দেবারুণ রায়
বাংলার ভোটে কী হয় কী হয় নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার শেষ রজনী উদযাপনে আছি আমরা। উদযাপন বলাই সম্মানজনক। দেশের ও দশের প্রতি। এবং নিজের বোধ বুদ্ধি আত্মমর্যাদার প্রতি । নির্বাচন গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উপহার। তাকে আমরা উৎসব বলতে ভালবাসি। অভুক্ত, অর্দ্ধভুক্ত, অসহায়, অপচিকিৎসায়, অচিকিৎসায় অসুস্থ, শিক্ষার সংকট ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় ঘিরে থাকা, চাকরি হীন , সম্বলহীন, বাস্তুচ্যুত ও নাগরিকত্বের প্রশ্নচিহ্ন কপালে আঁকা মানুষের মধ্যে থেকেও এই ব্যবস্থায় ব্যবস্থিত থাকি। আস্থা রাখি, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি বা সার্থক জনম আমার এর মতো অসামান্য সুরে লয়ে গান শুনি, গুণ গুণ করি। আর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের ভোটার হিসেবে পরিচিত হতে চাই। শুধু সব কিছুকে নাড়িয়ে দেয় বাংলা ও বাঙালির এই সংকটের সায়ংকাল, যখন মনে পড়ে, কানে ঢোকে চোখে পড়ে আগামীকাল অর্থাৎ সোমবার, চৌঠা মে।
সব ইভিএমের ভেতরে ভোট ঠুঁসে দিয়েছে বাঙালি, গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। তারপর থেকেই রাজনীতির খেলুড়েরা নানা ধরনের শঙ্কা ও সংকেত ছড়াচ্ছেন। সকলের খেলার ছক এক নয়। কেউ খেলছে ফাটকা। কেউ বলছে টাটকা খবর। রাত পোহালেই যে দুধ না জল বুঝে যাবে দেশের সবাই, সেটা জেনেও তারা যে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন নির্বাচনের রণক্ষেত্রে, তিনি সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন। সরকার পক্ষের নাহয় সেটাই স্বাভাবিক, কিন্তু যারা সরকারের পরিবর্তন হবে বলে কসম খেয়েছেন লক্ষ কোটি বার, তারাও নিজের স্থান পরিবর্তন করতে রাজি নন। তারা বিপরীত পক্ষের পরিবর্তন কতটা নিশ্চিত সেটা বোঝানোর চেষ্টা করে করে নিজেরাই বুঝে ফেলেছেন।
সুতরাং রাজনীতির পাশা, ক্ষমতায় থাকার আশা বা নতুনদের ক্ষমতায় আসার আশার দ্বন্দ্বে সন্ধ্যা ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর সন্দেহের কবলে। নানা নাটকীয় সংখ্যা ঘুরঘুর করছে। ১৬০/৭০ থেকে ২২২ ও শুনলাম শাসক দলের প্রাপ্তির নানা মত। যত মত তত পথ সবাই জানে। এখন উদ্বিগ্ন জনগণের তো মত আছে পথ নেই। উদ্বিগ্ন সর্বাধিক সংখ্যালঘুরা। শুধু ধর্মীয় বিভাজনের হিসেবে নয়। রাজনীতির হিসেবে সংখ্যালঘুরাও।
তৃণমূল সুপ্রিমো ও তাঁর সেকেন্ড ইন কমান্ড একরকম ভাবে বলছেন না। বলার কথাও নয়। বিরোধী বিজেপি ও কংগ্রেস এবং বাম হাতের সঙ্গীদের মত পথও মিলছে না। মেলার কথা ছিল কি ? নিশ্চয়ই না।
বিজেপি এবার একটু বাস্তববাদী। খুব একটা সংখ্যায় যাচ্ছে না। গত দুবারের হয়রানি তাদের মনে আছে। আর, দুই সরকারের টক্কর, এখানে গুঁতোগুঁতি তো শুধু পাঁচ বছরে একবার আর দিল্লির মসনদের জন্যে আর একবার। মোদ্দা মোদী মমতা তিক্ততা এই বিধানসভা নিয়েই। তাও এবার সেভাবে বুদ্ধিমান শীর্ষ নেতাদের ডবল ইঞ্জিন বলতে তেমন শোনা যায়নি। লখ্নৌর বাবা গেস্ট আর্টিস্ট , আর প্রচণ্ড চাপের মুখে বুলডোজারের গপ্পো বলেছেন। বুলডোজারের পাশাপাশি লোকে শুনেছে অনেক বুল শিট। নেতাজির কথা স্বামীজির মুখে পুরে দিয়ে বিস্তর মিম খেয়েছেন। কিন্তু বাংলায় বিজেপির খাল খননের কাজ শুরু হয়েছিল যখন, তখন আজকের ছাপ্পান্ন বছরের শুভেন্দু সবে তাজা তরুণ তুর্কি। মা মা বলে নন্দীগ্রামের মাটি কোপাচ্ছেন। মানুষ ছুটছে পেছনে পেছনে। ফুল ফুটছে এখানে ওখানে। এখন সেই বিজেপির ক্যানাল তৈরি। ছাপ্পান্নর চক্রব্যুহ । মোদীর কিন্তু ছাপ্পান্ন ইঞ্চিটা ক্লিক করেছিল। আর ছাপ্পান্নর শুভেন্দু লুটিয়ে পড়ে তিপ্পান্নর “বাবা” আদিত্যকে বললেন, ওই আসন তলে …! আদিত্যকে কিন্তু বেশ বেচারি বেচারি লাগছিল। এতটা উনিও ভাবেননি। দেখছি সিপিএমের শতরূপের মুখে কিছু আটকায় না। অক্লেশে তিপ্পান্ন ছাপ্পান্ন লুটোপুটিটা বলে দিলেন। তারপর চাপ বেড়েছে ভবানীপুরে। শুভেন্দুর কাছে এখনও মমতা এই ভবের ভবানী। আচ্ছা সবসময় তাঁকে মমতার সামনেই ফেলবে বিজেপি ! কেন ? বিজেপিতে আর কারও দম নেই ? শুভেন্দু বলছেন, দুশো ভোটে মমতা হারবেন। শুনে থ হয়ে গিয়ে বুঝলাম ওটা কালীঘাটের একটা বুথ। ওখানেই দিদির এক প্রতিবেশী শুভেন্দুকে পাবদা মাছের নেমন্তন্ন করেছেন। হতে পারে মমতাকে ভোট আর ওঁকে মাছ। আর যদি ভোট আর মাছ এক হয় তাও হতে পারে। পাশের বাড়ির লোকজন নন্দীগ্রামেও শুভেন্দু অধিকারীকে দেবে না। এটা নর্মাল । অমিত শাহ এবার কোনও হাঙ্কি পাঙ্কিতে নেই। পাঁচ রকম কথা ছেড়ে শুধু বলছেন, পাঁচ তারিখ উল্টা করকে লটকা দেঙ্গে। মোদী এবার শুধু সরকার কতটা ব্যর্থ সেটাই বলেছেন। তবে হ্যাঁ, প্রচার শেষ করবেন ভবানীপুরে, কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত জানিয়ে দিলেন, না মমতার কেন্দ্র ভবানীপুরে যাব না।
লিখেছি, বাইনারির মেঘ কাটছে মালদা মুর্শিদাবাদ দিনাজপুরে। অল্প হলেও সত্যি। গল্প নয়। ওই মেঘের ফাঁক দিয়ে যতটা আলো আসে ততটাই সিট। কং, বাম, আইএসএফের। জোট এবার ওপরে হয়নি। জোট হয়েছে মাটিতে।

মুর্শিদাবাদের বহরমপুর, কান্দি, ডোমকল, রানিনগর, আর মালদার মালতীপুর, সুজাপুর, মোথাবাড়ি। দিনাজপুরের চাকুলিয়া, করণদীঘি ইত্যাদি এলাকায়।
বহরমপুরে উৎসবে এতটাই উত্তেজিত সবাই যে ছুপা রুস্তম চেনা দায়। মুর্শিদাবাদের মাটিতে মির জাফর আর জগৎ শেঠের অবশেষ আছে। ঘর পোড়া গরু যারা তাদের সিঁদুরে মেঘের ভয়। জয় না হওয়া পর্যন্ত ইভিএমের বিশ্বাস নেই। সাপের হাঁচি নিয়ে বেদের চেনার কথা যা বলা আছে, তা সত্য। বহরমপুর ছেয়ে গেছে পোস্টারে ।” আর কোনও ভুল নয় আর কোনও ফুল নয়। অধীর অপেক্ষায় বহরমপুর।” অধীর চৌধুরী বললেন, এখনও পর্যন্ত সব ভালোই তো লাগছে। তবে আমি দুটো দলকেই চিনি। বিজেপি আর তৃণমূল। বিজেপি অন্য রাজ্যে যা করে, এখানে তৃণমূল তাই করে। তিনিই জানালেন, আই প্যাক সম্ভাব্য বিজয়ী বিধানসভা নির্বাচনের ভিন্ন দলের প্রার্থীদের বাড়ি বাড়ি হানা দিচ্ছে। আর অফার দিয়ে রাখছে। কেনাবেচার ঘর। জিতবে বলে যখন, তখন এসব কেন ? প্রশ্ন করছি নিজেকে। ইভিএমের ভোটের ভেলকি যদি সত্যি হয় ? সেটা তো ভেলকি ! সে তো জবরদখল ! তাকে তো পরাজয় বলে !
আগের পর্ব: বদলেছে মৌসম : বিজেপির পালের হাওয়া কেড়ে নিচ্ছে কংগ্রেস
