই এলাকায় আরও কয়েকজন নিহত হয়েছেন।”
“এভাবে পাঁচ তারিখ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী যে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্দোলন দমন করেছে, অভিযুক্তরা তা সমর্থন করেছে, ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করেছে,” বলেন তিনি।
যদিও সব অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অপরাধের মাত্রা বা ধরন এক নয় বলেও জানিয়েছেন মি. তামিম।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, “একেক জন একেক ধরনের পার্টিসিপেশন করেছেন। ফলে মূল অভিযোগ এক; কিন্তু একেকজনের ক্ষেত্রে ধরনে ভিন্নতা আছে। কেউ টক শো করে, কেউ ফোনে কথা বলে, কেউ বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে।”
এই মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যে-সব অভিযোগ আনা হয়েছে সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধের সব উপাদান রয়েছে বলেই দাবি এই প্রসিকিউটরের।
তার মতে, “ক্রাইম অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটি আসলে এই অফেন্সগুলোর মাধ্যমেই সংগঠিত হয়। ক্রাইম অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটি মানেই যে কাউকে রাস্তায় গিয়ে গুলি করে হত্যা সেটা নয়। সরকারের কোনো নীতি বা রাজনৈতিক কোনো দলের পলিসির সাথে একমত হয়ে সেখানে পরামর্শ দেওয়া, ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করা।”
এছাড়া, অভিযুক্তদের কেউ কেউ পেশাজীবী হলেও তারা প্রত্যেকে সাবেক সরকারের সব অন্যায়কে মানুষের কাছে বৈধ করে তোলার জন্য প্রপাগান্ডা চালাতো বলেও দাবি করেন মি. তামিম।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে অধ্যাপক জাফর ইকবাল ও অধ্যাপক মাকসুদ কামালের ফোনে একাধিকবার কল করেও তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
ছবির উৎস, Getty Images
উদ্বেগ যেখানে
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয় এবং বেশ কয়েকবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনী আনা হয়।
এরপর এই ট্রাইব্যুনালেই জুলাই আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।
জুলাই আন্দোলন ছাড়াও আওয়ামী লীগ আমলের বিভিন্ন গুম, খুন ও নির্যাতনের অভিযোগে করা মামলাসহ বর্তমানে ট্রাইবুনালে ৭০টির বেশি মামলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ অনেকের বিরুদ্ধে পৃথক মামলায় রায় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন যে, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি সরকারের লক্ষ্য নয়।
কিন্তু এসব মামলার তদন্ত এবং অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে মানবাধিকারকর্মী এবং আইনজীবীদের একাংশের।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের অনুপস্থিতিতে বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে গত নভেম্বরে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো পৃথক পৃথক বিবৃতি দেয়।
এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-এ সুষ্ঠু বিচার নিয়ে গত ২৮শে জুলাই উদ্বেগ জানিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি দেয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা এইচআরডব্লিউ।
ছবির উৎস, Getty Images
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি দাবি করেছিল যে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড সমুন্নত রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে এইচআরডব্লিউ এর এশিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত নানা ধরনের নির্যাতনের জন্য দায়ীদের যথাযথভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত, কিন্তু অনেক বিচারই আন্তর্জাতিক সুষ্ঠু বিচারের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।”
তার মতে, “বাংলাদেশের জরুরি ভিত্তিতে তার ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন এবং নতুন সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত ও খেয়ালখুশি মতো অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোনো সুযোগ যেন না থাকে।”
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল এর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে অতীতেও সমালোচনা হয়েছিল বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
বিচার প্রক্রিয়া শুরুর আগে মামলার তদন্ত এবং অভিযোগ দাখিলের প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ।
তিনি বলছেন, “বিচার প্রক্রিয়া তো পরে, আগে হলো প্রসিকিউটর এবং তদন্ত সংস্থা- যারা মামলা রিসিভ করে তাদের ওপর তো অনিয়মের অভিযোগ একদম প্রথমেই আসবে। অনেক ঘটনার তো সত্যতা আছে, কিন্তু আপনি যখন একটা মিথ্যার আবরণে ঢুকে যাবেন তখন সত্য দুর্বল হবে।”
এছাড়া দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা তৈরিতে পক্ষপাতমূলক বিষয়গুলোও এড়ানোর কথা বলছেন এই আইনজীবী।
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগগুলো যেমন আসছে, তেমনি পাঁচই অগাস্ট এবং তার পরবর্তী সময়ে যে নির্যাতন করেছে, মব হয়েছে সেগুলো নিয়ে তো কথা হয় নাই। এর ফলে মানুষের মধ্যে একটা বৈষম্যের প্রশ্ন আসবে এবং এই বিচার ভবিষ্যতে অন্য বিচারকেও দুর্বল করবে,” বলেন মি. মোরসেদ।

নির্বাচিত সরকারের কাছে দলমত নির্বিশেষে যে প্রত্যাশা থাকে সেটা পূরণ না হলে সেটি সরকারের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলছেন, ঘটনা ঘটেছে এটা যেমন সত্য, তেমনি যে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার ক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে অনুসন্ধান চালানো উচিত।
“এই ঘটনার সাথে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই এমন কাউকে যেন কোনোভাবেই এসব ঘটনায় যুক্ত করা না হয়,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
মি. লিটন বলছেন, “বিগত দিনে মানুষকে হেনস্তা করার জন্য ষড়যন্ত্র শব্দটা ব্যবহার করা হতো বা যে-কোনো মামলায় অভিযুক্ত দেখানোর চেষ্টা হতো। সেখান থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি সেটা বলার সুযোগ এখনো নাই।”
প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসেন তামিম অবশ্য বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এর বিচারির প্রক্রিয়ায় অতীতে যেসব অভিযোগ বা আপত্তি আনা হতো সেগুলো এখন নেই। আইনের সংশোধনের মাধ্যমে সেই পথ বন্ধ হয়েছে বলেই মত তারা।
মি. তামিম এর দাবি, “এখন যে বিচারটা হচ্ছে সেটা পুরোপুরি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনেই হচ্ছে।”
এছাড়া মৃত্যুদণ্ড এবং আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার করার যে অভিযোগ দুটি আনা হয় তা নিয়েও যুক্তি দিয়েছেন মি. তামিম।
তিনি বলছেন, “বাংলাদেশের মতো অপরাধপ্রবণ একটা দেশে ডেথ সেনটেন্স থাকবে না এটা ইমপ্রাকটিক্যাল। আর আমাদের আসামিরা ইচ্ছাকৃতভাবে পলাতক আছে, তারা মিডিয়াতে ব্রিফিং করছে- ফলে ট্রায়াল ইন অ্যাবসেনশিয়া যদি না থাকে আমরা তো কোনোদিন কাউকে বিচারই করতে পারবো না।”
